অধিকার ও সত্যের পথে

রাজধানীর নামিদামি স্কুলে অবৈধ ভর্তি

শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে নিয়মনীতি মানছে না রাজধানীর নামিদামি স্কুলগুলো। আসন শূন্য না থাকা সত্ত্বেও টাকার বিনিময়ে অবৈধভাবে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হচ্ছে। আর ওই অতিরিক্ত শিক্ষার্থীদের জায়গা করে দিতে নতুন নতুন সেকশনও খুলছে স্কুলগুলো। অবৈধভাবে প্রতিটি শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে লেনদেন হচ্ছে ৩০ হাজার থেকে সাত লাখ টাকা পর্যন্ত। এ ছাড়া নামিদামি স্কুলগুলো সরকার নির্ধারিত ভর্তি ফির চেয়ে কয়েক গুণ বেশি টাকা নিচ্ছে। সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে মোটা অঙ্কের টাকা খরচ করতেও পিছপা হচ্ছেন না অভিভাবকরা।

সরকারি ও বেসরকারি স্কুলে শিক্ষার্থী ভর্তির জন্য আলাদা নীতিমালা প্রকাশ করা হয় গত নভেম্বর মাসেই। এতে প্রথম শ্রেণিতে লটারির মাধ্যমে, নবম শ্রেণিতে জেএসসি পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতে এবং অন্যান্য শ্রেণিতে লিখিত পরীক্ষার মাধ্যমে ভর্তি করার নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু স্কুলগুলোতে ডিসেম্বরের শেষ দিকে লটারি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। আর ভর্তি পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয় নতুন বছরের প্রথম সপ্তাহেই। এর পর থেকে চলছে অবৈধভাবে ভর্তির কার্যক্রম।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নামিদামি স্কুলগুলো লটারিতে সাধারণত তাদের আসনসংখ্যার অর্ধেক শিক্ষার্থীর নাম তোলে। ভর্তি পরীক্ষায়ও আসনের তুলনায় অর্ধেক শিক্ষার্থীকে নির্বাচিত করে। নীতিমালা অনুযায়ী ভর্তি বিজ্ঞপ্তিতে শূন্য আসনের সংখ্যা ঘোষণা করার কথা থাকলেও তা কেউ করে না। ফলে কত আসন আছে আর শেষ পর্যন্ত কত শিক্ষার্থী ভর্তি করা হলো সে খবর কেউ জানে না। আর নির্ধারিত আসনের চেয়ে বেশি শিক্ষার্থী ভর্তি করার পর একটি অতিরিক্ত সেকশন বা শাখা খুলে ফেলে স্কুলগুলো।

অনুসন্ধানে জানা যায়, রাজধানীর নামি স্কুলগুলোতে টাকার বিনিময়ে অতিরিক্ত ভর্তির মূল হোতা স্কুল পরিচালনা পর্ষদ ও গভর্নিং বডির সদস্যরা। এসব স্কুল ও কলেজে গভর্নিং বডির নির্বাচনে বিজয়ী হতে একেকজন সদস্যের ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকা খরচ হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। আর সদস্যরা ওই নির্বাচনী ব্যয়ের টাকা মুনাফাসহ তুলতে বড় ধরনের ভর্তি বাণিজ্যের আয়োজন করান। জানা যায়, কোনো আসন শূন্য না থাকা সত্ত্বেও মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজে প্রথম থেকে নবম শ্রেণিতে প্রায় দুই হাজার অবৈধ শিক্ষার্থী ভর্তি করার উদ্যোগ নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটির গভর্নিং বডির একটি অংশ। তবে অবৈধ ওই ভর্তিপ্রক্রিয়া নিয়ে গভর্নিং বডি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। একটি পক্ষ যে কোনোভাবেই হোক অবৈধভাবে শিক্ষার্থী ভর্তি করাতে চায়। এই গ্রুপে রয়েছেন গভর্নিং বডির সদস্য মতিঝিল থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম টিপু। এ ছাড়া আছেন প্রতিষ্ঠানের সহকারী প্রধান শিক্ষক আবদুস সালাম খান এবং স্কুলের কর্মচারী আতিকুল ইসলাম, যিনি ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে পরিচিত। গভর্নিং বডির জামায়াতপন্থী হিসেবে পরিচিত দুজন সদস্যও তাঁদের পক্ষে রয়েছেন। আতিকুল ইসলাম এরই মধ্যে ভর্তীচ্ছু শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের কাছ থেকে টাকা আদায় করতে শুরু করেছেন। তিনি মাঠে দালালও নিয়োগ করে রেখেছেন, যাঁরা শিক্ষার্থী প্রতি দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা করে নিচ্ছেন। দু-একজন অভিভাবকও আতিকের পক্ষ হয়ে কমিশনের মাধ্যমে টাকা আদায়ে সাহায্য করছেন।

