অধিকার ও সত্যের পক্ষে

শ্রীবরদীতে সরকারি নীতিমালা লঙ্ঘন করে এক নামে ২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়

 এজেএম আহছানুজ্জামান ফিরোজ, শ্রীবরদী (শেরপুর) প্রতিনিধিঃ

শ্রীবরদীতে নিয়ম নীতি লঙ্ঘন করে একই মাঠে একই নামে দু’টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ একাধিক বিদ্যালয় স্থাপিত হয়েছে। বিদ্যালয় দু’টির জমিদাতাও একই ব্যক্তি। সরকারি নীতিমালা লঙ্ঘন করে এই অসম্ভব কাজটি সম্ভব হয়েছে উপজেলার গোশাইপুর ইউনিয়নে। সরকার ঘোষিত জাতীয়করণ সুযোগে উপজেলা শিক্ষা অফিসার ও স্থানীয় দালাল চক্রের যোগ সাজসে উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে দ্বিতীয় ধাপে ১৮টি এবং ৩য় ধাপে ২৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছে। বিগত ১২ নভেম্বর ২০১৭ ইং তারিখে শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের এক স্বারকে ১ম, ২য় ও ৩য় ধাপে অধিগ্রহণকৃত বিদ্যালয়গুলোর দুরত্ব এবং বিদ্যালয়গুলোতে পাঠদান হচ্ছে কিনা এ বিষয়ে উপজেলা শিক্ষা অফিসারের নিকট তথ্য চাওয়া হলে শিক্ষা অফিসার সরেজমিনে না গিয়ে তথ্য গোপন করে ভূয়া তথ্য প্রেরণ করেন। পরে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের বিভাগীয় উপ-পরিচালক ২১ ডিসেম্বর ২০১৭ ইং তারিখে শ্রীবরদী উপজেলা শিক্ষা অফিসারকে বিদ্যালয়গুলো সরেজমিনে পরিদর্শণ/তদন্ত করে প্রতিবেদনসহ স্থাপন ও চালুর অনুমতি পত্রের সত্যায়িত কপি প্রেরণের জন্য অনুরোধ করেন। কিন্তু শিক্ষা অফিসার রহস্যজনক কারণে তদন্ত প্রতিবেদন পাঠাতে কাল ক্ষেপন করছেন।

জানা যায়, শ্রীবরদী উপজেলার গোশাইপুর ইউনিয়নে একই মাঠে ছেউরিয়া কান্দাখিলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নামে দু’টি স্কুল স্থাপিত হয়েছে। বিদ্যালয় দু’টিতে রুটিন মাফিক সময়ে আলাদা আলাদা ভাবে পতাকাও উড়ছে। একটি বিদ্যালয়ে কিছু শিক্ষার্থী থাকলেও অন্যটিতে শিক্ষার্থী শূন্যের কোঠায়। উপজেলা শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর কর্তৃক অনগ্রসর এলাকায় সরকারি ভাবে ১৫০০টি বিদ্যালয় স্থাপনের পরিকল্পনা গ্রহণ করে। এরই আলোকে শ্রীবরদী উপজেলায় উক্ত প্রকল্পের আওতায় ছেউরিয়া কান্দাখিলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি ২০১০ সালে স্থাপিত হয়। যা ২০১২ইং সালে দু’তালা ভবনের নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়।

নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর বিদ্যালয় দু’টিতে সরকারিভাবে ০৩ জন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয় এবং শিক্ষকরা নিয়মিত ভাবে সরকারি কোষাগার থেকে বেতন-ভাতা উত্তোলন করছেন। এখানে কোন শিক্ষার্থী না থাকায় শিক্ষকরা শুধুমাত্র বিদ্যালয়ের অফিস কক্ষ খুলে পতাকা উত্তোলন করে অলস সময় অতিবাহিত করেন। এনিয়েও এলাকাতে চলে নানা কানাঘুষা।এর পরবর্তী সময়ে সরকার যখন দ্বিতীয় ধাপে রেজি: স্কুল জাতীয় করণ করেন তখন উক্ত স্কুল মাঠেই একই নামে আরও একটি স্কুল সরকারিকরণ করা হয়। এ স্কুলটির নামও ছেউরিয়া কান্দাখিলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। স্কুলটিতে ০৪ জন শিক্ষক আছে এবং শিক্ষকরা নিয়মিত ভাবে সরকারি কোষাগার থেকে বেতন-ভাতা উত্তোলন করছেন। এ স্কুল দুটির প্রায় ২০০ মিটার দুরত্বে ছেউরিয়া কন্দপখিলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নামে আরও একটি স্কুল জাতীয়করণ হয়েছে। সেখানেও ০৪ জন শিক্ষক সরকারি কোষাগার থেকে বেতন-ভাতা উত্তোলন করছেন। সরকার ঘোষিত জাতীয় করণের সুযোগে উপজেলা শিক্ষা অফিসার ও স্থানীয় দালাল চক্রের যোগ সাজসে সরকারি নীতিমালা লঙ্ঘন ও তথ্য গোপন করে শ্রীবরদীতে যত্রতত্রভাবে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছে। এসকল বিদ্যালয়ের অনেকগুলোতেই হয় না পাঠদান। ফলে পাঠদান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। এতে করে সরকারের কোষাগার থেকে ব্যয় হচ্ছে কোটি কোটি টাকা
উপজেলা শিক্ষা অফিস সূত্রে জানাগেছে, শ্রীবরদী উপজেলায় ১০ নভেম্বর ২০১৩ সালে দ্বিতীয় ধাপে ১৮টি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও তৃতীয় ধাপে ১৯ ফেব্রæয়ারী ২০১৫ সালে ২১ টি বিদ্যালয় জাতীয়করণের অন্তর্ভুক্ত হয়। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের নীতিমালা অনুযায়ী এক বিদ্যালয় থেকে অন্য বিদ্যালয়ের দুরত্ব কমপক্ষে দুই কিলোমিটার হওয়া আবশ্যক। কিন্তু সরকারি নীতিমালা লঙ্ঘন ও তথ্য গোপন করে উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধাপে ৩৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছে।

