অধিকার ও সত্যের পক্ষে

কোটা পদ্ধতির যৌক্তিক সংস্কার প্রয়োজন

 আরাফাত শাহীন

কোটা পদ্ধতি সংস্কারের দাবিতে দেশে আন্দোলন শুরু হয়েছে। দেশের প্রায় সবগুলো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে দফায় দফায় ছাত্ররা আন্দোলন করেছেন। দেশের হাজার হাজার চাকুরীপ্রার্থী বেকার যুবকদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এ আন্দোলনকে যে বহুগুণে বেগবান করেছে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। এখানে একটা বিষয় খেয়াল রাখা দরকার যে, আন্দোলনকারীরা কোনো রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় কিংবা বর্তমান সরকারের বিপক্ষে গিয়ে আন্দোলন করছেন না। বরং বাস্তব সত্য হল, তারা সরকারের কাছ থেকে একটু অনুকম্পা আশা করছেন। তারা আশা করছেন, সরকার তাদের দুরবস্থার কথা উপলব্ধি করে তাদেরকে আশার বাণী শোনাবেন। এ আশায় বুক বেঁধে রয়েছেন দেশের অগণিত বেকার যুবক।

বর্তমান সময়ে এসে কোটা পদ্ধতির সংস্কার চেয়ে যে ব্যাপক আন্দোলন এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা শুরু হয়েছে তা সত্যিই অভূতপূর্ব। পূর্বে এমনটি আর কখনও দেখা যায়নি। অতীতে দু’একজন বুদ্ধিজীবী যে বিভিন্নভাবে কোটা পদ্ধতি সংস্কারের পক্ষে কথা বলেননি তেমন নয়; তবে বর্তমান সময়ে অধিকাংশ বুদ্ধিজীবীই এ ব্যাপারে বেশ সোচ্চার হয়েছেন। কোটা পদ্ধতি সংস্কারের জন্য আন্দোলনকারীরা যে দাবি করেছেন তাকে অযৌক্তিক বলে উড়িয়ে দেবার কোনো সুযোগ নেই। তারা বলছেন, সরকারি চাকুরীতে ১০ শতাংশ কোটা রাখা হোক। এবার আমাদের জানা প্রয়োজন বর্তমানে ঠিক কত শতাংশ কোটা বিদ্যমান রয়েছে। হিসাব করে দেখা যায়, বর্তমান সময়ে বিভিন্ন সরকারি চাকুরীতে ৫৬ শতাংশ কোটা বিদ্যমান রয়েছে। বর্তমান ব্যবস্থা অনুযায়ী সরকারি কর্ম কমিশন যদি ১০০ জন লোক নিয়োগ দেয়, তাহলে মাত্র ৪৪ জন নিয়োগ পাবেন মেধার ভিত্তিতে। বাকিদের ৩০ জন মুক্তিযোদ্ধা কোটা, ১০ জন নারী কোটা, ১০ জন জেলা কোটা ও ৫ জন উপজাতি কোটায় নিয়োগ পান। ১ শতাংশ নিয়োগ পান প্রতিবন্ধী কোটায়।

একমাত্র বাংলাদেশ ব্যতীত বিশ্বের আর কোনো দেশে এমন কোটা পদ্ধতি নেই। বিভিন্ন সময় প্রয়োজনের প্রেক্ষিতে সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে এগিয়ে নিতে কোটা পদ্ধতি রাখা হয় ঠিকই; কিন্তু ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ প্রথার মত কোটা পদ্ধতি পৃথিবীর আর কোনো দেশে নেই। এখন প্রশ্ন হল, তাহলে বাংলাদেশে এখনও পর্যন্ত এ প্রথা কীভাবে বহাল তবিয়তে টিকে আছে? এ প্রশ্ন আমার একার নয়। এটি দেশের অগণিত মানুষের মনের কথা। ১৯৭২ সালে সরকারের এক নির্বাহী আদেশে কোটা পদ্ধতি চালু করা হয়। এরপর কোটা পদ্ধতির নানা ধরনের পরিবর্তন ও পরিমার্জন করা হয়েছে। ২০১২ সাল পর্যন্ত ৪৫ শতাংশ মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ হয়েছে। এই বছরে ১ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ায় মেধার ভিত্তিতে নিয়োগের সুবিধা দাঁড়ায় ৪৪ শতাংশ।