এ বিষয়ে জানতে গতকাল জাহিদুল ইসলাম টিপুর মোবাইল ফোন নম্বরে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি তা ধরেননি।

মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ ড. শাহান আরা বেগম গত রাতে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ভর্তির প্রচণ্ড চাপ রয়েছে। গভর্নিং বডির সদস্যরা একেকজন কিছু শিক্ষার্থী ভর্তি করানোর জন্য মিটিংয়ে বলেছেন। তবে এ ব্যাপারে এখনো রেজল্যুশন হয়নি। আর সব সদস্য একমতও হতে পারেননি।’

ওই প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডির একটি সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি বডির সভায় সরকারি চাকরি করা একজন সদস্য বলেন, নির্বাচনে তাঁর ৩০ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। এই টাকার কয়েক গুণ তুলতে অবৈধ ভর্তি করাতেই হবে। তিনি গভর্নিং বডির সভাপতি সরকারের যুগ্ম সচিব আবু হেনা মোরশেদ জামানকে হুমকিও দিয়েছেন। তবে গভর্নিং বডির সভাপতি অবৈধ ভর্তি কার্যক্রমের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়েছেন।

জানা যায়, এবার মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলে প্রথম শ্রেণিতে সব শাখায় মোট আসন ছিল ৮০০। এরই মধ্যে লটারির মাধ্যমে নির্বাচিত হয়ে ভর্তি হয়েছে শিক্ষার্থীরা। ফলে একটি আসনও খালি নেই। তবে গভর্নিং বডির একজন সদস্যই নিজের সুপারিশে এক হাজার শিক্ষার্থী ভর্তি করাতে চাপ দিচ্ছেন।

গভর্নিং বডির সদস্য ও ঢাকা মহানগর (দক্ষিণ) আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক গোলাম আশরাফ তালুকদার গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সরকারের ভর্তি নীতিমালার বিপক্ষে যেতে আমি রাজি নই। নীতিমালার মধ্যে থেকে যা করার তা করতে চাই। এ ক্ষেত্রে যদি সামান্যসংখ্যক মেধাবী শিক্ষার্থী ভর্তি করা যায় তাহলে আমি তা করার পক্ষে। তবে ভর্তির নামে বাণিজ্য করার সুযোগ দিতে আমি রাজি নই। তাহলে স্কুলের সুনাম নষ্ট হবে।’

রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজেও শুধু প্রথম শ্রেণিতেই দেড় শতাধিক শিক্ষার্থী অবৈধভাবে ভর্তি করানো হয়েছে বলে জানা গেছে। অন্যান্য শ্রেণির লিখিত পরীক্ষার ফল দেওয়া হয়েছে গত ৬ জানুয়ারি। এখন এসব শ্রেণিতে অবৈধভাবে ভর্তি করানো হচ্ছে। গভর্নিং বডির কয়েকজন সদস্য পাঁচ শতাধিক ছাত্রীকে অবৈধভাবে ভর্তির টার্গেট নিয়েছেন বলে জানা গেছে। শুধু প্রথম শ্রেণিতে গভর্নিং বডির প্রতি সদস্যকে সাত থেকে ১০ জন শিক্ষার্থী ভর্তির সুযোগ দেওয়া হয়েছে। শিক্ষক প্রতিনিধিদের দেওয়া হয়েছে দুই থেকে তিনজন করে। আর শিক্ষার্থী প্রতি তাঁরা আদায় করেছেন তিন থেকে সাত লাখ টাকা পর্যন্ত।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ভিকারুননিসার গভর্নিং বডির একজন সদস্য গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ভর্তিতে বিভিন্ন জায়গার তদবির থাকে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, এমপি, মন্ত্রীদের তদবিরও থাকে। সেগুলো নেওয়া হয়েছে। আর এসব ভর্তি না নিয়েও তো উপায় নেই।’ তবে জানা যায়, তদবিরে ভর্তি দু-একটা হলেও বেশির ভাগ ভর্তিই হয়েছে টাকার বিনিময়ে।

ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতি গোলাম আশরাফ তালুকদার বলেন, ‘অতিরিক্ত ভর্তি করানো হয়নি। যদি মেধাতালিকা ও অপেক্ষমাণ তালিকা থেকে কেউ ভর্তি না হয়ে থাকে, সেই আসনেই আবেদনের ভিত্তিতে কিছু শিক্ষার্থী ভর্তি করানো হয়েছে।’

ভিকারুননিসায় অতিরিক্ত ভর্তি নিয়ে সম্প্রতি অধ্যক্ষকে চিঠি দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। কমিশনের পরিচালক মীর মো. জয়নুল আবেদীন শিবলীর সই করা চিঠিতে প্রথম থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থী ভর্তির শূন্য আসনসংখ্যার তথ্যসংক্রান্ত রেজল্যুশন ও বিজ্ঞপ্তির কপি পাঠাতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া যাদের ভর্তি করা হয়েছে শ্রেণি অনুযায়ী তাদের নামের তালিকাও পাঠাতে বলা হয়েছে। কিন্তু এখনো প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে দুদককে কোনো জবাব দেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে।

ভর্তি বাণিজ্যের তালিকায় নাম রয়েছে মতিঝিল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের। এই প্রতিষ্ঠানে অবৈধভাবে শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে নেওয়া হয় জনপ্রতি ৫০ হাজার থেকে ৬০ হাজার টাকা। এ ছাড়া উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলেও এবার অবৈধ ভর্তিতে শিক্ষার্থী প্রতি ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

মনিপুর উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়েও টাকার বিনিময়ে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয় বলে জানা গেছে। এ স্কুলের পাঁচটি ক্যাম্পাসে শুধু প্রথম শ্রেণিতেই প্রায় চার হাজার শিক্ষার্থী রয়েছে। অথচ লটারিতে প্রতি শিফটে মাত্র ১৮০ জনের নাম তোলা হয়। গত নভেম্বরে মূল বালকের প্রভাতি শাখায় বাংলা মাধ্যমে ১৮০ জনের নাম তোলা হয়েছে। অথচ এই শিফটে এর দ্বিগুণ শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। অবৈধ ভর্তিতে শিক্ষার্থীপ্রতি ৩০ হাজার টাকা করে নেওয়া হয় বলে জানা গেছে।

অভিভাবক সমন্বয় পরিষদের সাধারণ সম্পাদক শামীমা সুলতানা নীপা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শিক্ষা মন্ত্রণালয় সব কিছু দেখেও না দেখার ভান করে। তাদের প্রায়ই বলতে শোনা যায়, অনিয়মের কোনো প্রমাণ নেই। একটা স্কুলের প্রথম শ্রেণিতে লটারিতে কতজনের নাম তোলা হয়েছে এর সঙ্গে ফেব্রুয়ারি মাসে কত শিক্ষার্থী পড়ছে, তা মেলালেই অবৈধভাবে ভর্তির সংখ্যা বেরিয়ে আসবে। এক বছর যদি একটি স্কুলকেও শাস্তি দেওয়া হয়, তাহলে পরের বছর আর কোনো স্কুল অবৈধভাবে ভর্তি করাবে না। কিন্তু অবৈধ ভর্তির ব্যাপারে মন্ত্রণালয়কে এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নিতে আমরা দেখিনি।’

