অধিকার ও সত্যের পথে

আমার বাচ্চাটা কথা শুনে না !

 শেখ হাসনাত জামান শুভ্রঃ

স্কুল কলেজে এখন বেত্রাঘাতের প্রচলন নেই, শারিরিক আঘাতের কিংবা শাস্তির নিয়ম আইন করে তুলে দেয়া হয়েছে বহু আগেই। কিন্তু আইনের বাস্তবায়নে এখনো ফাঁকি রয়ে গিয়েছে। দেশের ভেতরে গড়ে ওঠা অনেক বাচ্চাদের স্কুলে এখনোও শারিরিক শাস্তি প্রদান করা হয়। আর শারিরিক শাস্তির থেকে বেশি যেটা হয় সেটা হলো মানষিক শাস্তি। প্রচন্ড অমানবিকভাবে বাচ্চাদের উপর সারাদিন চলে নির্মম মানষিক অত্যাচার।

সকালে ঘুম থেকে উঠার পর নিজের ওজেনের থেকে বেশি ভারী স্কুল ব্যাগ কাধে নিয়ে যাওয়া থেকে শুরু হয় সেই অত্যাচার। শ্রেণীকক্ষে বেশিরভাগ অদক্ষ শিক্ষকদের দ্বারা তারা নানানভাবে হয় অত্যাচারিত।পড়া না পারার কারন থেকে শুরু করে, হোম ওয়ার্ক না করা, দুষ্টুমি করা, নম্বর কম পাওয়া ইত্যাদি নানান কারনে তারা শাস্তি পেতে থাকে। কিছু কিছু স্কুলে এসবের কারনে শারিরিক শাস্তি পর্যন্ত দেয়া হয় বলে আমরা প্রায়ই শুনে থাকি। স্কুলের পরে বাচ্চার নিজের পরিবার এবং বাসা।

সেখানে তো আরও খারাপ অবস্থা। কিছু কিছু পরিবার তাদের বাচ্চাদেরকে এতোটাই কড়া শাসনে রাখে যে বাচ্চা টয়লেটে যেতে চাইলে অনুমতির দরকার হয়। খাবার টেবিলে খাবার রাখা আছে সেটা তুলে নিয়ে খাবে সেই জন্যও দরকার মা’র অনুমতি।

তাদের ভাষ্যমতে সন্তানকে শাসন না করলে বেয়াড়া হয়ে যাবে। শাসন করে আদব কায়দা না শেখালে তাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার।কিন্তু তারা শাসন নয় বরং অত্যাচার করে চলছেন বাচ্চাদের উপর।

বাচ্চারা একটু দৌড়ঝাপ দুষ্টুমী করবে এটাই স্বাভাবিক, কারন দুষ্টুমী বড়দের মানায় না এটা বাচ্চাদেরই কাজ।বাচ্চারা বড়দের মতো ভবিষ্যৎ সচেতন হয় না তাই তারা জানে না কোনটা ভালো কোনটা মন্দ। সেটা বোঝানোর দায়িত্ব বাবা মা এবং শিক্ষকের।কিন্তু সেই দায়িত্বথেকে সরে গিয়ে সবাই বাচ্চাদের শাসনের বেলায় উর্ধহস্ত। সেই শাসন শুধু বকে ঝেড়ে তো খুব কমই হয়। বরং মারধোর, গায়ে হাত তোলাকেই এখন শাসন বলে চালিয়ে নেয়া হচ্ছে আমাদের দেশের পরিবারগুলোতে।

এর ফলে হয়তো বাচ্চাটি দুষ্টুমী বন্ধ করছে কিন্তু সেটা নৈতিক কারনে নয় বরং মার খাওয়ার ভয়ে।সে কিন্তু এটা বুঝতে পারছে না কেনো কাজটি করা উচিত নয়, সে শুধু এটুকুই জানছে যে কাজটি করলে মার খেতে হবে কিংবা শাস্তি পেতে হবে, সুতরাং শাস্তি থেকে বাঁচতে হবে।

