অধিকার ও সত্যের পক্ষে

সু শিক্ষকের স্বকীয়তা ও পাঠদানের বৈচিত্র্যময়তা

 রহিমা আক্তারঃ

আলোর পথে যারা চলেন, আলোকিত হতে যারা বলেন, আর সমাজে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে আলোকবর্তিকা যার হাতে তিনি গলেন শিক্ষক। সভ্য জাতি গঠনে তার রয়েছে নিরলস চেষ্টা এবং এই গুরু দায়িত্বটিও তিনি অতি সুনিপনভাবে পালন করে আসছেন শুরু থেকেই। শিক্ষক এমন একজন কারিগর, যার হাতে তৈরী হয় কেবল দক্ষ মানব সম্পদ। তাই সেই কারিগরকে হতে হবে আধুনিক, দক্ষ ও বিজ্ঞ।

একজন শিক্ষকের সফলতা নির্ভর করে তার শিক্ষাদান কৌশলের উপর এবং শিক্ষার্থীর সুপ্ত প্রতিভা বিকাশে দক্ষতার উপর। একজন দক্ষ শিক্ষক তার শিক্ষার্থীর সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটিয়ে তার মননে সুশিক্ষার বীজ বপন করে দেন। শিক্ষক তার শৈল্পিক দৃষ্টি ও শক্তি দিয়ে শিক্ষার্থীর ভেতরে ভবিষ্যৎ সুনাগরিকের গুনাবলি বিকাশের ক্ষেত্র তৈরী করে দেন। শিক্ষকের আদর্শে শিক্ষার্থী অনুপ্রাণিত হয়। একজন সৎ, পরিশ্রমী ও নিষ্ঠানাবান শিক্ষক হলেন শিক্ষার্থীর নিকট সবচেয়ে উত্তম আদর্শ। শিক্ষকের জুতা থেকে মাথা পর্যন্ত সবই শিক্ষার্থীর কাছে ওণূকোড়ণীয়।

একজন আদর্শ শিক্ষকই পারেন আরেকজন আদর্শ মানুষ তৈরী করতে এবং শিক্ষার্থীরর মেধা, মনন ও সামর্থকে ধাপে ধাপে বিকশিত করতে। সফল শিক্ষকের পূর্ব সর্ত হলো পেশার প্রতি প্রীতি। পেশার প্রতি প্রীতি ও আন্তরিকতা না থাকলে কখনও শিক্ষার্থীর মানস পিতা হওয়া সম্ভব নয়। রবী ঠাকুর বলেছেন “গায়ের জোরে সব হওয়া যায়, গুরু হওয়া যায়না, গুরু হতে গরিমা লাগে”। তিনি আরোও বলেছেন ” যদি কেউ শিক্ষক হয়ে গেলো -তাহলে আজীবনের জন্য ছাত্র রয়ে গেলো”।

উল্লেখিত উক্তদ্বয় থেকে বুঝা যায় যে, একজন শিক্ষক নিত্যনতুন জ্ঞানের সাথে, চলনান বিশ্বের সাথে নিজেকে update রাখতে হলে প্রয়োজন নিয়মিত অধ্যায়ন করা। নিয়মিত বই পড়া, ICT based knowledge এবং শিক্ষা উপকরনের যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে শিক্ষক হয়ে উঠবেন আধুনিক শিক্ষক। আধুনিক ও প্রযুক্তিগত বিদ্যায় পারদর্শী শিক্ষকই পারেন শ্রেণিতে পাঠদানের সময় বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে শিক্ষার্থীকে পাঠের প্রতি আকর্ষণ তৈরী করেন এবং জটিল জিনিসকে সহজভাবে উপস্থাপন করেন। এতে শিক্ষার্থীরা পাঠকে আনন্দের সাথে আয়ত্ব করে। শিক্ষার্থীকে সনাতন পদ্ধতিতে বেতের ভয় শেখানোর কোন প্রয়োজন হয়না। বরং কৌশলী শিখিকের চমৎকার পাঠদান পদ্ধতির মাধ্যমে শিক্ষার্থী আরো বেশী মনোযোগী হয়ে পাঠ অনুধাবন করবে। একজন দক্ষ ও কৌশলী শিক্ষক তার পাঠে যেসকল বৈচিত্র্যময়তা আনেন তা হলো :— ১। পূর্বজ্ঞান যাচাই। ২। স্বল্পদীর্ঘ বিতর্ক। ৩। লেখা ও ছবির মিলকরণ। ৪। Focus question throwing ৫। শূন্যস্থান পূরন করতে দেয়া। ৬। ধা ধা। ৭। ছবির মর্ম অনুসন্ধান করতে বলা। ৮। গল্প বলা। ৯। উদাহরণের মাধ্যমে পাঠদান আরম্ভ করা। ১০। অন্যের সম্পর্কে কিছু বলতে বলা। ১১। প্রিয় ব্যক্তি বা জিনিসের নাম লিখতে বলা। ১২। Multimedia ব্যবহার করা। শিক্ষক শ্রেণিতে শিক্ষার্থীর মনোযোগ আকষর্নের জন্য উল্লেখিত পদ্ধতি গুলোর যে কোন একটি বা একাধিক পদ্ধতি প্রয়োগ করতে পারেন। পাঠের মাঝখানেও পদ্ধতিগুলোর যে কোন একটি প্রয়োগ করতে পারেন। ফলে শিক্ষার্থীর একগেয়েমি ভাব দূর হয়, নতুনভাবে উদ্যমী হয়ে পাঠে মনোনিবেশ করতে পারে। শিক্ষার্থীকে শ্রেণিতে সক্রিয় রাখার জন্য উক্ত পদ্ধতি গুলোর ভূমিকা অনস্বীকার্য।

এছাড়াও উত্তম পাঠদানের পূর্ব শর্ত হলো উত্তম শ্রণি ব্যবস্থাপনা। আর উত্তম শ্রেণি ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজন কৌশল অবলম্বন করা। তাই বলা যায় সু শিক্ষার জন্য প্রয়োজন সু শিক্ষক আর সু শিক্ষক হতে হলে প্রয়োগ করতে হবে শিক্ষা মনোবিজ্ঞান সম্পর্কিত জ্ঞান। শিক্ষার্থী যেমন শিক্ষকের মানস পুত্র, তেমনি শিক্ষকও শিক্ষার্থীর মানস পিতা। শিক্ষার্থীকে নিজ সন্তানভেবে সুশিক্ষা দেয়ার কথা সর্বদা মনে রাখতে হবে এবং পেশাকে ভালোবেসে আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সাথে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করা সকল শিক্ষকের গুরু দায়িত্ব। তাহলেই শিক্ষক হবেন জাতি গড়ার সত্যিকারের কারিগর।

লেখক- প্রধান শিক্ষক,জুরানপুর করিমুন্নেছা উচ্চ বিদ্যালয়, দাউদকান্দি, কুমিল্লা।

একই ধরনের আরও সংবাদ