অধিকার ও সত্যের পথে

আশান্বিত নন-এমপিওরা জাতীয়করণের আলো ছড়াচ্ছে

 মো. আলী এরশাদ হোসেন আজাদঃ

২০১৮ সাল নির্বাচনের বছর। সব পেশাজীবীকে বশে রাখা বর্তমান সরকারের অন্যতম সাফল্য। মানুষের অধিকারের কান্না এ মুহূর্তে সরকারের বিড়ম্বনার কারণ না হোক, এ বিষয়ে সরকার অত্যন্ত সচেতন। নন-এমপিওদের আশান্বিত হয়ে ঘরে ফেরা তার-ই বার্তা দিচ্ছে।

হানাহানির আন্দোলন, আমরণ অনশন এ সবের খুব বেশি প্রয়োজন নেই। বরং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মনেযোগ আকর্ষণ করা গেলে, তিনি মানুষের কষ্ট লাঘবে যথেষ্ট আন্তরিক। আমার এতে সন্দেহ নেই।

নন-এমপিওদের অসামান্য অবস্থান তাদেরকে নিয়েগেছে অনন্য উচ্চতায়। এতে প্রামাণিত হয়, লক্ষে পোঁছতে তাদের নিয়ামক শক্তি ছিল: সারাদেশে সর্বস্তরের  নন-এমপিওদের সুদৃঢ় ঐক্য। দল নিরপেক্ষ অনঢ় অবস্থান ও পারষ্পরিক যোগাযোগ।ঘোষিত কর্মসূচিতে সর্বাত্মক অংশগ্রহণ।পর্যায়ক্রমিক, শান্তিপূণর্, বিরতিহীন ও ধারাবাহিক কর্মকৌশল  বারাবার   সংগঠিত হওয়া, চরম সহিষ্ণুতা ও ত্যাগ। আশাবাদী ও দৃঢ় সংকল্প। বিভিন্ন পেশাজীবী ও সামাজিক শক্তির সমর্থন। লেজুড়বৃত্তি ও স্থুলস্বার্থ পরিহার। সঠিক নেতৃত্ব ও আন্তঃসাংগঠনিক সমন্বয়। বহুমুখী বিষয়াদি বিবেচনায় তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেবার যোগ্যতা।
এ সবকিছু পর্যালোচনা করে আমি আমার পেশাগত অভিজ্ঞতায় সিকি শতাব্দির বাস্তবতা থেকে দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে পারি, নন-এমপিওদের তৎপরতা সমগ্র শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণের পথচলাকে এগিয়ে নিয়ে যাবে সাফল্যে চূড়ান্ত গন্তব্যে।
দেশ এখন টেকসই উন্নয়ণ লক্ষমাত্রা অর্জনের পথে এবং মধ্যম আয়ের দেশের তালিকায় নাম লেখাতে যাচ্ছে। কিন্তু বেসরকারি শিক্ষকবৃন্দের যাপিতজীবনের পরতে পরতে না পাবার না হবার জ্বালাময় হাহাকার। দেশে যখন কোনো রাজনৈতিক ও পেশাগত আন্দোলন নেই। তখন শুধু বিভিন্ন স্তরের শিক্ষকরা তাদের বাঁচার দাবীতে সোচ্চার হচ্ছেন। এই দেখাগেল, প্রাইমারির শিক্ষক, তো পরক্ষণেই বেসরকারি শিক্ষক। কখনো শিক্ষা জাতীয়করণের দাবি। কখনো জাতীয়করণ আত্মীকরণ দ্ব›দ্ব, ক্যাডার ও নন-ক্যাডার প্রসঙ্গ। কখনো অনার্স-মাস্টার্সের শিক্ষকের এমপিওভুক্তি। কখনো নন-এমপিও প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তি। আবার এমপিওভুক্তদেরও আছে বঞ্চনা দীর্ঘ আখ্যান। আছে, মাদ্রাসা শিক্ষকদের কষ্টের দীর্ঘশ্বাস। এ সব বিবেচনায় তাদের অবস্থান ভিন্ন ভিন্ন। অথচ তাদের চাওয়া অভিন্ন। তাদের চাওয়া হলো: অন্যান্য পেশাজীবীর মতোই তাদের শ্রমের মূল্য ও জীবনধারনের নূনঃতম অধিকারের স্বীকৃতি।
দিনে দিনে শিক্ষকদের মধ্যে ক্ষোভ-হতাশা ও কষ্ট বাড়ছে। ইতোঃমধ্যেই সারাদেশে মানববন্ধনসহ নানান কর্মসূচিতে তারা সোচ্চার। অধিকারের দাবিতে শিক্ষকের মৃত্যু। আদালতে রিট। নানান বিবেচনায় উচ্চ আদালত দিচ্ছে স্থগিতাদেশ, কারণ দর্শাও নোটিশ, দিচ্ছে সিদ্ধান্ত। তবুও বাড়ছে সমস্যা এবং জটিলতর হচ্ছে সমাধানের সব প্রয়াস।