এই শাস্তির কারনে বাচ্চারা ধীরে ধীরে হয়ে যাচ্চে উগ্র এবং সহিংস। তাদের অবচেতন মনে বদ্ধমূল হয়ে যাচ্ছে যে নিজের প্রভাব বিস্তারের জন্য কিংবা নিজের কথার প্রাধান্য পাওয়ার জদ্য শাস্তি দিতে হবে, জোড় গলায় কথা বলতে হবে এবং অত্যাচারী হতে হবে।কারন বাচ্চারা তাই শিখবে যা তাদের সামনে হচ্ছে।তারা সবসয়ম করা শাসণ শাস্তির ভিতর দিয়ে যেতে থাকলে একটা সময় শাসন শাস্তি তাদের প্রিয় উপকরন হয়ে যাবে এবং তারাও এগুলো ব্যবহার করতে থাকবে উগ্রভাবে।

বাচ্চা বয়সে শেখা প্রতিটি কাজ এভাবেই প্রভাব বিস্তার করতে থাকে বুদ্ধির বিকাশে।

চাইল্ড সাইকোলজি অনুসারে একটি বাচ্চার মনোবিকাশ এবং মেধার বিকাশ যেভাবে হয়ে থাকে তা বড়দের তুলনায় ভিন্ন। আরো সহজভাবে বলতে চাইলে, একজন প্রাপ্তবয়ষ্ক ব্যক্তি যেভাবে সিদ্ধান্ত নিতে জানে একটি বাচ্চা সেভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না।বড়দের সিদ্ধান্ত নেয়ার ধরনটা অতীত এবং ভবিষ্যতের সংমিশ্রনে তৈরী হয়, অতীতের কোনো ঘটনার সারাংশ এবং ভবিষ্যতে সেই কাজটি করা হলে কী হতে পারে এভাবেই আমরা বড়রা সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকি, কিন্তু বাচ্চারা কী বোঝে অতীত আর কোথায় তাদের ভবিষ্যৎ ! তাই বাচ্চারা বোঝে তাৎক্ষনিক প্রতিক্রিয়া থেকে শেখা।

Relationship between early brain development and learning, behavior and health সম্পর্কিত একটি গবেষনা চালানো হয় ১৯৯৯ তে কানাডার ওন্টেরিও তে। সেই গবেষনার প্রেক্ষিতে যে ফাইনাল রিপোর্টটি আসে (Reversing the Real Brain) তার উপর আলোকপাত করে বাচ্চাদের বুদ্ধি এবং বিকাশের প্রাচীনতম ধারনা এবং আধুনিক ধারনার কিছু পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়।

১.প্রাচীন ধারনা ছিলো এমন যে, বাচ্চার মস্তিষ্কের বিকাশ কীভাবে হবে তা নির্ভর করবে জেনেটিক্যালি। কিন্তু আধুনিক গবেষনায় প্রাপ্ত ধারনা এই বলে যে বাচ্চার মেধার বিকাশ যতোটুকু না জেনেটিক্যাল কারনে হয় তার থেকে বেশি হয় বাচ্চার প্রাথমিক বয়সগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে।

ধারনা করা হতো বাচ্চার মস্তিষ্কের বিকাশে বয়স তিন পর্যন্ত অভিজ্ঞতার তেমন কোনো প্রভাব নেই, কিন্তু গবেষনায় প্রাপ্ত সমীক্ষায় জানা যায় যে ৩ বছর বয়স পর্যন্ত বাচ্চাদের যে যে অভিজ্ঞতা হয় তা সরাসরি বুদ্ধির বিকাশে প্রাভাব বিস্তার করে এবং প্রাপ্ত বয়ষ্ক হওয়ার পরেও সেই প্রভাব থাকে।

