অধিকার ও সত্যের পথে

আর্থিক সুবিধার আশায়ই কি শিক্ষকরা জাতীয়করণ চায়?

 মো. আলী এরশাদ হোসেন আজাদ

সর্বজন স্বীকৃত বাস্তব আকাক্ষা শিক্ষা জাতীয়করণ। অথচ, যখন জাতীয়করণের লক্ষে শিক্ষকরা সরকারের মনোযোগ আকর্ষণে তৎপর হয় তখন অনেকেই ভাবেন: শিক্ষকরা টাকার জন্য এ সব করে। এমন ধারনা শিক্ষকসমাজের জন্য পীড়াদায়ক। এগুলো নিতান্তই হীন মানসিকতা ও বিভ্রান্তিকর। টাকার কাঙ্গালরা অন্যসব কিছু করলেও শিক্ষকতা করেন না। নিতান্তই নিরিহ, নির্লোভরাই শিক্ষক হন। দারুণ সম্ভাবনা ছেড়েও অনেকে শিক্ষকতায় আসেন কেবল অন্তরের আকাক্সক্ষা ও জাতির প্রতি কৃতজ্ঞতার ঋণ শোধের দায়ে।

অথচ শিক্ষা খাতে বৈষম্য বাড়ছে নানামুখী। সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা ব্যয়ে বিস্তর ফারাক। শিক্ষার প্রয়োজনে বেসরকারি খাতে চড়ামূল্য দিতে হচ্ছে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের। সরকারি প্রতিষ্ঠানে নামমাত্র মূল্যে পড়াশোনা করা যায়। অথচ বেসরকারিতে ব্যয় বেশি। ২০১৪ সালের তথ্যের ভিত্তিতে বলা যায়, ধানমণ্ডি গভর্নমেন্ট বয়েজ হাইস্কুলে ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণির টিউশন ফি ১২ টাকা। নবম ও দশম শ্রেণিতে তা ১৫ টাকা। ভর্তি ফি শ্রেণিভেদে ১০০০-১৪০০ টাকা। অন্যদিকে, রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মনিপুর হাইস্কুল ও মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজে মাধ্যমিক স্তরে ভর্তি ফি কমবেশি ২০ হাজার টাকা। টিউশন ফি ৮০০ থেকে ২০০০ টাকা। ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের টিউশন ফি আট হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকার মধ্যে। প্রতিষ্ঠান ভেদে এ ব্যয় বাড়ে-কমে।

দেশ এখন উন্নয়নশীল স্তরে পৌঁছলেও সরকারি-বেসরকারি এবং গ্রাম-শহরে শিক্ষাখাতে বৈষম্য কাম্য নয়, সহনীয়ও নয়।শিক্ষার গুণগত মান বিকাশে শিক্ষা ব্যবস্থায় বৈষম্য দূরীকরণের কোনো বিকল্প নেই। এপ্রসঙ্গে প্রবীণ শিক্ষক নেতা অধ্যক্ষ কাজী ফারুক আহমেদ বলে আসছেন, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রচলিত বেতন কাঠামোর ফলে মেধাবীরা শিক্ষকতায় আকৃষ্ট হচ্ছে না। সেজন্য সব পর্যায়ে পৃথক বেতন কাঠামো দরকার। তিনি বলেন, বেসরকারি ছাত্ররা বেতন বেশি দেয়, তবে শিক্ষকরা পান কম বেতন। আর সরকারি প্রতিষ্ঠানের ছাত্ররা দেয় কম বেতন, শিক্ষকরা পান বেশি। এটা দেশের সংবিধান ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থী।

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার নানা দিক পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, এদেশে অনেক ক্ষেত্রেই শিক্ষকদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হয় না। একই স্তরে একই কাঠামোয় অবস্থান করে এবং শিক্ষকদের একই পাঠ্যসূচি অনুযায়ী পাঠদান করার পরও সম্মানি ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে বৈষম্য রয়েছে। সত্যিকার অর্থে একটি সুশিক্ষিত জাতি গঠন করতে হলে সর্বস্তরে শিক্ষক সমাজের যথাযথ মর্যাদা নিশ্চিত করা একান্ত প্রয়োজন। এক্ষেত্রে বিরাজমান যাবতীয় বৈষম্যের অবসান হওয়া জরুরি। বিষয়টির প্রতি সরকারের কার্যকর মনোযোগ আকর্ষণ করার জন্যই শিক্ষা জাতীয়করণের আওয়াজ তোলা হয়। শিক্ষা জাতীয়করণের আওয়াজে মানব বন্ধন, অবস্থান, কর্মবিরতি, মহাসমাবেশ ইত্যাদি করেও শিক্ষকরা বারবার ব্যর্থ হচ্ছে। গ্রাম-গঞ্জের অনেকের অনেক আশা অসীম শূন্যতায় মিলিয়ে যাচ্ছে। তারা ফিরে যাচ্ছেন খালি হাতে।

