অধিকার ও সত্যের পথে

যে কারণে শিক্ষা জাতীয়করণ চান পাঁচ লাখ এমপিওভুক্তগণ

 মো. আলী এরশাদ হোসেন আজাদ:

১৯৬৬ প্যারিস সন্মেলন ও ১৯৯৪ সালে ইউনেস্কোর ২৬তম অধিবেশনের সিদ্ধান্ত বাংলাদেশে আজো আলোরমুখ দেখে নি। অথচ ঐ সব সিদ্ধান্তে শিক্ষক স্বার্থ সমুন্নত রাখবার যে অঙ্গিকার ব্যক্ত হয়েছে ঐ অঙ্গিকারে বাংলাদেশও অঙ্গিকারাবদ্ধ। এ জন্যই পাঁচ লাখ এমপিওভুক্ত বা বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীর অহঙ্কার: ‘শিক্ষক আমি শ্রেষ্ট সবার’। ‘শিক্ষা জাতির মেরুদÐ’ তাই মানব সম্পদ উন্নয়নে শিক্ষার উন্নয়নের কোন বিকল্প নেই। কেননা, জাতিকে খাড়া, সোঝা ও মজবুত রাখার দায়িত্ব পালন করেন এবং শক্তি যোগায় যারা তারাই ‘মানুষ গড়ার কারিগর’ অর্থাৎ ‘শিক্ষক’। অথচ দেশের অভিন্ন সিলেবাসে পাঠদানকারী প্রায় শতভাগ বেসরকারি শিক্ষক নানান বঞ্চনা শিকার। কারিগরকে অভূক্ত, অবহেলিত রাখলে জাতি হয়ে ওঠবে দূর্বল, অবনমিত ও নি¤œগামী। শিক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকার এবং সবার সমান সুযোগ নিশ্চিতকরণ আমাদের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার বিষয় হিসেবে স্বীকৃত। এ জন্যই একটি মাত্র সর্বসন্মত জাতীয় গণদাবিÑ ‘শিক্ষা জাতীয়করণ’।

এ দাবি শুধু একজন শিক্ষকের সুখী জীবনযাপনের জন্য নয়। বরং এ দাবি হওয়া উচিত কৃষক শ্রমিক মেহনতি জনতার। শিক্ষা জাতীয়করণের জন্য সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। গ্রামে-গঞ্জে, বাজার-বন্দরে, দোকানে বা চায়ের স্টলে সর্বত্র সবাইকে সংহতি প্রকাশ করতে হবে শিক্ষা জাতীয়করণের দাবিতে।
মানুষের মৌলিক প্রয়োজন অন্ন, বস্ত্র, চিকিৎসা, বাসস্থানের মতোই ‘শিক্ষা’ মানুষের মৌলিক অধিকার। একটি কল্যাণরাষ্ট্র মানুষের মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা দেয়। আমাদের সরকারও মানুষের পাঁচটি মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তার জন্য নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। কাজেই, শিক্ষা জাতীয়করণ হলে:

# গরিব-দূঃখি সবার সন্তান উন্নততর শিক্ষার সুযোগ পাবে।
# গরিবের শিক্ষালাভের সুযোগ বাড়বে এবং ব্যয় কমবে।
# গ্রামের মানুষকে শহরে গিয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য ভীড় করতে হবে না। সবার তো শহরে যাওয়ার সামর্থ্যও নেই। এ সমস্যার সমাধান হবে।
# বড় বড় শহরে জন-স্ফীতি হ্্রাস পেলে যানজট থাকবে না।
# শিক্ষাক্ষেত্রে গুণগত পরিবর্তন হবে।
# মান সম্মত শিক্ষা ও শিক্ষকের ঘাটতি দূর হবে।
# ভাল প্রতিষ্ঠান, খারাপ প্রতিষ্ঠানের প্রচলিত ধারণা থাকবে না।
# সবার জন্য শিক্ষা, নারী শিক্ষা, কর্মমুখী বা কারিগরি শিক্ষা সব ক্ষেত্রে প্রভুত উন্নতি সাধিত হবে।
# ক্রমশ একমুখী শিক্ষাব্যবস্থা চালু করা সহজ হবে।
# মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন হবে সহজতর এবং দ্রুত।

অন্যদিকে, এমপিওভুক্তগণের প্রত্যাশিত ৫% প্রবৃদ্ধি ও বৈশাখিভাতা নিয়ে জিজ্ঞাসার উত্তর মিলছে না! ২০১৫ বেতনস্কেলের নিদের্শনায় রয়েছে নতুন করে পাঁচ বছর অন্তর বেতনস্কেল হবে না। বৎসরান্তে জুলাই মাসে জাতীয় বেতনস্কেলভুক্তগণ ৫% বার্ষিক প্রবৃদ্ধি সুবিধা পাবেন, যা চক্রবৃদ্ধি হারে অব্যহত থাকবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আগ্রহে ২০% বৈশাখিভাতা চালু হয়। অথচ জাতীয় বেতনস্কেলভুক্ত সবাই সুবিধা দু’টি ইতোঃমধ্যেই পেলেও শুধু বঞ্চিত রয়ে গেছেন এমপিওভুক্তগণ। বেতনস্কেলে ৫% বার্ষিক প্রবৃদ্ধি সুবিধা যদি এমপিওভুক্তগণ না-ই পান, তবে কি তারা যে স্কেল ও সুবিধা পেয়ে চাকুরিতে যোগ দেবেন শুধু সেটুকু নিয়েই অবসরে যাবেন? এমপিওভুক্তগণের কি বৈশাখিভাতা বঞ্চিত হওয়াই কাম্য? অথচ তারাই ‘সোনা ছোঁয়া মাটির’ সৌরভ ছড়াতে গ্রাম-গ্রামান্তরে শিক্ষারদ্যুতিতে জাতীয় ঐতিহ্যের পৃষ্ঠপোষকতা করছেন।

