অধিকার ও সত্যের পথে

সুবোধ তুই পালিয়ে যা !

 আমিনুল ইসলামঃ

স্কুলজীবনে বাংলা দ্বিতীয় পত্র বিষয়টি অনেকের মতো আমারও বেশ কঠিন লাগত। ধ্বনিতত্ত্ব, ণত্ববিধান, ষত্ববিধান, সন্ধি, কারক, সমাস, প্রত্যয়, উপসর্গ, অনুসর্গ, ধাতু, অনুকার, অনুপ্রাস, দ্বিরুক্ত শব্দ ইত্যাদি অনেক ভালো না লাগার ভিড়ে ভালো লাগার একমাত্র বিষয়বস্তু ছিল প্রবাদ-প্রবচন। প্রবাদ-প্রবচনগুলো সেই বয়সে শুধু ভালো লাগা থেকেই আত্মস্থ করিনি বরং প্রবাদ-প্রবচনের শিক্ষাকে আদর্শ বলেই মেনেছি এবং বাস্তব জীবনে তা প্রয়োগের চেষ্টাও করেছি।

‘সততাই সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা’, ‘জ্ঞানই শক্তি’, ‘পরিশ্রম সৌভাগ্যের প্রসূতি’, ‘উপদেশ অপেক্ষা দৃষ্টান্ত ভালো’, ‘চরিত্র মানব জীবনের মুকুটস্বরূপ’-এ ধরনের কত মূল্যবান শিক্ষা সন্নিবিষ্ট ছিল সেই প্রবাদ-প্রবচনসমূহে! তবে আজকাল প্রায়ই মনে হয় এই প্রবাদবাক্যগুলো পরিবর্তনের সময় বুঝি এসে গেছে। আমাদের চারপাশে মূল্যবোধ আর নৈতিকতার দৃশ্যমান অবক্ষয় এ ভাবনাকে যেন আরও গভীরতর করে তুলছে। তবে সবকিছুকে ছাপিয়ে উঠেছে বাংলাদেশে বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার উদ্বেগজনক চিত্রটি। শিক্ষার নড়বড়ে সামগ্রিক পরিস্থিতি দেশের মেরুদণ্ডকে দ্রুত দুর্বল থেকে দুর্বলতর করে তুলছে।

জানি না আজকালকার শিক্ষার্থীরা এসব প্রবাদ-প্রবচনের অর্থ বুঝে পড়ার চেষ্টা করে কি না! তবে বাংলাদেশের সামগ্রিক শিক্ষার যে হালচাল তাতে সত্যিকার জ্ঞানার্জন নিয়ে শিক্ষার্থীদের এত মাথা ঘামানোর তেমন কোনো কারণও দেখি না। যে শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের নির্ভরশীল করে গড়ে তুলছে ফাঁস হয়ে যাওয়া প্রশ্নপত্রের ওপর, সেই শিক্ষাব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত শিক্ষার্থীদের অন্তত ‘পরিশ্রম সৌভাগ্যের প্রসূতি’ কিংবা ‘সততাই সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা’ জাতীয় নীতিবাক্য শিখে দিনরাত বিবেকের দংশনে দংশিত হওয়ার কোনো মানে হয় না। বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষার্থী নয় বরং পরীক্ষার্থী করে গড়ে তুলছে, যেখানে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য জ্ঞানার্জন করা নয় বরং ভালো নম্বর পেয়ে পরীক্ষায় পাস করা। শঙ্কা হয় সেই দিনটির জন্য যেদিন পড়তে বসার কথা বললে আমাদের সন্তানেরা মুখের ওপর চটপট উত্তর দেবে, ‘পরীক্ষার আগের রাতে পড়ে পুষিয়ে দেব, চিন্তা কোরো না।’