২.প্রাচীন ধারনা মতে মস্তিষ্কের বিকাশকে ধরা হতো সরলরৈখিক, অর্থাৎ বাচ্চারা যতো বড়ো হতে থাকবে ততো তাদের জানা এবং শেখার সক্ষমতা বাড়বা। যতোই প্রাপ্তবয়ষ্ক হতে থাকবে তার মস্তিষ্কের গ্রহণ করার ক্ষমতা বাড়তে থাকবে।

কিন্তু গবেষণাটি তে প্রাপ্ত ধারনা একদমই উল্টো। ব্রেনের বিকাশ মোটেও সরলরৈখিক নয় বরং জটিল, কিংবা জালের মতো বিস্তৃত বলা যেতে পারে। অর্থাৎ বাচ্চা বয়সের শেখা, দেখা, জানা বিষয়গুলো সে সবসময় নিজের সাথে বহন করে যাবে, এবং যেকোনো সময় সেই অভিজ্ঞতার প্রভাব অবচেতন মন থেকে কাজ করতে থাকবে।

সুতরাং সহজ ভাবে বলতে চাইলে, একটি বাচ্চা যা শিখছে দেখছে তার প্রভাব প্রত্যক্ষভাবে তার মস্তিষ্কে পড়ছে এবং এটা থেকে সে কখোনই বেড়িয়ে যেতে পারবে না, বরং এই অভিজ্ঞতাগুলো সে বহন করে নিয়ে যেতে থাকবে নিজের সাথে অবচেতন মনে।

আমরা সবাই জানি বাচ্চারা অনুকরনপ্রিয়, তারা তাদের আশেপাশে যা হতে দেখে তাই করতে চায়। বিশেষ করে তার পরিবারের সদস্যদের অনুকরন তারা বেশি করে। অনুকরন থেকেই তারা কথা বলতে শেখে, আধোআধো বুলি থেকে একসময় তারা পরিষ্কারভাবে কথা বলতে শিখে যায়।কিন্তু তাদের শেখার পরিধিটা কিন্তু উচ্চারন এবং কথা বলাতে সীমাবদ্ধ নয়, তারা সেসময় যা দেখে তাই করার চেষ্টা করে। সে কারনে প্রজাপতির উড়তে দেখা তাদের আকৃষ্ট করে এবং সেভাবে ডানা মেলে তারা উড়তে চায় এবং ডানার মতো করে দুহাত দুলোতে থাকে।

আপনার ফোন হাতে নিয়ে কাজ করা দেখে বাচ্চাটাও শিখে যায় ফোন কীভাবে হাতে নিতে হয়, চালু করতে হয় এবং কানে নিয়ে কথা বলতে হয়।অর্থাৎ আপনি তাকে কিছু শেখান বা না শেখান সে শিখছে প্রতিনিয়তই।

আপনার করা শাসন অত্যাচার শাস্তিও ঠিক তেমনি ভাবেই শিখছে সে, পরিনামে তারা হয়ে যাচ্ছে উগ্র, সহিংস।পরিবারে সবসময় বাবা মা ‘র মাঝে কলহ দেখতে থাকলে বাচ্চাও মানষিকভাবে সেই ঝগড়া বিবাদের কথাগুলোই শিখতে থাকে। বাবা মাকে মর্যাদা দেয় না, এবং মা দেয় না বাবাকে তখন এই শিক্ষা বাচ্চাটি পেয়ে যায় এবং মর্যাদা দেয়ার বিষয়টি সেও ভুলতে থাকে। সেও প্রথমদিকে তার স্কুলের সহপাঠী, শিক্ষকদের সাথে বেয়াদবী শুরু করে এবং একটা সময় সেটা আপনাদের সামনেই শুরু হয়ে যায়। স্কুলের শিক্ষকরা তখন বাচ্চাদের পাশে সহানুভূতিশীল না হয়ে উল্টো শাসন এবং শাস্তি দেয়া শুরু করে বাচ্চারা আরোও বেয়ারা হতে থাকে। তার দুনিয়ায় তখন নেতিবাচক শব্দগুলো বারবার আসতে থাকে, যেমন ঝগড়া, মারামারি, শাস্তি, ভয়। এবং তারা এর মাঝেই বেড়ে উঠতে থাকে এই শব্দগুলোই হয়ে যা তার দুনিয়া।

