অধিকার ও সত্যের পথে

গুণগত প্রাথমিক শিক্ষা ও শিক্ষক শিক্ষণ

 সালাহউদ্দিন সোহাগ

শিক্ষা কার্যক্রমের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, শ্রেণিকক্ষ ও পাঠ্যপুস্তক। কোনো ধরনের শিক্ষা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে হলে এর কোনোটি বাদ দিয়ে বা এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। এসবের মূলে রয়েছে শিক্ষার্থী। তাদের ঘিরেই সমগ্র শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে থাকে। শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রম সামনের দিকে এগিয়ে নেন। যেখানে পাঠ্যপুস্তক সহায়কের ভূমিকা পালন করে। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে টেকসই উন্নয়নের অন্যতম একটি লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে গুণগত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, ্‘Ensure inclusive and quality education for all and promote lifelong learning’. কেননা ইতিমধ্যে বাংলাদেশ সহস্রাব্ধ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জন করেছে। প্রাথমিক স্তরে প্রায় শতভাগ ভর্তি নিশ্চিতের পাশাপাশি ঝরে পড়ার হার অনেকাংশে কমিয়ে এনেছে। উল্লেখ্য, ২০০৫ সালে বাংলাদেশের প্রাথমিক স্তরের ভর্তির হার ছিল ৮৭.২ শতাংশ, যা ২০১৫ সালে উত্তীর্ণ হয়ে দাঁড়ায় ৯৭.৭ শতাংশ। অন্যদিকে প্রাথমিক স্তরে শিশুদের ঝরে পড়ার হার উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসে। সরকারি তথ্যমতে, ২০০৫ সালে প্রাথমিক স্তরে ঝরে পড়া শিশুর হার ছিল ৪৭.২ শতাংশ, যা ২০১৫ সালে কমে ২০.৪ শতাংশ হয়। প্রাথমিক স্তরে ভর্তির হার বৃদ্ধি ও ঝরে পড়ার হার কমিয়ে নিয়ে আসার কারণে বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যান্য দেশের কাছে ইতিবাচক উদাহরণ তৈরি করেছে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের অন্যতম একটি মাধ্যম হচ্ছে গুণগত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা। গুণগত প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন মানসম্মত শিক্ষক, শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক। জাতিসংঘ টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য ২০৩০ সালের মধ্যে প্রাথমিক স্তরের শিশুদের পাঠদানের জন্য যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষক বৃদ্ধির পাশাপাশি শিক্ষকদের আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার নির্দেশ দিয়েছে।

