অধিকার ও সত্যের পথে

ছাত্রজীবন সফলতা লাভের উপায়

 মুহাম্মদ আবুল হুসাইনঃ

ছোট্ট একটি শিশুর কাছে মূল্যবান কোন রত্ন ও নিছক খেলনা মাত্র; কারণ ঐ জিনিসের গুরুত্ব তার কাছে বোধগম্য নয়; যে কারণে সে মূল্যবান রত্ন দিয়ে কিছুক্ষণ খেলা করে হয়তো ফেলে দেবে অবহেলায়, কিংবা কোন চালাক লোক হয়তো চকলেট কিংবা অন্য কোন খেলনা দিয়ে ভুলিয়ে ভালিয়ে তার কাছ থেকে নিয়ে নেবে দামী রত্নটি। বস্তুত, দামী জিনিসের দাম যারা বোঝে না তারা সে জিনিস নিজের কাছে বেশিক্ষণ রাখতে পারে না, আবার যারা ঐ জিনিসের গুরুত্ব বোঝে তারা সেটি নিজের অধিকারে নেয়ার চেষ্টা করে থাকে। ছাত্রজীবন যে কত মূল্যবান, তাদের এই সময়টা যে কত গুরুত্বপূর্ণ তা তারা নিজেরাই অনেক সময় বুঝতে পারে না। আর এই না বুঝার কারণেই তারা অত্যন্ত অবহেলায় তাদের এই মূল্যবান সময়কে নষ্ট করে।

অনেকের ধারণা ভাল ছাত্র বা সফল শিক্ষার্থী হতে হলে মেধাবী হওয়া প্রয়োজন। কিংবা শুধুমাত্র মেধাবিরাই ভাল বা কৃতি শিক্ষার্থী হয়। কিন্তু এই ধারণাটি সম্পূর্ণ সত্যি নয়। তুমি মেধাবী হতে পার; কিন্তু তুমি যদি পড়াশোনা না কর, সময়ের সদ্ব্যবহার না কর, পরিশ্রমি না হও তাহলে তুমি কীভাবে ভাল রেজাল্ট করবে? ভাল রেজাল্ট করতে হলে তোমাকে অবশ্যই পড়াশোনার প্রতি যত্নবান হতে হবে। বরং তোমার যদি মেধা কিছুটা কমও হয়, তাহলেও কিন্তু তুমি একজন তথাকথিত মেধাবী স্টুডেন্টের চেয়ে ভাল ফলাফল অর্জন করে শিক্ষাজীবনে সফল হতে পার।

বিষয়টা অনেকটা খরগোস আর কচ্ছপের দৌড় প্রতিযোগিতার গল্পের মত। খরগোস নিঃসন্দেহে কচ্ছপের তুলনায় দ্রুতগামী এবং সে ইচ্ছে করলে কচ্ছপকে অতি সহজেই হারিয়ে দিতে পারত। কিন্তু অত্যন্ত অলস ও অমনোযোগী হওয়ার কারণেই সে কচ্ছপের মত একটি অত্যন্ত ধীর গতির প্রাণীর সাথেও দৌড় প্রতিযোগিতায় হেরে যেতে বাধ্য হয়। অন্যদিকে কচ্ছপ তার দৃঢ় সংকল্প, প্রচন্ড ইচ্ছাশক্তি এবং কঠোর পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের বিনিময়ে শেষ পর্যন্ত দ্রæতগতির খরগোসকে হারিয়ে বিজয় ছিনিয়ে আনতে সক্ষম হয়।

প্রযুক্তির উন্নয়ন মানুষের জীবনমানকে উন্নত এবং যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিপ্লব ঘটালেও এর অপব্যবহার উল্টোফলও এনেছে। বিশেষ করে ফেসবুক সহ সামাজিক মাধ্যম গুলোর প্রতি তরুণ সমাজের অতিরিক্ত আসক্তি মাদকাসক্তির মতই ভয়াবহ বিপর্যয় নিয়ে এসেছে। এর ফলে পড়াশোনার প্রতি তাদের মনোযোগ, চিন্তা-ভাবনা ও পাঠোভ্যাস মারাত্মকভাবে নষ্ট হয়েছে। দশ বছর আগেও বই পড়ার প্রতি তরুণদের যে আগ্রহ ছিল তা আর এখন নেই। এখন ফেসবুক, ম্যাসেঞ্জার সহ বিভিন্ন স্যোসাল মিডিয়ায় তরুণরা ঘন্টার পর ঘন্টা আড্ডা দিয়ে সময় নষ্ট করছে, অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ছে। এর ফলে পড়াশোনা সহ জীবন ও জগৎ সম্পর্কে গভীর চিন্তা-ভাবনা করার সময় তারা পাচ্ছেনা।

