অধিকার ও সত্যের পথে

এমপিওভুক্ত  বেসরকারি শিক্ষকদের সমস্যার সমাধান কোন পথে?

 মোঃ মঈনুদ্দিন চৌধুরী:

বাংলাদেশে শিক্ষার সার্বিক উন্নয়নে এমপিওভুক্ত শিক্ষক তথা এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবদান শতকরা প্রায় ৯৪%। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই ৯৪% শিক্ষক সম্প্রদায় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে সরকার তথা রাষ্ট্রের অবদান কতটুকু? বাংলাদেশের বিভিন্ন সেক্টরে এমনকি শিক্ষা সেক্টরের বিভিন্ন অংশে কম-বেশি গবেষনা হলেও এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক তথা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিয়ে গবেষকগনের  সুনির্দিষ্ট   গবেষনা কর্ম সচরাচর দেখা যায়না।

কিছু কিছু স্বনামধন্য পত্রিকায় মাঝে মাঝে এবিষয়ে প্রতিবেদন কিংবা লেখালেখি হলেও সংস্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এক্ষেত্রে নির্বিকার  রয়েছেন বলেই মনে হচ্ছে। যেকোন কর্মক্ষেত্রেই ব্যবস্থাপনার উচ্চস্তর, মধ্যস্তর ও নিম্নস্তরের কর্মীদের জন্য নিজ নিজ পদবী ও বেতনস্কেল মোতাবেক বাৎসরিক ইনক্রিমেন্টসহ বিভিন্নধরনের ভাতার (যেমন-বাড়িভাড়া, চিকিৎসাভাতা, উৎসবভাতা, শিক্ষাভাতা, বৈশাখীভাতা ইত্যাদি) ব্যবস্থা থাকে। সমগ্র চাকুরিজীবনে টাইমস্কেলসহ কয়েকদফা পদোন্নতির ব্যবস্থা থাকে। কিন্তু অপ্রিয় হলেও এটিই চরম সত্যযে, বাংলাদেশের এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে(স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায়) শিক্ষকদের জন্য মূলবেতনভাতা ১০০% ব্যতিত  আর কিছু নেই বললেই চলে। অর্থাৎ (প্রতিষ্ঠান প্রধান থেকে ঝাড়ুদার) বাড়িভাড়া ১০০০ টাকা,চিকিৎসাভাতা ৫০০ টাকা, কোন ইনক্রিমেন্ট নেই,(মাসিক থোক বরাদ্দ হিসেবে প্রতিকী একটি ইনক্রিমেন্ট ছিল-যা ৫% ইনক্রিমেন্ট দেয়ার কথা বলে কেড়ে নেয়া হয়েছে , সমগ্র চাকুরিজীবনে অনুপাত প্রথার শর্তে যদিও একটি পদোন্নতির ব্যবস্থা রয়েছে কিন্তু তা সবার ভাগ্যে জোটেনা। অর্থাৎ গল্পের আদুভাইয়ের মত কেউ কেউ সপ্তম শ্রেনী থেকে অষ্টম শ্রেনীতে  প্রমোশন পান, অন্যেরা সবাই সপ্তম শ্রেনীতেই থেকে যান। উদাহরনস্বরূপ বলা যায়, কেউ কলেজের শিক্ষক হলে তাকে  প্রভাষক হিসেবেই  (সারাজীবন জেলখানায় থাকার মত) তুষ্ট থাকতে হবে। অন্যদিকে কেউ সৌভাগ্যক্রমে সহকারি অধ্যাপক হতে পারলেও সহযোগী অধ্যাপক কিংবা অধ্যাপক হওয়ার কোন সুযোগ নেই। উৎসবভাতা শিক্ষকগন মূলবেতনের ২৫% ,অন্যদিকে কর্মচারিগন পাচ্ছেন ৫০%।

এ কেমন বিবেচনা?  বৈশাখ বাঙালীর প্রাণের উৎসব হলেও  সবাই পহেলা বৈশাখ পালন করবে বৈশাখী ভাতা নিয়ে, এমপিও শিক্ষকগন কেন  শূন্য হাতে পালন করবে?স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগেযে, অন্যান্য সেক্টরে যদি সাম্যতার নীতি অবলম্বন করা হয় এক্ষেত্রে  বৈষম্য কিংবা অব্যবস্থাপনা কেন?এককথায় বলা যায় যে, এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়নের কোন সুযোগ নেই, যদিও জাতীয় শিক্ষানীতি ও বাংলাদেশের  গৌরবময় সংবিধান শিক্ষকদের সে অধিকার দিয়েছে, আই এলও কিংবা ইউনেস্কো সনদও একই কথাই বলছে।

