অধিকার ও সত্যের পথে

হাহাকার চারিদিকে পানির অভাবে আজ বিপন্ন প্রকৃতি ভাটা পড়েছে যৌবনে

 মহিবুলইসলাম, নাটোর প্রতিনিধিঃ

নদীমাতৃক দেশ হিসেবে এক সময় বাংলাদেশ  পরিচিতি লাভ করেছিল। তার গ্রামীণ পরিবহন ব্যবস্থার একটা বৃহত্তর অংশ ছিল নদী পথে এবং নদীর পানি এই দেশের কৃষি ব্যবস্থাকে শুধু বাঁচিয়ে রাখেনি বরং নদ নদীতে উৎপাদিত মাছ আমাদের প্রোটিন চাহিদা পূরণের প্রধান উৎস হিসেবেও বিবেচিত হতো।

পানিতে চারিদিক থাকতো ভরপুর কিন্তু বর্তমানে
হাহাকার চারিদিকে পানির অভাবে আজ বিপন্ন প্রকৃতি ভাটা পড়েছে সব নদীর যৌবনে–

এক সময় বলা হতো মাছে ভাতে বাংঙ্গালী। সময়ের বিবর্তনে আমাদের নদীগুলো এখন হারিয়ে যেতে বসেছে, তাদের হাজার হাজার শাখা নদী ও খাল বিলে এখন পানি নেই। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে চর পড়ে গেছে, অনেক স্থানে নদী ও খাল ভরাট করে মানুষ চাষাবাদ করছে, উঠেছে বসবাসের জন্য বড় বড় দালান।
তেমনই এক নদী নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার উপর দিয়ে বয়ে চলা বড়াল নদী।বড়াল নদী বা বড়াল আপার নদী বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের রাজশাহী জেলা এবং নাটোর জেলার একটি নদী। নদীটির দৈর্ঘ্য ৮৯ কিলোমিটার, গড় প্রস্থ ৬৩ মিটার এবং নদীটির প্রকৃতি সর্পিলাকার। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড বা “পাউবো” কর্তৃক বড়াল আপার নদীর প্রদত্ত পরিচিতি নম্বর উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের নদী নং ৭৭।[১] এটি পদ্মা নদীর একটি শাখা নদী। ( তথ্য সুত্র উইকিপিডিয়া)
শুনেছি নদীর নামে মিলিয়েই রাখা হয়েছিলো  উপজেলার নাম। উপজেলা থাকলেও নদী আজ কোন এলাকায় অতীত আর কোন এলাকায় শুধু খাল ছারা কিছু নয়।
বড়াইগ্রামের বনপাড়ার কাটাশকুল গ্রামের বাদশা সরদার (৭৫+)  বলেন, আমি ছোট বেলায় আমাদের এই নদী থেকে কত মাছ ধরেছি। নৌকা নিয়ে ঘুরেছি। আর এখন নদী নেই তাকালে শুধু বাড়িঘর ছারা আর কিছু দেখা যায়না।
বাদশা সরদার অবসর প্রাপ্ত গ্রাম পুলিশ হওয়ায় তিনি আরো বলেন, আমি এলাকায় ঘুরে ঘুরে দেখেছি আমার চোখের সামনে এই নদীকে মানুষ দখল করে আজ বিলিন করে দিয়েছে। এরসাদ সরকারের আমলে   একবার নদী লেবার দিয়ে কেটেছিলো কিন্তু পরবর্তীতে আর কোন উদ্যোগ না থাকায় সব দখল হয়ে গেছে। এখন কিছু কিছু স্থানে নদীর চিহ্নই খুজে পাওয়া যায়না। অথছো এক সময় কত পরিবার এই নদীতে মাছমেরে সংসার চালিয়েছে। আজ বাজারে না কিনলে মাছ খাওয়া হয়না।