এজন্য অবশ্য শুধু ছাত্রদেরকেও একতরফা দোষ দিয়ে লাভ নেই, কারণ আমাদের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থা তাদের সামনে জীবনের কোন মহৎ আদর্শ ও লক্ষ্য তুলে ধরতে পারেনি; তাদের সামনে নেই জীবনের কোন সুস্পষ্ট উদ্দেশ্য। ভাল কোন চাকরি লাভ বা পয়সা উপার্জনই বর্তমান সময়ে পড়াশোনার একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ ভোগবাদই যেন শিক্ষার এবং জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে উঠেছে। যার কারণে ছাত্ররা তাদের জীবনে কোন মহৎ লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ও আদর্শের তাড়না অনুভব করে না বরং এই তরুণ বয়সে জীবনকে উপভোগ করার বর্ণিল আহবান ও চাকচিক্যই তাদেরকে বেশি প্ররোচিত করে, তারা সেগুলো উপেক্ষা করতে পারে না এবং সহজেই বিভ্রান্ত হয়ে গড্ডালিকা প্রবাহে হারিয়ে যায়। এতে শুধু যে তাদের পড়াশোনাই নষ্ট হয় তাই নয়, নৈতিক মূল্যবোধ সম্পন্ন যথার্থ মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতেও তারা ব্যর্থ হয়।

আজ আমাদের এই ছোট্ট দেশটিতে যে মারাত্মক নৈতিক অবক্ষয়, সর্বগ্রাসী যে দূর্নীতি, সন্ত্রাস, নৈরাজ্য ও রাহাজানি অক্টোপাসের মত আষ্টেপিষ্টে আমাদেরকে বেঁধে ফেলেছে, তার মূল কারণ আজ উপলব্ধি করা প্রয়োজন। এ অবস্থা যদি আরো অব্যাহত থাকে তাহলে জাতি হিসেবে আমাদের পতন অবশ্যম্ভাবী। আসলে গোড়ায় গলদ রেখে মাথায় পানি ঢেলে লাভ নেই। জাতিকে বাঁচাতে হলে জাতির ভবিষ্যতকে আগে বাঁচাতে হবে।

জাতির ভবিষ্যত নাগরিকদেরকে নিশ্চিত ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে হলে তাদের সামনে জীবনের সঠিক পথ, সঠিক জীবনদৃষ্টি এবং তাদের জীবনের সঠিক লক্ষ্য নির্ধারণ করতে সাহায্য করাই শিক্ষার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। শুধু অর্থ উপার্জন, শুধু উদরপূর্তি, শুধু বৈষয়িক প্রতিপত্তি অর্জন করাই শিক্ষার লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়। বরং দেহ, মন ও আত্মিক উন্নতির বিষয়টিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। মহাকবি জন মিল্টন শিক্ষাদর্শন প্রসঙ্গে বলেছেন : Education is the harmonious development of body, mind and soul  অর্থাৎ ‘দেহ, মন ও আত্মার সুসমন্বিত উন্নয়নই শিক্ষা’ আর কেবল মাত্র কোন মহৎ ও উন্নত জীবনাদর্শের মাধ্যমেই শিক্ষার এই মূল লক্ষ্যটি হাসিল করা যেতে পারে। আমরা মনে করি ঐশী কালাম আল কোরআনই সেই মহৎ আদর্শের আকড়, যা মানুষকে সত্যিকার মানুষ বা ইনসানে কামেল হিসেবে গড়ে তুলতে পারে। আমরা এই ঐশী জীবনাদর্শের আলোকেই ছাত্র-ছাত্রীদের সামনে জীবনের একটি মহৎ স্বপ্ন এঁকে দিতে চাই। আশা করি এই স্বপ্নের পথে হেঁটেই তারা জীবনের সঠিক তাৎপর্য খুঁজে পাবে ইনশাআল্লাহ।

