অধিকার ও সত্যের পথে

মানুষ মানুষের জন্য…

 আরাফাত শাহীনঃ
“মানুষ মানুষের জন্য/জীবন জীবনের জন্য….” ভূপেন হাজারিকার গাওয়া এই গানটি সকলের হৃদয় ছুঁয়ে গেলেও বাস্তব জীবনে এর প্রয়োগ খুব কমই দেখেছি।সত্য কথা বলতে কী,দিনদিন মানুষের মন যেন সংকুচিত হয়ে পড়ছে।সমাজের দুস্থ অসহায় মানুষকে সাহায্য-সহযোগিতা করা,মানুষের বিপদের দিনে তার মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দেবার মত মানুষের আজ বড় অভাব এই সমাজে।প্রত্যেকেই আজ নিজেকে নিয়ে বড্ড ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।আমাদের মানবিক বোধ এতটাই আজ বিলুপ্ত হয়েছে যে, আমাদের চোখের সামনে হয়ত একজন মানুষ মৃত্যুযন্ত্রণায় ছটফট করছে আর আমরা তাকে পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছি নিজ গন্তব্যে।অসহায় মানুষের প্রতি কি আমাদের সামান্যতম দায়-দায়িত্ব নেই? স্রষ্টা আমাদের ‘সকল সৃষ্টির সেরা’ হিসেবে এজন্যই কি সৃষ্টি করেছেন? তবে আমরা কেন এভাবে নিজেদের দায়িত্ব এড়িয়ে চলি!

সমাজের এমন নানামুখী অনাচার এবং পারস্পরিক অসহযোগিতার দিনেও যখন কিছু মানুষকে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের আনন্দে হাসতে দেখি আর তাদের দুঃখের দিনে তাদের সাথে চোখের অশ্রু বিসর্জন করতে দেখি, তখন বড্ড ভালো লাগে।তখন মনে হয়, না, পৃথিবীটা এখনও শ্মশান হয়ে যায়নি।এখনও মানুষের বসবাসের উপযোগী জমিন দুনিয়াতে আছে।কিছু মানুষ আজও নিঃস্বার্থভাবে মানুষের সেবায় নিজেদের মেধা,অর্থ এবং শ্রম বিনিয়োগ করে চলেছে। এতে কি তাদের কোনো স্বার্থ আছে? আসলে তারা এ’কাজ করে সীমাহীন তৃপ্তি অনুভব করেন।অসাধারণ এক ভালোলাগায় উদ্ভাসিত হয় তাদের হৃদয়।গতকাল আমার এমন একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সাথে কাজ করার সামান্য সুযোগ হয়েছে।আমার নিজ এলাকায় একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের উদ্যোগে বিনামূল্যে চক্ষু পরীক্ষা এবং তারপর তাদের বিনামূল্যে চোখের ছানি অপারেশন করানোর ব্যবস্থা করা হয়।আমি সেখানে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে সারাদিন কাজ করেছি।সেখানে সমাজের সকল শ্রেণীপেশার মানুষ এসেছিলেন।তাদের প্রত্যকের নানামুখী সমস্যার কথা ধৈর্য ধরে শোনা এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা চাট্টিখানি কথা নয়।তারপরও দিনশেষে তাদের মুখে হাসির রেখা দেখতে পাওয়া মোটেও কম নয়।

চোখের ছানি অপারেশনের জন্য যে সমস্ত মানুষকে চক্ষু হাসপাতালে আনা হয় তাদের প্রত্যকের বয়স ৫০ থেকে ৮০ বছরের মধ্যে।স্বেচ্ছাসেবক প্রতিনিধি হিসেবে আমি তাদের সাথে খুলনা পর্যন্ত যাই।তাদের সকলকে সুশৃঙ্খলভাবে গাড়িতে তোলা,নামানো এবং হাসপাতালে নিজস্ব রুম পর্যন্ত পৌঁছে দেবার পর যখন তাদের সুখী মুখখানা দেখি,তখন দিনের সমস্ত ক্লান্তি নিমেষে উধাও হয়ে যায়।পৃথিবীতে বেঁচে থাকা তখন স্বার্থক মনে হয়।আমার সাথে সারাদিন যারা অক্লান্ত পরিশ্রম করেছে তাদের মনোভাবও নিশ্চয় আমার মতই হবে।কারণ এখানে ব্যক্তিচিন্তার বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই।

এমন একটি উদ্যোগ গ্রহণ করার পর পুরো এলাকায় তার একটি ব্যাপক ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়া স্বাভাবিক।পড়েছেও তাই।এলাকার মানুষ আমাদের সংগঠনটির প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে।এমন একটি সফল আয়োজন সম্পন্ন করতে পেরে আমরাও খুশী।এখন একটা ব্যাপার দেখুন,আমাদের এটা করতে হয়ত একটু কষ্ট হয়েছে তবে এটা কোনো ব্যাপার নয়।আমাদের একটু আন্তরিক প্রচেষ্টা হয়ত অসংখ্য মানুষের চোখে আলো দেখতে পাবে।নতুন করে তারা বাঁচার আশা দেখবে।

আমরা একটু চেষ্টা করলেই দুর্বল-অসহায় মানুষদের পাশে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসতে পারি।আমাদের একটু আন্তরিক প্রচেষ্টা আর সহানুভূতির ফলে যদি একজন মানুষের মুখে হাসি ফুটে ওঠে তাতে ক্ষতি কী! আমাদের এখন এগিয়ে আসা বড্ড প্রয়োজন।মানুষ যদি মানুষের পাশে এসে না দাঁড়ায় তাহলে এই পৃথিবী কিছুতেই বসবাসের যোগ্য থাকবে না।পৃথিবীকে আরো সুন্দর এবং বাসযোগ্য করে গড়ে তোলার জন্য মানুষের পাশে এসে দাঁড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। আমাদের একটা কথা অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে কোনো মানুষের একার পক্ষে এটা সম্ভব নয়।সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।আসুন,’মানুষ মানুষের জন্য’ কথাটিকে আমরা সবাই মিলে সত্য বলে প্রমাণ করি।

লেখক- শিক্ষার্থী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়,রাজশাহী।

একই ধরনের আরও সংবাদ