একই এলাকার অবসর প্রাপ্ত শিক্ষক ও একজন বড় কৃষক ইসাহাক আলী ( ৭২) বলেন,  আমাদের এলাকার এই নদী মরে যাওয়ায় এলাকার নানা পেশাজিবি মানুষের নানাবিদ সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। দিন দিন পানির আধারগুলো দূষিত হওয়ার পাশাপাশি পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। আবহাওয়া হয়ে গেছে রুক্ষ, ফসলি ক্ষেতে গভীর গর্ত করে সেচযন্ত্র বসিয়েও পানি পাওয়া যাচ্ছে না। পুকুরে পানি নেই।  বিশেষ করে মাছ চাষে এবং বোরো ফসল উৎপাদনের ক্ষেত্রে পানির বিশেষ প্রয়োজন। এ সময় মাছ চাষ করতে সেচযন্ত্রের সাহায্যে পুকুর ভর্তি করে রাখতে হচ্ছে। অন্যদিকে বোরো ফসল পানিনির্ভর হওয়ার কারণে গোটা মৌসুমেই দেখা দিচ্ছে অতিরিক্ত পানির প্রয়োজনীয়তা।
নদীমাতৃক দেশে আজ পানির আকাল! আর সে কারণে বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্য, কৃষি, মৎস্য, শিল্প, জ্বালানি, নৌ-চলাচল ও সেচের ওপর পড়ছে ভয়াবহ ক্ষতিকর প্রভাব।

বড়াইগ্রামের বনপাড়ার অবসর প্রাপ্ত উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা অশ্বীনি সরকার ( ৬৫) বলেন, এই নদী এক সময়  এলাকার কৃষকদের চাষাবাদে পানির অভাব মিটাতো। এতে কৃষকদের উৎপাদন খরচ কম হতো আবার পানির অভাবও মিটতো। কিন্তু নদী মরে যাওয়ায় এখন কৃষকরা মাটির নিচের পানি নির্ভর হয়ে পড়ায় উৎপাদন খরচ বাড়ার পাশাপাশি পানি অভাবে পরছে। বড়াল নদীর মতই এক সময় বাংলাদেশ ছিল সহস্র নদীর দেশ। বৈরী জলবায়ু, মানুষের অবহেলা, অসচেতনতা, নদী শাসনসহ নানাবিধ কারণে দেশের অধিকাংশ নদীই আজ জীবন্মৃত। কালের স্রোতে থেমে গেছে অনেক নদীর স্রোত। নদী মরে গেলে যে রেখা থাকে; তাও আজ বিলীন হয়ে গেছে। পানির দেশ বাংলাদেশ হলেও আজ এ দেশেই পানির জন্য উঠেছে হাহাকার। বলতে গেলে প্রায় সব ঋতুতেই এ হাহাকার পরিলক্ষিত হয়। তবে পানির প্রাপ্যতা শেষ প্রান্তে গিয়ে ঠেকে গ্রীষ্ম মৌসুমে। পানি ছাড়া জীবনের অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না। খাদ্যের প্রয়োজনে পানি, সেচের জন্য পানি, বলতে গেলে জীবনের প্রয়োজনে পানির ভূমিকা অপরিহার্য। এর জন্য কৃষিকাজ যেমন ব্যাহত হচ্ছে তেমনি ধ্বংসের মুখে পতিত হচ্ছে দেশের জীববৈচিত্র্য। পাশাপাশি ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে মানুষের জীবনযাত্রা।

এমতা অবস্থায়য় পানি ধরে রাখার জন্য দেশের বিভিন্ন নদ-নদী খননের প্রয়োজন। সুপেয় পানির জন্য বৃষ্টির পানিকে সংরক্ষণ করতে হবে। শিল্পবর্জ্য, পলিথিন বর্জ্য, পয়ঃবর্জ্যসহ নানা বর্জ্যে যাতে বিষাক্ত হয়ে না ওঠে নদী সেদিকে সবার সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। দেশের নদ-নদীতে পানিপ্রবাহ যাতে ঠিক থাকে সেদিকে জোর তৎপরতা চালাতে হবে। কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই ভূগর্ভস্থ অতিরিক্ত পানি উত্তোলনের ফলে অদূর ভবিষ্যতে পানির সংকট চরমে পৌঁছাবে। বর্তমানে চাষের জন্য বেশিরভাগ পানিই ভূগর্ভস্থ থেকে উত্তোলন করা হচ্ছে। এর বিকল্প ব্যবস্থা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব খুঁজে বের করতে হবে। জীববৈচিত্র্যের অবস্থান অক্ষুণ্ণ রেখে জীবনের স্বাভাবিকতাকে ধরে রাখতে পানির প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি ও সামাজিকতার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় পানির কোনো বিকল্প নেই। ‘পানিই জীবন’ এ কথা মাথায় রেখে পানি দূষণ, অপচয় রোধ ও পানির ব্যবস্থাপনার কৌশল নির্ধারণ করা এখন সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে।

একই ধরনের আরও সংবাদ