মানুষ গড়ার কারিগরকে এমপিওভুক্তির নামে দেওয়া হয় ‘অনুদান’। এমপিওভুক্তগণ বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট, পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল ও উৎসবভাতা পান না। তারা পদোন্নতি, স্বেচ্ছাঅবসর, বদলি সুবিধাসহ অসংখ্য বঞ্চনার শিকার! তারা পদমর্যাদা অনুযায়ী বাড়িভাড়া পান না। ‘প্রিন্সিপাল থেকে পিওন’ সবাই বাড়িভাড়া পান ১০০০/=, চিকিৎসাভাতা ৫০০/= মাত্র। এ গুলো নিতান্তই অপ্রতুল।
এ ছাড়াও শিক্ষকদের প্রত্যাশার মধ্যে রয়েছে: সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কমিটি বা পরিচালনা পরিষদ দলীয় রাজনীতি মুক্ত রাখা এবং তা সংস্কার করে সভাপতি ও সদস্যদের শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ, বিচ্ছিন্ন ও খÐিতভাবে স্কুল কলেজ জাতীয়করণের চলমান প্রক্রিয়া স্থগিত করে সুনিদির্ষ্ট পরিকল্পনা প্রণয়ন করে শিক্ষা জাতীয়করণ করা, সিলেবাস অনুযায়ী বিষয়ভিত্তিক পর্যাপ্ত সংখ্যক শিক্ষক নিয়োগ ও অনার্সসহ স্কুল, মাদ্রাসা, কলেজের সকল স্তরের নন-এমপিও শিক্ষকদের নিঃশর্তভাবে শীঘ্রই এমপিওভুক্ত করা, শিক্ষাখাতে জাতীয় বাজেটের ২০% বা জিডিপির ০৬% বরাদ্দ নিশ্চিত করা, কর্মরত সব শিক্ষকের চাকুরির মেয়াদকাল ৬০ থেকে ৬৫ বছরে উন্নীত করা।

আশার কথা অত্যন্ত ধীরগতিতে হলেও শিক্ষক সংগঠনগুলোর মধ্যে ঐক্য প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বর্তমানে শিক্ষক সংগঠনগুলোর মধ্যে ‘এক ঘোষণায় সমগ্র শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ’ দৃষ্টিভঙ্গি প্রায় অভিন্ন। কেননা, ‘দল যার যার শিক্ষকস্বার্থে সব শিক্ষক একাকার’। দীর্ঘ ২৫ বছর অধ্যাপনার মহানব্রতে ব্যক্তিগত আস্থার অবস্থান থেকে আমি মনে করি, পেশাগত প্রাণের দাবি আদায়ে নেতিবাচক কর্মসূচি বা কোনো রূঢ় বাস্তবতার দিকে আমাদের নেতৃবৃন্দের যাওযার প্রয়োজন নেই বরং সবার ঐক্যবদ্ধ আওয়াজই যথেষ্ট: ‘পাঁচ লাখ এমপিওভুক্তের ঐক্য যদি রয়, শিক্ষা জাতীয়করণ হবে নিশ্চয়’।

প্রসঙ্গতঃ বলি, ২০ অক্টোবর ২০১৭ প্রফেসর মুহম্মদ জাফর ইকবাল তাঁর ‘শিক্ষক এবং শিক্ষকতা’ শিরোনামের লেখায় বলেছেন “আমাকে একজন জিজ্ঞেস করেছে, আপনার বেশ কয়েকটি পরিচয় আছে…. আপনার কোন পরিচয়টিতে আপনি পরিচিত হতে চান? আমি এক মুহূর্ত দ্বিধা না করে বলেছি আমি শিক্ষক পরিচয়ে পরিচিত হতে চাই….. আমরা ফাইল নিয়ে কাজ করি না, যন্ত্র নিয়ে কাজ করি না, আমরা কাজ করি রক্তমাংসের মানুষ নিয়ে। যাদের চোখে রঙিন চশমা এবং যারা ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে”।
যে পর্যায়েরই হোক না কেনো, সব শিক্ষকের ভাবনার বাস্তব প্রতিফলন ঘটেছে প্রফেসর মুহম্মদ জাফর ইকবালের বক্তব্যে। প্রকৃত শিক্ষক আসলে খুব বেশি কিছু পাবার আশায় থাকেন না। বরং প্রফেসর মুহম্মদ জাফর ইকবাল তাঁর ‘শিক্ষক এবং শিক্ষকতা’ শিরোনামের লেখায় বলেছেন “আমরা যারা শিক্ষক তারা সত্যিকারের মানুষ নিয়ে কাজ করি।….. যে ছাত্রটি প্রায় কিশোর হিসেবে একদিন পড়তে এসেছিল, এখন সে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ হয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছে, দেখে কী ভালই না লাগে। শুধু আমরা শিক্ষকরাই সেই আনন্দটুকু পেতে পারি…”।

কাজেই, সবার প্রত্যাশা ‘দেশের সমগ্র শিক্ষাব্যবস্থা’ অচিরেই জাতীয়করণের যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন শিক্ষক দরদী প্রধানমন্ত্রী, জননেত্রী শেখ হাসিনা।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ইসলামিক স্টাডিজ কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজ কাপাসিয়া

গাজীপুর- ১৭৩০  

একই ধরনের আরও সংবাদ