এবার বাংলাদেশ এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য কোন পথে হাঁটছে, সেদিকটি একটু দেখি। ব্যানবেইসের দেওয়া তথ্যমতে, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে তিন লাখ ৫১ হাজার ২১৩ জন শিক্ষক কর্মরত রয়েছেন। যাদের মধ্যে ১৩.১ শতাংশ এসএসসি, ২৯.৩ শতাংশ এইচএসসি, ৩২.৭ শতাংশ অনার্স-ডিগ্রি (পাস) এবং ২৯.৪ শতাংশ মাস্টার্স পাস। সম্প্রতি সময়ে বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি) থেকেও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এ ছাড়াও নতুন পে স্কেল বাস্তবায়িত হওয়ার পর উচ্চ ডিগ্রিধারী মেধাবীরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে যোগ দিচ্ছেন। যারা বিভিন্ন বিষয়ে অনার্স কিংবা মাস্টার্স ডিগ্রিধারী হলেও শিক্ষক শিক্ষায় তাদের কোনো ডিগ্রি নেই। ফলে তারা শ্রেণিকক্ষে পেশাগত দক্ষতার পরিচয় দিতে পারছেন না। এমনকি একবিংশ শতাব্দীর শিক্ষক হিসেবেও তারা চ্যালেঞ্জ নিতে প্রস্তুত নয়। তাই প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নের লক্ষ্যে শিক্ষক শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ ছাড়া শ্রেণিকক্ষে দাঁড়ানোটা অনেক ভয়ের। তাই শিক্ষকদের শ্রেণিকক্ষে পাঠানোর আগে তাদের শিক্ষণ বিজ্ঞানের বিষয়গুলোর ওপর প্রশিক্ষণ দেওয় জরুরি। একই সঙ্গে তাদের জন্য শিখন-শেখানো কার্যক্রম সংক্রান্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করাও যেতে পারে। কেননা এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষকরা শিশু শিক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়গুলো সম্পর্কে অবগত হতে পারেন এবং কীভাবে শিশুদের শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়, সে সম্পর্কে জানতে পারেন। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য পিইডিপি-৩-এর আওতায় দেশের ৬৬টি প্রাইমারি টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে (পিটিআই) দেড় বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা ইন প্রাইমারি এডুকেশন (ডিপিএড) কোর্স চালু করা হয়েছে। ইতিমধ্যে ২১ হাজার ৪৯ জন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক এই কোর্স সম্পন্ন করেছেন। তবে এখনও তিন লাখ ৩০ হাজার ১৬৪ জন শিক্ষক এই কোর্সের আওতায় আসেনি। এর পাশাপাশি নতুন আরও শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। ফলে পূর্ববর্তী কর্মরত শিক্ষকদের পাশাপাশি নতুন আরও শিক্ষক যোগ হওয়ায় ব্যাকলগ দীর্ঘ থেকে আরও দীর্ঘতর হচ্ছে। তাই সময় এসেছে নতুন করে চিন্তা করার। বিশেষ করে যেসব শিক্ষার্থী ভবিষ্যতে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করবেন তাদের জন্য প্রি-সার্ভিস কোসের ব্যবস্থা করা। একটি নির্দিষ্ট সময় শেষে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে তাদের অগ্রাধিকার এবং একটা সময় শুধু এই ডিগ্রিধারীদের নিয়োগ দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। ফলে দেখা যাবে, নতুন যেসব মেধাবী শিক্ষকতা পেশায় আসবেন তাদের শিক্ষক জীবন শিক্ষক শিক্ষার ডিগ্রির মধ্য দিয়েই শুরু হবে; যা দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে বলেই আমার বিশ্বাস। উল্লেখ্য, আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ শ্রীলংকাসহ অনেক দেশে (অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, হংকং, জাপান, সিঙ্গাপুর) শিক্ষকতায় আসতে হলে শিক্ষক শিক্ষার ডিগ্রি নিয়েই প্রবেশের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সেসব দেশে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পাশাপাশি শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটগুলোতে প্রাথমিক শিক্ষায় অনার্স কোর্স চালু রয়েছে, যার ফল তারা ইতিমধ্যে পাওয়া শুরু করেছে।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, শ্রীলংকায় শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়নের জন্য ইন-সার্ভিস এবং প্রি-সার্ভিস দুই ধরনের সুযোগ রয়েছে। তারা বিশ্ববিদ্যালয় ও ন্যাশনাল কলেজ অব এডুকেশনের অধীনে শিক্ষক শিক্ষার ওপর প্রি-সার্ভিস কোর্সের ব্যবস্থা রেখেছেন। এ ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অধীনে অনার্স এবং কলেজগুলোর অধীনে দুই বছরের এই কোর্সের আয়োজন করছে। যেখানে এক বছরমেয়াদি ইন্টার্নশিপের ব্যবস্থা রয়েছে। তারা প্রাথমিক শিক্ষা সংশ্নিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ের (ভাষা, গণিত, বিজ্ঞান, নৈতিক শিক্ষা, আইসিটি, শারীরিক শিক্ষা) পাশাপাশি বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত বিষয়গুলোর ওপর প্রি-সার্ভিস প্রোগ্রামের ব্যবস্থা রেখেছে। এখান থেকে যারা পাস করছেন, তাদের প্রাথমিক (১-৫) ও মাধ্যমিক স্তরের (৬-১১) শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার বিধান রেখেছেন। বাংলাদেশেও বর্তমানে যেসব প্রতিষ্ঠান রয়েছে, তাদের মাধ্যমেই প্রি-সার্ভিস শিক্ষক শিক্ষা সম্পর্কিত অনার্স-ডিপ্লোমা কোর্স চালু করা যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে ৬৬টি পিটিআইর মাধ্যমে এই কর্মকাণ্ড শুরু করা যায়। জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমি (নেপ) সে ক্ষেত্রে সার্বিক সমন্বয়ের ভূমিকা পালন করতে পারে। বর্তমান চলমান ডিপিএড কোর্সের আলোকে বর্তমান অবকাঠামো ব্যবহার করে এই কোর্স চালু করা সম্ভব। শুধু প্রয়োজন নতুন জনবল নিয়োগ (শিক্ষায় ডিগ্রি রয়েছে এমন) করে দীর্ঘমেয়াদি কর্মপন্থা নির্ধারণ। উল্লেখ্য, ইন-সার্ভিস প্রশিক্ষণ প্রোগ্রাম চলমান থাকবে। যারা বর্তমানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত আছেন, তারা ইন-সার্ভিসের মাধ্যমে তাদের পেশাগত উন্নয়ন ঘটাবেন। এ ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের বিশেষ বিশেষ প্রশিক্ষণ ইন-সার্ভিসে প্রদানেরও ব্যবস্থা থাকতে পারে।

তাই এখনই সময় ঘুরে দাঁড়ানোর। নতুন করে ভাবনার। সামনে এগিয়ে যাওয়ার। গুণগত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিতকরণের মধ্য দিয়ে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের। কেননা প্রাথমিক শিক্ষার ওপর ভিত্তি করেই আমাদের আগামী প্রজন্ম গড়ে উঠছে। তাই সময় এসেছে পেশাগত দক্ষতাসম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগের। এর জন্য প্রয়োজন একটুখানি উদ্যোগ ও প্রচেষ্টার। যার শুরু হতে পারে প্রি-সার্ভিস অনার্স কোর্স চালুর মধ্য দিয়ে। এভাবেই আমরা আরেক ধাপ এগিয়ে যেতে পারি আলোকিত বাংলাদেশ গড়ার পথে।

শিক্ষা বিষয়ক গবেষক

একই ধরনের আরও সংবাদ