শিক্ষা আমাদের মৌলিক অধিকার।আমাদের সংবিধানেও গণমুখী, বৈষম্যহীন ও সার্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা চালু করার কথা রয়েছে। কিন্তু আমাদের প্রত্যেক শিক্ষা স্তরে সরকারি বেসরকারি শিক্ষাব্যবস্থা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা, শিক্ষক রয়েছে। কিন্তু এক ও অভিন্ন শিক্ষা বিভাগ থেকে দেশের প্রাথমিক, এবতেদায়ি, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক, ক্যাডেট ও উচ্চ শিক্ষার সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও পরিচালিত হচ্ছে। এগুলো একই নিয়ম নীতি, সিলেবাস, পরীক্ষা পদ্ধতি, প্রশ্ন পদ্ধতি প্রণীত হচ্ছে। অথচ আর্থিক সুযোগ সুবিধার ক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানের পার্থক্য বিদ্যমান রয়েছে।দেশের শতকরা ৯৮ ভাগ শিক্ষার্থী বেসরকারি স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন করছে।বেসরকারি শিক্ষকরা এদের পাঠদান করছেন। অন্যদিকে গুটি কয়েক সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের আলাদাভাবে ব্যাপক সুযোগ সুবিধা প্রদান করা হচ্ছে।

একই দেশে, একই সরকারের অধীনে একই শিক্ষা বিভাগে দু’রকম শিক্ষাব্যবস্থা কি স্বাভাবিক? গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সরকার ব্যবস্থায় তো এমনটা অপ্রত্যাশিত।অথচ এদিকে সরকারের শিক্ষাক্ষেত্রে কিছু কিছু পদক্ষেপের ফলে দেশের অনেকটা উন্নতিও হয়েছে সত্য। এরপরও বিভিন্ন স্তরে সরকারি এবং বেসরকারি শিক্ষক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পার্থক্য রয়েই গেছে।

০১. সরকারিরা বাড়িভাড়া মূলবেতনের ৪০-৪৫% বা বেশি পান, বেসরকারিরা ১০০০/= টাকা পান পিয়ন থেকে প্রিন্সিপাল সবাই।
০২. সরকারিরা পূর্ণাঙ্গ মেডিক্যাল ভাতা পেলেও বেসরকারিরা পান ৫০০/=।
০৩. সরকারিরা উৎসবভাতা মূলবেতনের সমান ও বেসরকারিদের উৎসবভাতা মূল বেতনের ২৫% শিক্ষকদের জন্যে ও কর্মচারীরা ৫০%।
০৪. সরকারিদের ইনক্রিমেন্ট প্রতিবছর বেতনের সাথে যোগ হয়।বেসরকারিদের বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট নেই।
০৫. সরকারিদের বদলি, পদোন্নতি, বিনোদন ভাতা আছে। বেসরকারিদের বদলি, পদোন্নতি, বিনোদন ভাতা নেই।
মানুষের মৌলিক প্রয়োজন অন্ন, বস্ত্র, চিকিৎসা, বাস¯’ানের মতোই ‘শিক্ষা’ মানুষের মৌলিক অধিকার। একটি কল্যাণরাষ্ট্র মানুষের মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা দেয়। আমাদের সরকারও মানুষের পাঁচটি মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তার জন্য নিরলস কাজ করে যা”েছ। কাজেই, শিক্ষা জাতীয়করণ হলে:
i. গরিব-দূঃখি সবার সন্তান উন্নততর শিক্ষার সুযোগ পাবে।
ii. গরিবের শিক্ষালাভের সুযোগ বাড়বে এবং ব্যয় কমবে।
iii. গ্রামের মানুষকে শহরে গিয়ে উ”চশিক্ষার জন্য ভীড় করতে হবে না। সবার তো শহরে যাওয়ার সামর্থ্যও নেই। এ সমস্যার সমাধান হবে।
iv. বড় বড় শহরে জন-স্ফীতি হ্রাস পেলে যানজট থাকবে না।
v. শিক্ষাক্ষেত্রে গুণগত পরিবর্তন হবে।
vi. মান সম্মত শিক্ষা ও শিক্ষকের ঘাটতি দূর হবে।
vii. ভাল প্রতিষ্ঠান, খারাপ প্রতিষ্ঠানের প্রচলিত ধারণা থাকবে না।
viii, সবার জন্য শিক্ষা, নারী শিক্ষা, কর্মমুখী বা কারিগরি শিক্ষা সব ক্ষেত্রে প্রভুত উন্নতি সাধিত হবে।
ix. ক্রমশ একমুখী শিক্ষাব্যবস্থা চালু করা সহজ হবে।
x. মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন হবে সহজতর এবং দ্রুত।

