অধিকার ও সত্যের পক্ষে

‘শিক্ষার সঠিক নীতিমালা না থাকাটা দুঃখজনক’

 আমিনুল ইসলাম :

‘শিক্ষার ওপর একটা দেশের ভীত রচিত হয়। স্বাধীনতার এতো বছর পরেও আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার সঠিক কোনো কাঠামো নেই। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। ৪৬ বছর একটি দেশ শিক্ষানীতি ছাড়া এগিয়েছে এটা চিন্তা করতেও খারাপ লাগে। আসলেই কি আমরা এতো বছর পর শিক্ষা নিয়ে এগিয়েছি নাকি পিছিয়েছি?’

শিক্ষবার্তা ডট কম এর সাথে একান্ত সাক্ষাতকারে এমনটাই মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ও শিক্ষাবিদ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আমিনুল ইসলাম

শিক্ষবার্তা ডট কম: বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় সঠিক একটা নীতিমালা কতটা জরুরী?

আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক: একটা দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ওপরই সেই দেশটির ভীত রচিত হয়। কিন্তু স্বাধীনতার এতো বছর পরেও আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার সঠিক কোনো কাঠামো নেই। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। বর্তমান আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য একটি সঠিক নীতিমালা খু্বই গুরুত্বপূর্ণ।

শিক্ষবার্তা ডট কম:  স্বাধীনতার এতো বছর পরেও কেন শিক্ষার সঠিক নীতিমালা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি?

আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক:  স্বাধীনতার পর পরই বঙ্গবন্ধু কুদরত-ই-খোদা শিক্ষা কমিশন গঠন করেছিল। কিন্তু ক্ষমতার পালা বদল ও নানা সংকটের কারণে যেটা আর বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। বিভিন্ন সরকার বিভিন্ন ভাবে শিক্ষা কমিটি, কমিশন গঠন করেছে। কিন্তু সেই বিষয়গুলো শেষ পযর্ন্ত চুড়ান্ত হয়নি।২০১০ সালে এসে শেখ হাসিনার সরকার ২০১০ শিক্ষানীতি প্রণয়ন করেছে। সেটা বাস্তবায়নের পথে এখন এগিয়ে চলেছে। আমরা ধরতে পারি ২০১০ শিক্ষানীতি একটি স্বাধীন বাংলাদেশের সু-সমন্নিত শিক্ষানীতি। তবে শিক্ষা এমন একটি গতিশীল ক্ষেত্র যেখানে প্রতিনিয়ত পরিবর্তনের প্রয়োজন হচ্ছে।

শিক্ষবার্তা ডট কম:  অনেক ঢাক ঢোল পিটিয়ে ২০১০ শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের কথা বলা হলেও সেটা বাস্তবায়নে সরকারের তেমন কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না কেন?

আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক: আমি মনে করি যেহেতু একটা স্বাধীন দেশ। ১৯৭১ সালের পর ২০১০ এখানে ৪০ বছরের একটা গ্যাপ তৈরি হয়েছে। ৪০ বছর একটি দেশ শিক্ষানীতি ছাড়া এগিয়েছে এটি চিন্তা করতেও আমাদের খারাপ লাগে। আসলেই কি আমরা শিক্ষা নিয়ে এগিয়েছি নাকি পিছিয়েছি। আমার মনে হয় এই সময়টাতে আমরা পিছিয়ে গেছি। যে সময় চলে গেছে সেই সময় তো আমরা আর ফিরে পাবো না।কিন্তু আমাদের ২০১০ সালের শিক্ষানীতির ওপর ভীত করেই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। বিভিন্ন দেশের শিক্ষার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের এই শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন করতে হবে।

শিক্ষবার্তা ডট কম:  স্কুল পর্যায়ে রাজ নীতি ধারা শিক্ষার্থীদের জন্য কতটা সুফল বয়ে আনবে?

আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক: আমার মনে হয় স্কুল পর্যায়ে ছেলে-মেয়েদের মধ্যে রাজনীতির নামে বিভাজন সৃষ্টি করাটা ঠিক হবে না। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নাগরিক হিসেবে যে দায়িত্ব কর্তব্য থাকবে সেটা সবার মাঝে একই ভাবে থাকাটা জরুরী। যখন তারা আর একটু বড় হবে, কলেজ পর্যায়ে আসবে তখন তাদের মাঝে রাজনৈতিক সচেতনতা সৃষ্টি হবে। তখন তারা ভালো মন্দ বুঝতে পারবে। কিন্তু স্কুল পর্যায়ে রাজনৈতিক সংগঠনের প্রতিষ্ঠা করে তাদেরকে বিভাজনের মধ্যে ফেলাটা উচিত হবে না। স্কুল পর্যায়ে যে রাজনীতি হবে যেটা হলো মুক্তিযুদ্ধের চেতনার রাজনীতি। যে রাজনীতির মাঝে দেশপ্রেম থাকবে। এছাড়া বিভাজনের রাজনীতি স্কুল পর্যায়ে নিয়ে আসা ঠিক হবে না।

শিক্ষবার্তা ডট কম:  দীর্ঘ দিন ধরে কেন ডাকসু নির্বাচন হচ্ছে না? এই নির্বাচন না হওয়ার পেছনে সরকারের কোনো হাত আছে কি না?

আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক: এখানে সরকারের চেয়ে আমাদের দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ বেশি গুরুত্বপূণ। বিভিন্ন দল বিভিন্ন সময়ে সরকারে এসেছে কিন্তু আমাদের যে রাজনৈতিক পরিবেশ সেটি আমাদের বেশি সমস্যায় ফেলছে। যেমন ছাত্র সংগঠগুলোর নেতৃত্বে কারা আছে? ছাত্র সংগঠনের নেতৃত্বে নিয়মিত ছাত্রদের আসবে হবে। যারা শ্রেণি কক্ষে ক্লাস করছে, পরীক্ষার হলে পরীক্ষা দিচ্ছে এবং একটু পরেই তারা অপরাজেয় বাংলার সামনে এসে আন্দোলন সংগ্রামে যুক্ত হচ্ছে। আবার সেখান থেকে তারা ক্লাসে ফিরে যাবে। অর্থাৎ আমি যেটা বলতে চাচ্ছি, একজন নিয়মিত ছাত্র কিংবা ছাত্রী যখন ছাত্র সংগঠন গুলোর সাথে সম্পৃক্ত হবে তখন তাদের পক্ষে একটা সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করা সম্ভব হবে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ডাকসুকে সচল করার জন্য নানা ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা আগেও করেছে এখনও করছে। কিন্তু আমরা দেখেছি ৯০ এর ডাকসুর মেয়াদ শেষ হওয়ার পরে পরবর্তীতে ৯১ এ যে ডাকসু নির্বাচনের জন্য যে প্রক্রিয়া শুরু হলো তখনই কিন্তু ক্যাম্পাসে খুনো-খুনির ঘটনা শুরু হলো। এবং সেটি একই ছাত্র সংগঠনের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে হয়েছিল। এই ধরণের ঘটনার পূনরাবৃত্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন চায় না।

শিক্ষবার্তা ডট কম: খুব তাড়াতাড়ি ডাকসু নির্বাচনের সম্ভাবনা আছে কি না?

আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক: সেটা হয়তো বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলতে পারবে।

শিক্ষবার্তা ডট কম: নামি স্কুলে ভতি হতে, ক্লাসে প্রথম হতে হবে কিংবা এ প্লাস পেতে হবে, বাচ্ছাদের ওপর এই যে একটা চাপ এটা কোনো ভাবে উচিত কি না?

আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক: এটা কোনো ভাবেই উচিত না। শিশুদের লেখা-পড়া করানোর প্রয়োজনীয়তা আমরা উপলব্ধি করি। একই সাথে এই লেখা-পড়াটা শুধু মাত্র পরীক্ষায় পাশ করা, জিপিএ ৫ পাওয়া এই ধরণের প্রতিযোগীতার মধ্যে শিশুদের ফেলে দেয়াটা ঠিক হবে না। তাদেরকে খেলাধুলা, বিনোদন এগুলোর মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে তাদেরকে শিক্ষার সাথে যুক্ত করতে হবে। পৃথিবীতে আমরাই তো শুধুমাত্র একটি মাত্র দেশ না যারা শিশুদের নিয়ে কাজ করি। সব দেশের শিশুরাই তো লেখাপড়া করছে। তারা যখন ছোট অবস্থায় স্কুলে যায় তখন বোঝা যায়না তারা কি লেখাধুরার জন্য যাচ্ছে না পড়া-লেখার জন্য যাচ্ছে।আমার মনে হয় আমরা অযথা আমাদের শিশুদের পরীক্ষা চাপের মধ্যে ফেলে দিচ্ছি।এখান থেকে শিশুদের মুক্তি দেয়াটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

শিক্ষবার্তা ডট কম: পিএসসি-জেএসসি পরীক্ষার প্রয়োজনীয়তা আছে কি না?

আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক: আমার মনে হয় ছাত্র-ছাত্রীদের পরীক্ষা যত কমানো যায় তত ভালো। বিশেষ করে প্রাথমিক পর্যায়ে একটা পরীক্ষা তারপর মাধ্যমিক পর্যায়ে একটা পরীক্ষা। এর বেশি পরীক্ষার প্রয়োজন নেই। এই দুটি পরীক্ষার মধ্যে সিমাবদ্ধ রাখতে পারলে সবচেয়ে ভালো। এই বাড়তি দুটি পরীক্ষার কারণে শিশুদের একটা বাড়তি চাপে ফেলা হচ্ছে। যা তাদের সঠিক মানসিক বিকাশকে বাধাগ্রস্থ করছে।

শিক্ষবার্তা ডট কম: শিক্ষকদের মাঝে নৈতিকতার অভাব কেন দেখা দিচ্ছে? কেন তারা অপরাধমূলক কাযক্রমে জড়িয়ে যাচ্ছে?

আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক: এটার তো একটা দুইটা কারণ না। অনেক কারণ আছে। বর্তমানে সামাজিক মূল্যবোধের একটা অবক্ষয় ঘটেছে। এটা শুধু শিক্ষকতার ক্ষেত্রে নয়। সব খানেই আমরা লক্ষ করছি। শিক্ষকতা, আইনপেশা, আমলাতন্ত্র, ব্যবস্যা, রাজনীতি সব খানে একটা সামাজিক মূল্যবোধের অভাব তৈরি হয়েছে। মূল্যবোধের এই জায়টাতে আমাদের সংসোধনের উদ্যোগ নিতে হবে। শিক্ষায় নৈতিকতা বোধ্য, মূল্যবোধ, মানবতা বোধ এগুলোর উপর গুরুত্বদিয়ে পাঠ্যক্রম পূণ্যগঠন করা দরকার। আজকে যারা শিক্ষকতা পেশায় আসছেন তারা তো ছাত্রত্ব পার করেই শিক্ষকতা বা অন্য পেশায় আসছে। মূলত তাদের মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কারণটা নির্ণয় করে ব্যবস্থা নেয়াটা জরুরী। অন্যথায় শিক্ষা ব্যবস্থা চরম হুমকি পড়তে পারে।

শিক্ষবার্তা ডট কম: প্রশ্ন ফাঁস ব্যপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকার প্রশ্ন ফাঁস রোধে কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে না কেন?

আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক: শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য প্রশ্ন ফাঁস একটি মারাত্মক ব্যাধি। যারা প্রশ্ন তৈরি করে, যারা মুদ্রণ করে, যারা বিতরণ করে এই যে একটা বড় নেটওর্য়াক রয়েছে এদের কারো সম্পৃক্ততা ছাড়া প্রশ্ন ফাঁস হওয়ার সুযোগ নেই। প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ আসার সাথে সাথে যদি সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে কে দোষি সেটা চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তি দেয়া যায় তাহলেই শুধু এটা রোধ করা সম্ভব। এটিই একমাত্র পথ। যার মাধ্যমে আমরা প্রশ্ন ফাঁস রোধ করতে পারি। প্রশ্ন ফাঁস করে দেয়া মানে জাতির নতুন প্রজন্মকে ধ্বংস করে দেয়া শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দেয়া। প্রশ্ন ফাঁস শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংস করার একটা ষড়যন্ত্র।

শিক্ষবার্তা ডট কম: কোচিং বাণিজ্য শিক্ষার্থীদের কতটা ক্ষতি করছে?

আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক: আমাদের দেশে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে যে কোচিং ব্যবস্থা প্রচলিত আছে তার সাথে নানা ধরণের অপরাধও যুক্তা আছে। আমরা বিভিন্ন সময় শিক্ষার্থীদের ডিজিটাল জালিয়াতির জন্য জিঙ্গাসাবাদ করেছি তখন কিন্তু তারা কোনো না কোনো কোচিং সেন্টারের নাম বলেছে। আমার মনে হয় কোচিং সেন্টার গুলোকে অবিলম্বে বন্ধ করে দেয়া দরকার। সেই ধরণের নির্দেশনা কিন্তু শিক্ষা মন্ত্রণালয় দেয়া হয়েছে। সেটাকে বাস্তবায়ন করতে হবে।

শিক্ষবার্তা ডট কম: কোচিং বাণিজ্য বন্ধে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কঠোর নির্দেশনা থাকলেও কেন তা বন্ধ করা যাচ্ছে না?

আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক: আমার মনে হয় সেখানে দুর্নীতিগ্রস্থ প্রশাসন এবং শিক্ষকদেরও একটা শ্রেণি আর্থিকভাবে এর সাথে যুক্ত থাকছে এর কারণে বন্ধ করা যাচ্ছে না। নৈতিক দিক দিয়েও সবার একটু সচেতন হওয়া প্রয়োজন। সেই সাথে প্রশাসনিক যে দুর্নীতি সেটাও দূর করা জরুরী।

শিক্ষবার্তা ডট কম: আপনি ভিসির দায়িত্বে থাকার সময়ে শিক্ষক নিয়োগে বেশ কিছু অনিয়ম বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে। আপনি এই অভিযোগ গুালোকে কিভাবে দেখছেন?

আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক: আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্বে থাকা অবস্থায় যে নিয়োগ প্রক্রিয়া হয়েছে সেগুলো শতভাগ সচ্ছতার ভিত্তিতে হয়েছে। এবং সেসব নিয়োগে ছাত্র-ছাত্রীদের একমাত্র একাডেমিক যোগ্যতাই বিবেচিত হয়েছে। অনেকেই হয়তো সেই নিয়োগে নানা কারণে তাদের যে পছন্দের প্রার্থীকে নিয়োগ দিতে পারেনি এটি তাদের একটা অপপ্রচার। আমি নিশ্চিত আমি দায়িত্ব পালনের সময় যাদেরকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে সেখানে কোনো ধরণের অনিয়ম হয়নি।

শিক্ষবার্তা ডট কম: বতমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় শিক্ষার্থীরা কেন ভালো করতে পারছে না?

আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক: এটার একটা কারণ হলো আমাদের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় যে ভাবে খাতা মূল্যায়ন করা হয় তাতে অনেক সময় দেখা যায জিপিএ ৫ পাওয়া ছেলে-মেয়েরা ভর্তি পরীক্ষায় ভালো ফল করতে পারছে না। আবার দেখা যায় অনেকে জিপিএ ৫ না পেয়েও ভর্তি পরীক্ষায় অনেক ভালো করছে। আমার মনে হয় সেখানে খাতা মূল্যালন প্রক্রিয়ায় কিছুটা জটিলতা আছে। এই দিকে আমাদের নজর দেয়া দরকার। তবে একটা মূল্যায়ন দিয়েই কিন্তু একজন শিক্ষাথীর সার্বিক মূল্যায়ন করা যাবে না।

একই ধরনের আরও সংবাদ