আরেকটি সমস্যা বর্তমানে আমাদের দেশ সহ সারা বিশ্বে খুব প্রকট হয়ে উঠেছে, সেটি হলো ধর্মের নামে তথা পবিত্র ইসলাম ধর্মের নামে জঙ্গিবাদ বা উগ্রবাদের বিস্তার; যার প্রধান শিকার হচ্ছে ছাত্ররা। মূলত ইসলামী আদর্শ সম্পর্কে সঠিক শিক্ষা বা ধারণা না থাকার কারণেই কোমলমতি ছাত্ররা এই বিভ্রান্ত উগ্রবাদের সহজ শিকারে পরিণ হচ্ছে। এই গ্রন্থে পবিত্র কোরআন হাদীসের আলোকে উগ্রবাদের স্বরূপ উন্মোচনের পাশাপাশি প্রকৃত ইসলামী জীবনবোধ বা আদর্শের সৌন্দর্য ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা হয়েছে।

মানুষের স্বভাবের মধ্যে একটি পাশবিক সত্তা রয়েছে এবং মানব-প্রকৃতির এই পাশবিক সত্তার বিকাশ অন্যান্য পশু-পাখি ও জীব-জানোয়ারের মতই প্রাকৃতিক নিয়মে আপনা-আপনি হয়ে থাকে। পশু প্রবৃত্তি অর্জন করার জন্য কাউকেই কোন কষ্ট করতে হয় না; পশুত্ব বিনা পরিশ্রমেই অর্জন করা যায়। কিন্তু মানব শিশুকে যথার্থ মানুষে পরিণত হতে হলে শিক্ষা গ্রহণ করতে হয় এবং এজন্য তাকে রীতিমত অনেক চেষ্টা-সাধনা করতে হয়।

মানুষ কোন পশুর নাম নয়। অন্যান্য জীব-জানোয়ার ও পশু-পাখির তুলনায় সৃষ্টিকর্তা মানুষকে বিশেষত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। বলাবাহুল্য সৃষ্টি জগতের অন্যান্য প্রাণীর তুলনায় মানুষের বিশেষত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব হল তার মনুষ্যত্বের কারণে। আর মানব শিশুকে এই মনুষ্যত্ব রীতিমত অর্জন করতে হয়। মনুষ্যত্ব হচ্ছে মানব-প্রকৃতিতে সুপ্তাবস্থায় বিদ্যমান মৌলিক মানবীয় ও সৎ গুণাবলী, তার বিবেকবোধ ও জীবনবোধ এবং তার সুকুমারবৃত্তি ও সৃজনশীলতা। এ সবের যথার্থ বিকাশের উপরই মানব সন্তানের মুনষ্যত্ব অর্জন নির্ভর করে।

আমরা দেখি মানব সন্তানকে তার জীবিকা অর্জন বা রুটি-রুজির জন্যও ব্যাপক কর্মমুখী শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে হয়, যার দৃষ্টান্ত পশুদের মধ্যে দেখা যায় না। একজন মানুষ তার জীবিকা নির্বাহের জন্য কোন্ ধরনের পেশাকে বেছে নিবে তা তার জীবনের কৈশোর কাল থেকেই নির্ধারণ করে নিতে হয় এবং সে অনুযায়ীই তাকে পড়া-শোনা ও অধ্যয়ন করতে হয় এবং হাতে-কলমে শিক্ষা গ্রহণ করতে হয়। এই দৃষ্টান্ত পশুদের মধ্যে দেখা যায় না। পশুরা বনে-বাদারে ঘুরে-ফিরে কিংবা অন্যের কাছ থেকে কেড়ে-কুড়ে, নিজের হিংস্র নখ ও দাঁত দিয়ে অপরকে হত্যা করে নিজেদের উদর পূর্তি করে থাকে। কিন্তু জীবিকা নির্বাহের এই পন্থা মানুষের জন্য শোভনীয় নয়; কেননা তাতে মনুষ্যত্বের অবমাননা হয়। অবশ্য মানুষদের মধ্যেও কিছু কিছু মানুষকে দেখা যায়, যারা পশুদের মতই জোর করে অন্যের সম্পদ কেড়ে নেয়, চুরি-ডাকাতি, খুন-খারাবি করে কিংবা অন্য কোন অসৎ উপায়ে অন্যের সম্পদ কেড়ে নিয়ে নিজের উদর পূর্তি করে কিংবা সম্পদের পাহাড় গড়ে থাকে। কিন্তু এ ধরনের মানুষদেরকে মানব সমাজের অন্য সকল মানুষই ঘৃণা করে থাকে এবং মনুষ্য সমাজে তারা ইতর বা মানুষরূপী পশু হিসেবেই পরিগণিত হয়।