প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য, মানুষ গড়ার কারিগরকে এমপিওভুক্তির নামে দেওয়া হয় অনুদান। এমপিওভুক্তগণের প্রত্যাশিত ৫% প্রবৃদ্ধি ও বৈশাখিভাতা নিয়ে জিজ্ঞাসার উত্তর মিলছে না! ২০১৫ বেতনস্কেলের নিদের্শনায় রয়েছে নতুন করে পাঁচ বছর অন্তর বেতনস্কেল হবে না। বৎসরান্তে জুলাই মাসে জাতীয় বেতনস্কেলভুক্তগণ ৫% বার্ষিক প্রবৃদ্ধি সুবিধা পাবেন, যা চক্রবৃদ্ধি হারে অব্যহত থাকবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আগ্রহে ২০% বৈশাখিভাতা চালু হয়। অথচ জাতীয় বেতনস্কেলভুক্ত সবাই সুবিধা দু’টি ইতোঃমধ্যেই পেলেও শুধু বঞ্চিত রয়ে গেছেন এমপিওভুক্তগণ।

বেসরকারি শিক্ষকদের প্রত্যাশার মধ্যে রয়েছে: সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ব্যব¯’াপনা কমিটি বা পরিচালনা পরিষদ দলীয় রাজনীতি মুক্ত রাখা এবং তা সংস্কার করে সভাপতি ও সদস্যদের শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ, বি”িছন্ন ও খÐিতভাবে স্কুল কলেজ জাতীয়করণের চলমান প্রক্রিয়ার পাশাপাশি সুনিদির্ষ্ট পরিকল্পনা প্রণয়ন করে শিক্ষা জাতীয়করণ করা, সিলেবাস অনুযায়ী বিষয়ভিত্তিক পর্যাপ্ত সংখ্যক শিক্ষক নিয়োগ ও অনার্সসহ স্কুল, মাদ্রাসা, কলেজের সকল স্তরের নন-এমপিও শিক্ষকদের নিঃশর্তভাবে শীঘ্রই এমপিওভুক্ত করা, শিক্ষাখাতে জাতীয় বাজেটের ২০% বা জিডিপির ০৬% বরাদ্দ নিশ্চিত করা, কর্মরত সব শিক্ষকের চাকুরির মেয়াদকাল ৬০ থেকে ৬৫ বছরে উন্নীত করা।

পরিশেষে সবার প্রত্যাশা ‘দেশের সমগ্র শিক্ষাব্যব¯’া’ অচিরেই জাতীয়করণের যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন শিক্ষক দরদী প্রধানমন্ত্রী, জননেত্রী শেখ হাসিনা। কেননা, তাঁর উন্নয়নের মহা সড়কে বড়ই বেমানান শোনাবে যদি লাখ লাখ ‘সাদা অন্তর’ গুমড়ে কেঁদে ওঠে:
“আমি যেন সেই ভাগ্যাহত বাতিওয়ালা
পথে পথে আলো দিয়ে বেড়াই
কিন্ত নিজের জীবনেই অন্ধকার মালা”।
(‘তালেব মাস্টার’: আশরাফ সিদ্দিকী)
লেখক: সহকারী অধ্যাপক কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজ কাপাসিয়া গাজীপুর

একই ধরনের আরও সংবাদ