এই অভিভাবক আরো বলেন, ‘আমরা তো অসহায়। যদি নির্ধারিত টাকা না দিই তাহলে বাচ্চাকে বের করে দেবে। তাই জেনেশুনেও আমাদের অতিরিক্ত টাকা দিতে হচ্ছে।’

রাজধানীর বিভিন্ন স্কুলে ভর্তি ও সেশন ফির নামেও বাড়তি টাকা আদায় করার অভিযোগ আছে। ২০১৮ সালের ভর্তি নীতিমালায় বলা হয়েছে, ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকার এমপিওভুক্ত স্কুলে ভর্তিতে সর্বোচ্চ আট হাজার টাকা, আংশিক এমপিওভুক্ত স্কুলে সর্বোচ্চ ৯ হাজার টাকা করে নেওয়া যাবে। তবে ইংলিশ ভার্সনে নেওয়া যাবে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা। তবে একই প্রতিষ্ঠানে বার্ষিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে এক ক্লাস থেকে পরের ক্লাসে ভর্তির ক্ষেত্রে শুধু সেশন চার্জ নেওয়া যাবে, কোনোভাবেই পুনর্ভর্তি ফি নেওয়া যাবে না। সেই হিসেবে রাজধানীর স্কুলগুলোতে ওপরের ক্লাসে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার টাকা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে; কিন্তু প্রতিষ্ঠানগুলো তা মানছে না।

জানা যায়, রাজধানীর মনিপুর উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সব শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ভর্তির ক্ষেত্রে নেওয়া হচ্ছে আট হাজার টাকা। নতুন ভর্তির ক্ষেত্রে প্রতি শিক্ষার্থীর কাছ থেকে যা নেওয়া হচ্ছে, ওপরের ক্লাসে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীকেও একই পরিমাণ টাকা দিতে হচ্ছে। ন্যাশনাল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজে ভর্তিতে শ্রেণিভেদে নেওয়া হচ্ছে ২০ থেকে ২২ হাজার টাকা। ভর্তিতে মিরপুর অরিজিনাল ১০ নম্বরে অবস্থিত প্রিপারেটরি গ্রামার স্কুলে ১৩ হাজার ৩০০ টাকা, মিরপুর বাঙলা স্কুল অ্যান্ড কলেজে আট হাজার টাকা পর্যন্ত, মিরপুর ১৩ নম্বরে অবস্থিত বনফুল আদিবাসী গ্রীনহার্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজে নেওয়া হচ্ছে ১৫ হাজার থেকে ১৯ হাজার টাকা পর্যন্ত। এভাবে প্রায় সব স্কুলেই ভর্তিতে অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হচ্ছে।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক মো. মাহবুবুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোনো অনিয়ম প্রশ্রয় দেওয়া হবে না। জারীকৃত ভর্তি নীতিমালার বাইরে যাওয়ার কারো সুযোগ নেই। তবে এ ক্ষেত্রে অভিভাবকরা যদি আমাদের সহায়তা করেন, তাহলে সমস্যাগুলো ধরতে সুবিধা হয়। আমি অভিভাবকদের বলব, আপনারা যেকোনো সমস্যায় মাউশি অধিদপ্তরকে জানান, আমরা ব্যবস্থা নেব। আর যদি কেউ অবৈধ ভর্তি করে থাকে, তাহলে আমরা খোঁজখবর নিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’

 

 

সূত্র: কালের কন্ঠ

একই ধরনের আরও সংবাদ