শিক্ষাদান পদ্ধতি আর মূল্যায়ন নিয়ে বাস্তবতা বর্জিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা আর কতকাল চলবে! শিক্ষা নিয়ে এত হাস্যকর পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং ঘন ঘন পরীক্ষাপদ্ধতির পরিবর্তন পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে হয় বলে জানা নেই। ১৯৯২ সালে এসএসসি পরীক্ষার আগে হঠাৎ চালু হওয়া পাঁচশ নৈর্ব্যক্তিক প্রশ্নব্যাংকের কথা নিশ্চয়ই অনেকের মনে আছে। ১৯৯২ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত সময়ে এসএসসি পাস করা শিক্ষার্থীরা আজও অস্বস্তি বোধ করেন অনায়াসে পাস করার এই পরীক্ষা পদ্ধতির অংশ হিসেবে নিজেদের পরিচয় দিতে।

প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাস্তরে প্রচলিত সৃজনশীল প্রশ্নপত্রের মাধ্যমে পরীক্ষা গ্রহণ ও মূল্যায়ন পদ্ধতি লেজেগোবরে শিক্ষাব্যবস্থার আরেকটি বাস্তব উদাহরণ। এই পদ্ধতি শিক্ষার্থীদের নিম্ন কিংবা উচ্চস্তরের শিখন দÿক্ষতার মূল্যায়ন কতটা করছে জানি না, তবে এটা দিনের আলোর মতো স্পষ্ট যে এই পদ্ধতি তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার বারোটা বাজিয়েছে। ফাঁস হয়ে যাওয়া প্রশ্নপত্রের পেছনে ধাওয়া করতে করতে শুধু শিক্ষার্থী কেন, তাদের পিতামাতার নৈতিক মূল্যবোধেরও বারোটা বাজতে চলেছে। মাঝখানে রমরমা ব্যবসা করছে কোচিং সেন্টারগুলো আর গাইড বইয়ের প্রকাশকেরা। অন্যদিকে সরকারের ইচ্ছে পূরণে বাধ্য শিক্ষকেরা পাবলিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী পাসের অযোগ্য অনেক শিক্ষার্থীর শূন্য খাতাও নম্বরে পরিপূর্ণ করে তুলছেন। তাই শিক্ষকদের নৈতিকতাও আজ প্রশ্নবিদ্ধ।

বাস্তবতা বিবেচনা না করেই প্রাথমিক শিক্ষাকে পঞ্চম শ্রেণি থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত ঘোষণা করা হয় এ দেশে। আবার কয়েক মাস পরে সে ঘোষণা ফিরিয়েও নেওয়া হয়। এ যেন পুতুলখেলার মঞ্চ! শিক্ষা নিয়ে চলে এ দেশে পুতুলখেলার রাজনীতি আর আমাদের সন্তানেরা হয় সে খেলার শিকার। এখানে শিক্ষাব্যবস্থার নেতৃত্ব প্রদানকারী দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা প্রকাশ্যে শিক্ষকদের সহনীয় মাত্রায় উৎকোচ গ্রহণের মতো হিতাহিত জ্ঞানশূন্য মন্তব্য করে ফেলতে পারেন অনায়াসে। কাউকে কোনো জবাবদিহি পর্যন্ত করতে হয় না এই দেশে।

তাই কী লাভ বাল্যকালে পড়া সেই মহান প্রবাদবাক্যগুলোর কথা মনে রেখে! মা-বাবা আর গুরুজনদের শেখানো সততা, মূল্যবোধ আর আদর্শ দূরে ছুড়ে ফেলার কিংবা বাক্সবন্দী করে রাখার সময় এসেছে আজ। আসুন, আমরা আমাদের মধ্যে বসবাসকারী সুবোধকে নিশ্চিন্ত ছুটি দিই কিংবা পালিয়ে যেতে দিই অনেক অনেক দূরে, যেখান থেকে সে আর কখনো ফিরে আসবে না।

বি. দ্র: (লেখায় ব্যক্ত মতামত লেখকের নিজস্ব)।

 

লেখকঃ আমিনুল ইসলাম

একই ধরনের আরও সংবাদ