কেন  এমপিওভুক্ত শিক্ষকগন দারিদ্রতার কষাঘাতে নিমজ্জিত হয়েও  শিক্ষার সমস্ত দায় নিজেরা বহন করবে আর সমশ্রেনীর অন্যেরা রাষ্ট্রের সকল সুবিধা লাভ করেও  সমস্ত দায় থেকে মুক্তি লাভ করবে? সোজা কথা বাংলাদেশের এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক/ কর্মচারিদের জন্য বিদ্যমান প্রেষনা কিংবা প্রনোদনামূলক ব্যবস্থা সন্তোষজনক নয়। অন্যকথায় বলা যায়- এক্ষেত্রে বিদ্যমান ব্যবস্থা ঔপনিবেশিক আমলের মত বৈষম্যমূলক-যার মাধ্যমে একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেন্জ মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। তাছাড়া এরূপ ব্যবস্থা  মানব সম্পদ বিণির্মানে ও দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে সহায়ক নয়। সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের (আর্থিক ও অনার্থিক প্রেষনা) সুযোগ-সুবিধার মধ্যে রয়েছে আকাশ-পাতাল পার্থক্য যা সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এবং  সাম্যতা নিশ্চিতকল্পে কাম্য নয়, তাছাড়া এরূপ ব্যবস্থা মহান মুক্তি যুদ্ধের চেতনার সম্পূর্ন পরিপন্থি।এমপিও শিক্ষক/কর্মচারিগন যার যার শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং অন্যান্য যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা মোতাবেক কিকি সুবিধা পাওয়া উচিত এবং তারা কিকি সুবিধা পাচ্ছেন কিংবা বিভিন্ন ন্যায্য ও আইনানুগ সুবিধাসমূহ কেন পাচ্ছেননা তা বিচারের ভার শিক্ষা মন্ত্রনালয়, অর্থমন্ত্রনালয়সহ বাংলাদেশের সকল চিন্তাশীল ব্যক্তির বিবেকের  উপর ছেড়ে দিলাম।

স্বাধীনতার পর থেকে আজ অবধি এমপিওভুক্ত শিক্ষকগনের আর্থিক ও অনার্থিক সুবিধা (প্রেষনা) যেভাবে কচ্ছপ গতিতে অগ্রসর হচ্ছে এভাবে চলতে থাকলে আগামী ৫০ বছরেও শিক্ষকদের দারিদ্রতা নিরসন সম্ভব হবেনা। কেননা এমপিও শিক্ষকগনকে ধাপে ধাপে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা প্রদান করতে গেলে  যুগের পর যুগ পেরিয়ে যাবে- এর  ফলে শিক্ষার সার্বিক মান উন্নয়ন ব্যাহত হবে। শুধু তাই নয় একটি উন্নত দেশ হিসেবে উন্নীত হওয়ার জন্য বাংলাদেশের যে প্রয়াস তা অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে।

তাই এই  ক্ষেত্রে অন্যতম মহৌষধ  কিংবা  এমপিও শিক্ষকদের দুঃখ-দুর্দর্শা মোচনের একমাত্র প্রতিকার বা সমাধান হচ্ছে সকল এমপিওভুক্ত শিক্ষক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একযোগে জাতীয়করন। জাতীয়করন করলে এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সকল অর্থ-সম্পদ  সরকারি কোষাগার জমা হবে। সুতরাং  গড়ে সার্বিকভাবে সরকার লাভবান হবেন এবং শিক্ষাব্যবস্থায় সাম্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। জাতীয়করনের পথে যদি  কোন সমস্যা থাকে তা সমাধানের জন্য  সংস্লিষ্টদের ইচ্ছা শক্তিই যথেষ্ট।

কেননা একথা ভুলে গেলে চলবেনা যে, বাংলাদেশ সরকার যেখানে কোন প্রকার বিদেশি সাহায্য সহযোগিতা ছাড়াই পদ্মা সেতু নির্মানে সফল হতে চলেছেন সেখানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সকল সম্পদ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা নেওয়ার পরও তা সম্ভব হবেনা কেন?  বিষয়টির প্রতি  মাননীয় প্রধান মন্ত্রীর সদয় দৃষ্টি আকর্ষন করছি।

 মোঃ মঈনুদ্দিন চৌধুরী,

সহকারি অধ্যাপক , ব্যবস্থাপনা বিভাগ,

শংকুচাইল ডিগ্রি কলেজ, বুড়িচং, কুমিল্লা

ইমেইলঃ

একই ধরনের আরও সংবাদ