অধিকার ও সত্যের পক্ষে

বিস্ময়ের নাম ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল

 ইকরামুল হাসান শাকিল,পর্বতারোহী ও লেখক :

এখানে আগেও কয়েকবার এসেছি। আজও এলাম। একা নয়, সাথে মুন ভাইকে নিয়ে। তার কারণেই আজ আবার আসা। গত কয়েক দিনের চেয়ে আজ শীতও একটু বেশি। সূর্যও তেজহীন লুকোচুরি খেলছে। প্রথমেই চোখে পড়লো বিশাল গেইট। সাদা রঙের সুউচ্চ গেইটের উপরে ঘোড়ায় বসা সৈন্যের স্ট্যাচু। গেইটের বাইরে লেখা ‘ওয়েলকাম টু ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল’। ছোট-বড় হাজারো দর্শনার্থী। আমরা বিদেশি কোঠায় টিকিট কেটে নিলাম। আজ আমরা এখানে যা দেখেছি, পাঠকদের সঙ্গে তার অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিচ্ছি।

প্রয়াত রানি ভিক্টোরিয়ার সম্মানে কলকাতায় একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছিল। আধুনিক ব্রিটিশদের চিন্তা স্বাভাবিকভাবেই কলকাতায় এক নতুন বুদ্ধিমত্তা ও সাংস্কৃতিক জাগরণ নিয়ে এসেছিল। কলকাতা ১৭৭২ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯১১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ব্রিটিশ শাসনের অধীনে ভারতের রাজধানী ছিল। সাদা মার্বেলের এই অট্টালিকা ৬৫ একর জমির ওপর নির্মাণ করতে এক কোটি পাঁচ লক্ষ টাকার প্রয়োজন হয়েছিল। যা বর্তমানে প্রায় ২ কোটি ২০ লক্ষ ৪৮ হাজার ডলারের সমান। শোভামণ্ডিত এই স্থাপত্যটির প্রধান স্থাপত্যবিদ ছিলেন স্যার উইলিয়াম এমারসন। সামগ্রিকভাবে নির্মাণে প্রায় ১৫ বছর সময় লেগেছিল।

ভারতের স্থাপত্য বিস্ময়ের তালিকায় মহিমার দিক দিয়ে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল শুধু তাজমহলের পরেই গণ্য করা হয়। তবে স্থাপত্যশৈলীর ভাষায় বলতে গেলে, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল সম্ভবত মহান তাজমহলকেও ছাড়িয়ে যায়। মেমোরিয়ালের নকশা মুঘল, ভেনিসিয়, মিশরীয়, ডেকানি এবং ইসলামি শৈলী থেকে গৃহীত হয়েছে। সেগুলো চতুরতার সঙ্গে একত্রিকরণের মাধ্যমে তৎকালীন ব্রিটিশ আধুনিক স্থপতি নির্মাণে সক্ষম হয়েছিলেন।

 

মকরানা মার্বেলে নির্মিত স্থাপত্যটি মাটি থেকে শুরু করে গম্বুজের উপর লণ্ঠন পর্যন্ত ১৮৪ ফুট উঁচু। অ্যাঞ্জেল অব ভিক্টরি থেকে লণ্ঠনের চূড়া পর্যন্ত দৈর্ঘ্য হলো আরও ১৬ ফুট। স্মৃতিস্তম্ভটির প্রধান গম্বুজের চূড়ায় অ্যাঞ্জেল অব ভিক্টরিতে পিতলে মোড়া মূর্তি রয়েছে, যা শক্তিশালী বাতাসের দিকে ঘুরতেও পারে। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের ভেতরের গ্যালারিতে বেশকিছু বিখ্যাত চিত্রশিল্পীর তৈলচিত্র রয়েছে। তাদের মধ্যে টমাস ড্যানিয়েল, জর্জ কার্টার, উইলিয়াম ড্যানিয়েল অন্যতম। এখানে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের প্রতিকৃতির সঙ্গে জাতীয় নেতাদের প্রদর্শনশালাও রয়েছে।

সমসাময়িক নাট্যকার এবং বিখ্যাত সাহিত্যিকদের অমূল্য পাণ্ডুলিপি সংরক্ষিত রয়েছে; যেমন টিপু সুলতানের চিঠি, হাফিজের গজল, আকবরনামা, শাহনামা, উইলিয়াম শেক্সপিয়রের নাটক, অ্যারাবিয়ান নাইটস এবং রুবাইয়াৎ। এখানে আওরঙ্গজেব ও বিশ্বাসঘাতক মীর জাফরের তলোয়ারসহ চারশ’ বছরের পুরনো ঢাল-তলোয়ারও সংরক্ষিত আছে।

রাজকীয় পরিবারের পাশাপাশি বিখ্যাত ব্যক্তির বেশকয়েকটি মূর্তিও রয়েছে। যেমন- হেস্টিংস, কর্নোয়ালিস, ক্লাইভ এবং ডালহৌসি। সুন্দর সুন্দর ভাস্কর্যগুলো প্রকৃতিতে খুবই ঔদার্যসম্পন্ন এবং ভারতীয় অনুভূতিও চরম প্রাচুর্যময়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়- একটি ভাস্কর্য হলো এক সিংহের মাথা থেকে চারটি দিকে পানি নির্গমন পথ রয়েছে, যা চারটি ভারতীয় নদী গঙ্গা, যমুনা, কৃষ্ণা ও সিন্ধুকে ইঙ্গিত করে।

ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল স্বাচ্ছন্দ্যময় সময় কাটাতে নিখুঁত মুক্তাঙ্গন হিসেবে খুবই জনপ্রিয়। সেহেতু তরুণ-তরুণীদের কাছে জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। যদিও ভারতীয় সংস্কৃতি অনেকটাই সংরক্ষণশীল। তবু এখানে তারা স্বাচ্ছন্দ্যে আনন্দময় সময় কাটাতে পারে। তাই ভিক্টোরিয়া গার্ডেন যুগলদের মধ্যে জনপ্রিয়রূপে পছন্দের জায়গা হয়ে উঠেছে। সন্ধ্যা নামার সময়, সাদা মার্বেলের ভবনটি গোধূলি আলোয় দ্যুতিময় মনে হয়। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে লাইট ও সাউন্ড শো’র আয়োজন করা হয়; যাতে কলকাতার ইতিহাস তুলে ধরা হয়।

দিনশেয়ে ক্লান্ত সূর্যটা ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের কাঁধে ভর করে পশ্চিম আকাশে ডুবে গেল। আর আমরাও এর সৌন্দর্যের রূপে মুগ্ধ হয়ে হোটেলে ফিরে এলাম।

একই ধরনের আরও সংবাদ