এসকল বিদ্যালয় গুলোর দুরত্ব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও নব ঘোষিত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে দুই কিলোমিটারের কম। এর মধ্যে অনেক বিদ্যালয়ের দুরত্ব আবার আধা কিলোমিটার থেকে শুরু করে এক/দেড় কিলোমিটারও রয়েছে। তাছাড়া বিদ্যালয় গুলোর অবকাঠামোরও বেহাল দশা। এসকল বিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ, বসার মত চেয়ার টেবিল ও বেঞ্চ নাই। কাগজে কলমে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি থাকলেও বাস্তবে তা নাই। অনেক বিদ্যালয়ে শিক্ষকরা আবার সময় মত উপস্থিত হয় না।

সম্প্রতি সরেজমিনে উপজেলার নইলার পাড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা গেছে শিক্ষক-শিক্ষার্থী বিহীন স্কুল ঘরটি তালাবদ্ধ রয়েছে। এছাড়া, কালিদহের পাড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দক্ষিণ ভারেরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ঘোরজান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ছেউরিয়া কন্দপখিলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কুড়িকাহনিয়া মিয়াপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, তেজারকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পুর্ব গিলাগাছা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কলাকান্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাটিয়াকুড়া দক্ষিণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও গড়জরিপা উত্তর-পূর্ব পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ঘুরে দেখা গেছে এসকল বিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর উপস্থিতিও কম। এসকল বিদ্যালয়ের প্রত্যেকটাই দু’চালা টিন সেড। অনেক বিদ্যালয়ে আবার আলাদা কোন শ্রেণি কক্ষ নাই।

এসকল বিদ্যালয়ে ঠিকমত পাঠদানও করা হয় না এমন অভিযোগও রয়েছে। বিদ্যালয়গুলোর মেঝে স্যাঁতস্যাঁতে, চেয়ার-টেবিল ও বেঞ্চের সংখ্যাও কম। বিগত ১২ নভেম্বর ২০১৭ ইং তারিখে শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের এক স্বারকে ১ম, ২য় ও ৩য় ধাপে অধিগ্রহণকৃত বিদ্যালয়গুলোর দুরত্ব এবং বিদ্যালয়গুলোতে পাঠদান হচ্ছে কিনা এ বিষয়ে উপজেলা শিক্ষা অফিসারের নিকট তথ্য চাওয়া হলে শিক্ষা অফিসার সরেজমিনে না গিয়ে তথ্য গোপন করে ভূয়া তথ্য প্রেরণ করেন। এছাড়া, এসকল বিদ্যালয় সমুহের স্থাপন ও চালুর অনুমতিপত্র যথাযথ নয় বলে অভিযোগ হলে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের বিভাগীয় উপ-পরিচালক ২১ ডিসেম্বর ২০১৭ ইং তারিখে শ্রীবরদী উপজেলা শিক্ষা অফিসার অরুনা রায়কে বিদ্যালয়গুলো সরেজমিনে পরিদর্শণ/তদন্ত করে প্রতিবেদনসহ স্থাপন ও চালুর অনুমতি পত্রের সত্যায়িত কপি প্রেরণের জন্য অনুরোধ করেন। কিন্তু উপজেলা শিক্ষা অফিসার রহস্যজনক কারণে এখন পর্যন্ত তথ্য প্রেরণ করেন নাই। এছাড়া, বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষক জাতীয় করণের জন্য ক,খ,গ ও ঘ ছক পূরণ করে প্রেরণ করার জন্য শিক্ষা মন্ত্রনালয় থেকে শিক্ষা অফিসারের নিকট চিঠি প্রেরণ করা হয়। উপজেলা শিক্ষা অফিসার বিদ্যালয়গুলো পরিদর্শণ না করে পুণরায় ভূয়া তথ্যের মাধ্যমে পূরণকৃত ক,খ,গ ও ঘ ছক যাছাই বাছাই না করে প্রেরণ করা হয়েছে বলে জানাগেছে।

এব্যাপারে উপজেলা শিক্ষা অফিসার অরুনা রায়ের সাথে কথা হলে তিনি বলেন, বিগত শিক্ষা অফিসারদের সময় বিদ্যালয়গুলো স্থাপন করা হয়েছে। দ্বিতীয় ধাপের স্কুলগুলো বেতনভুক্ত হয়েছে, তৃতীয় ধাপের স্কুলগুলো তদন্ত সাপেক্ষে রিপোর্ট পাঠানো হবে। স্থাপন ও চালুর অনুমতি পত্রের সত্যায়িত কপি প্রেরণের ক্ষেত্রে তিনি বলেন, প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষার কাজে ব্যস্ত থাকার কারণে স্থাপন ও চালুর অনুমতি পত্রের সত্যায়িত কপি প্রেরণ করা সম্ভব হয় নাই। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের সাথে কথা হলে তিনি জানান, এক মাঠে একটি বিদ্যালয়ই থাকার কথা। কি কারণে এক মাঠে একই নামে দু’টি বিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছে তা তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। সরকারি নিয়মানুযায়ী দুই কিলোমিটারের মধ্যেই বিদ্যালয় স্থাপন করার কথা। কিন্তু নীতিমালা লঙ্ঘন করে জেলার অনেক জায়গাতেই দুই কিলোমিটারের কম দুরত্ব স্থানে বিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছে। এবিষয়েও নজর দেওয়া হবে।

একই ধরনের আরও সংবাদ