কোনো একটি দেশের সামগ্রিক উন্নতি, অগ্রগতি এবং প্রগতির জন্য দক্ষ ও মেধাবী জনসম্পদ একান্ত অপরিহার্য। অদক্ষ এবং অযোগ্য ব্যক্তিদের দ্বারা সরকারি কর্মকান্ড পরিচালিত হলে দেশ পিছিয়ে পড়তে বাধ্য। বাংলাদেশে প্রচলিত কোটা পদ্ধতির ফলে এমনটাই ঘটছে। সরকারি চাকুরীতে নিয়োগের ক্ষেত্রে যখন মেধা ও যোগ্যতার পরিবর্তে কোটার মাধ্যমে নিয়োগে গুরুত্ব আরোপ করা হচ্ছে তখন সেই সুযোগে বহু অদক্ষ ও অযোগ্য ব্যক্তি প্রশাসনে ঢুকে পড়ছে। আজকে সরকারের প্রতিটি খাতে সীমাহীন দুর্নীতি চলছে। বহু চেষ্টা সাধনা করেও দুর্নীতির মাত্রা কমিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। এর কারণ কী? যে সমস্ত অযোগ্য ব্যক্তি বড় বড় চেয়ার দখল করে বসে আছেন, তাদের নীতিহীনতার খেসারত আজ সমগ্র জাতিকে দিতে হচ্ছে।

সরকারি চাকুরীতে আগে শুধুমাত্র মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য কোটা নির্ধারণ করা ছিল। কিন্তু বর্তমানে তাঁদের নাতি-নাতনীদের জন্যও কোটা রাখা হয়েছে। আপনি যদি কোনো মুক্তিযোদ্ধাকে প্রশ্ন করেন, আপনি কীজন্য নিজের জীবন তুচ্ছ করে সেদিন হানাদার বাহিনীর অস্ত্রের সামনে বুক পেতে দাঁড়িয়েছিলেন? তিনি কি জবাবে বলবেন, চাকুরীর ক্ষেত্রে সুবিধা পাবার আশায় যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলাম? আশা করি মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া কোনো মহান ব্যক্তিই এমন জবাব দিবেন না। বস্তুত সেদিন মুক্তিযোদ্ধাগণ কোনোপ্রকার সুযোগ-সুবিধার কথা চিন্তা না করেই যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। আমি মনে করি, কোটা পদ্ধতির মাধ্যমে দেশের এক শ্রেণীর মানুষকে আসলে পরনির্ভরশীল করে রাখা হয়েছে। একটা বিষয় চিন্তা করুন, চাকুরীতে যাদের জন্য কোটা সংরক্ষণ করা আছে, তাদের জন্য স্বল্প পরিশ্রম করলেও চলবে। এই প্রতিযোগিতার বাজারে যদি কম পরিশ্রম করে বড় বড় পদে অধিষ্ঠিত হওয়া যায় তাহলে বেশি পরিশ্রম করতে কে চায়? এভাবে দিনদিন একটি অলস ও অকর্মণ্য শ্রেণীর মানুষের জন্ম হচ্ছে। দেশ ব্যর্থ হচ্ছে একটি মেধাবী জাতি তৈরি করতে।

বাংলাদেশে প্রচলিত কোটা পদ্ধতি সংবিধান পরিপন্থী। রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে দেশের প্রতিটি মানুষকে রাষ্ট্রের সমান সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা কর্তব্য। অথচ কোটা পদ্ধতির মাধ্যমে এক শ্রেণীর মানুষকে বিশেষ সুবিধা প্রদান করা হচ্ছে আর অপর এক শ্রেণীর মানুষকে তার মেধা ও যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও  প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। এটা কি সংবিধানের লঙ্ঘন নয়? বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এমন অসমতাভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চাননি। বরং তিনি চেয়েছিলেন রাষ্ট্রের সমস্ত নাগরিক সমতার ভিত্তিতে বসবাস করবে। আমরা বঙ্গবন্ধুর সেই সমতাভিত্তিক সোনার বাংলা দেখতে চাই; যেখানে দেশের প্রত্যেক নাগরিক সমান সুযোগ-সুবিধা ভোগ করবে। দেশে প্রচলিত কোটা পদ্ধতির দরুন দেশে যেমন বেকারত্বের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে তেমনি অনেক মেধাবী চাকুরীপ্রার্থী চাকুরীর সন্ধানে বিদেশে পাড়ি জমাতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে দেশ এসব মেধাবীদের সার্ভিস হতে বঞ্চিত হচ্ছে। আমরা আশা করবো, বর্তমান সরকার কোটা পদ্ধতি সংস্কারের যৌক্তিকতা উপলব্ধি করবে এবং অবিলম্বে কোটা পদ্ধতি সংস্কারের জন্য যুক্তিপূর্ণ কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।

লেখক: শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

একই ধরনের আরও সংবাদ