সৃষ্টিকুলের মধ্যে মানুষের রয়েছে বিশেষ মর্যাদা। মানুষের থাকা, খাওয়া, জীবন-যাপণ সবই পশুদের তুলনায় উন্নত ও মর্যাদা সম্পন্ন। এ কারণেই পশু-পাখিকে খাদ্য সংগ্রহ ও জীবীকা সংগ্রহের জন্য বিশেষ কোন শিক্ষা-দীক্ষা ও মূল্যবোধের প্রয়োজন না হলেও মানুষকে তার জীবিকা অর্জনের ক্ষেত্রে তার মনুষ্যত্বেও মর্যাদা ও আভিজাত্য বজায় রাখতে হয় এবং এজন্য বিশেষ ভাবে শিক্ষা গ্রহণ করতে হয়।

আবার মানুষ শুধু খেয়ে-পড়েই সন্তুষ্ট থাকতে পারে না, সে জীবন ও জগৎ সম্পর্কে নানা কৌতুহল বোধ করে, তার মনের মধ্যে নানা প্রশ্ন এসে ভীড় করে। কারণ মানুষ একটি বুদ্ধিমান সত্তা। এ কারণে জীবন ও জগতের রহস্য সে উন্মোচন করতে চায়, জানতে চায়, বুঝতে চায়। এসব কারণে শুধুমাত্র কর্মমুখী শিক্ষাতেও মানুষ সন্তুষ্ট নয়, জগতের নানা বিষয়ের জ্ঞান-বিজ্ঞানও তাকে আয়ত্বে করতে হয়।

আবার মানুষ কেবলমাত্র বুদ্ধিমান প্রাণীই নয়, তার একটি নৈতিক ও সামাজিক সত্তাও রয়েছে। সে সমাজবদ্ধ হয়ে বাস করতে ভালোবাসে এবং সমাজ ও মানুষের প্রতি একটি দায়বদ্ধতাও সে অনুভব করে। এ কারণে মানব সন্তানকে তার নিজস্ব সমাজ, সংস্কৃতি ও ধর্ম সম্পর্কেও জানতে হয় এবং নিজ সমাজের একজন আদর্শ, সৎ ও যোগ্য সদস্য হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলার একটি তাড়নাও সে অনুভব করে।

এভাবে চিন্তা করলে দেখা যাবে মানব শিশুকে যথার্থ মানুষ হয়ে উঠতে হলে তাকে অনেক কিছু জানতে ও বুঝতে হয় এবং নিজের ভবিষ্যত জীবনকে সুন্দর করার লক্ষে জীবনের একটি বিরাট সময় পর্যন্ত তাকে জ্ঞান অর্জন ও আত্মগঠনের কঠোর সাধনা ও অধ্যবসায়ে নিয়োজিত থাকতে হয়। বলাবাহুল্য, এই কঠোর অধ্যবসায় ও সাধনার মাধ্যমে সত্যিকার মানুষ হয়ে ওঠার মধ্যেই মানব সত্তার শ্রেষ্ঠত্ব এবং তার বিশেষত্ব ও সার্থকতা নিহিত।

লেখক- সিনিয়র সাংবাদিক।

একই ধরনের আরও সংবাদ