শাসন করা আর শারিরিক শাস্তি দেয়া এক বিষয় নয়। শারিরিক শাস্তি দেয়া কখোনোই সমাধান হতে পারেনা। সন্তান বড় হয়ে গেলে যখন বাবা মার কথা শোনে না, অনৈতিক কর্মকান্ডে জড়িয়ে যায় তখন বাবা মা পুনরায় শাসন করতে চায়, একটা সময় তারা সন্তানের বড় হয়ে যাওয়ার কারনে গায়ে হাত তুলতে পারে না কিন্তু মানষিক অত্যাচার চালিয়ে যেতে থাকে।

স্কুলের শিক্ষকরা বলেন বাচ্চাদের শারিরিক শাস্তি দিতে না পারার কারনে এখন তাদের সম্মান হানী হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে যাচ্ছে। আসলে সমস্যাটা ছিলো গোড়াতে,বেতের আঘাতে বাচ্চাদের শুধু ভয় দেখিয়ে দমিয়ে রাখা হতো, বড় হতে থাকলেও সেই ভয় মনে ছিলো , কিন্তু ভয়ের সাথে তৈরী হলো অশ্রদ্ধা। কারন বাচ্চারা যাদের কাছে ঠায় পায় না তাদেরকে শ্রদ্ধাও করে না। যখন শিক্ষকদের হাত বেতের অধিকার থেকে খালি হয়ে গেলো, তখনই ছাত্ররা দীর্ঘকাল থেকে পেয়ে আসা ভয় থেকে মুক্তি পেয়ে গেলো এবং সুদীর্ঘ সময় ধরে শিখে আসা সহিংসতা, বর্বরতার ব্যবহারিক বিস্তার প্রকাশ্যে শুরু করে দিলো।

পারিবারিক জীবনে বাবা মাদের সাথেও এমনই হয়। সন্তান যখন আর বাচ্চা থাকে না, যখন তারা বড় হয়ে যায় এবং হাত পা ছেড়ে নানান দিকে চলতে শিখে যায় তখন তাদের ভয়ও কমে যেতে থাকে, তখন তাদের বেতের ভয়, শাস্তির ভয়ও কমে যায়। এবং যখন ভয় কমে যায় তখন দীর্ঘকাল ধরে হয়ে আসা সব ক্রিয়ার উল্টো প্রতিক্রিয়া দেখতে পায় বাবা মা।অথচ সমস্যাটা ছিলো গোড়াতে।

একটা কিশোর কিংবা প্রাপ্ত বয়ষ্ককে যতই শাসন না করে, শাস্তি না দিয়ে বোঝানো হোক না কেনো, তার মূলে অর্থাৎ যেখান থেকে সে বড় হয়েছে সেই অতীতে রয়েছে অনেক অত্যাচার যেগুলোকে তারা ভুলতে পারবে না। অবচেতন মনে রয়েই যাবে সেই কালো দিন গুলো। এবং যেকোনো সময় সেগুলোর উল্টো প্রতিক্রিয়া দেখতে পাওয়া যাবে।

তাই যদি করতেই হয় শুভ সূচনা তাহলে শুরু থেকেই করতে হবে এবং শারিরিক মানষিক শাস্তিকে পরিত্যাগ করে নৈতিক শিক্ষা, সৌহার্দ্য এবং বন্ধুত্বপূর্ন পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে।

লেখক – শিক্ষার্থী, শাহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ।

একই ধরনের আরও সংবাদ