শিক্ষা জাতীয়করণ এ জন্যই প্রয়োজন যে, মানুষ গড়ার কারিগরকে এমপিওভুক্তির নামে দেওয়া হয় ‘অনুদান’। এমপিওভুক্তগণের প্রত্যাশিত ৫% প্রবৃদ্ধি ও বৈশাখিভাতা নিয়ে জিজ্ঞাসার উত্তর মিলছে না! ২০১৫ বেতনস্কেলের নিদের্শনায় রয়েছে বৎসরান্তে জুলাই মাসে জাতীয় বেতনস্কেলভুক্তগণ ৫% বার্ষিক প্রবৃদ্ধি সুবিধা পাবেন, যা চক্রবৃদ্ধি হারে অব্যহত থাকবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আগ্রহে ২০% বৈশাখিভাতা চালু হয়। অথচ জাতীয় বেতনস্কেলভুক্ত সবাই সুবিধা দু’টি ইতোঃমধ্যেই পেলেও শুধু বঞ্চিত রয়ে গেছেন এমপিওভুক্তগণ।
এমপিওভুক্তগণ বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট, পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল ও উৎসবভাতা পান না। তারা পদোন্নতি, স্বেচ্ছাঅবসর, বদলি সুবিধাসহ অসংখ্য বঞ্চনার শিকার! তারা পদমর্যাদা অনুযায়ী বাড়িভাড়া পান না। ‘প্রিন্সিপাল থেকে পিওন’ সবাই বাড়িভাড়া পান ১০০০/=, চিকিৎসাভাতা ৫০০/= মাত্র। এ গুলো নিতান্তই অপ্রতুল।
অন্যদিকে শিক্ষকদের প্রত্যাশার মধ্যে রয়েছে: সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কমিটি বা পরিচালনা পরিষদ দলীয় রাজনীতিমুক্ত রাখা এবং তা সংস্কার করে সভাপতি ও সদস্যদের শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ, বিচ্ছিন্ন ও খÐিতভাবে স্কুল কলেজ জাতীয়করণের স্থলে সুনিদির্ষ্ট পরিকল্পনা প্রণয়ন করে শিক্ষা জাতীয়করণ করা, সিলেবাস অনুযায়ী বিষয়ভিত্তিক পর্যাপ্ত সংখ্যক শিক্ষক নিয়োগ ও অনার্সসহ স্কুল, মাদ্রাসা, কলেজের সকল স্তরের নন-এমপিও শিক্ষকদের নিঃশর্তভাবে শীঘ্রই এমপিওভুক্ত করা, শিক্ষাখাতে জাতীয় বাজেটের ২০% বা জিডিপির ০৬% বরাদ্দ নিশ্চিত করা, কর্মরত সব শিক্ষকের চাকুরির মেয়াদকাল ৬০ থেকে ৬৫ বছরে উন্নীত করা।
আশার কথা, অবস্থা বদলাচ্ছে দ্রুত। এমন বাস্তবতার মধ্যেই ‘শিক্ষা জাতীয়করণে’র আওয়াজে নেতৃবৃন্দকে উপযোগি পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। এখনই শিক্ষক সংগঠনগুলোকে এক প্লাটফর্মে ঐক্যবদ্ধ আওয়াজ তুলতে হবে। ভেদাভেদ ভুলে ‘সমগ্র শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণে’র একটি মাত্র দাবিতে অভিন্ন কৌশল ও পদক্ষেপে অগ্রসর হতে হবে। অথচ, দূঃখজনক সত্য, আকাশের লক্ষ তারার মতোই শিক্ষক নেতৃবৃন্দের অসংখ্য ধারা! শিক্ষক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ হয়তো এ বিষয়ে একমত যে, ‘তারা কখনো ঐক্যবদ্ধ হবেন না’!
বস্তুতঃ ‘সমগ্র শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণে’র দাবি শুধু একজন শিক্ষকের সুখী জীবনযাপনের জন্য নয়। এ দাবি শুধু শিক্ষকের পেশাগত বঞ্চনার অবসানের জন্য নয়। বরং এ দাবি সব মানুষের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি। শিক্ষা জাতীয়করণ হলে: গরিব-দূঃখি সবার সন্তান উন্নততর শিক্ষার সুযোগ পাবে। গরিবের শিক্ষালাভের সুযোগ বাড়বে এবং ব্যয় কমবে। গ্রামের মানুষকে শহরে গিয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য ভীড় করতে হবে না। সবার তো শহরে যাওয়ার সামর্থ্যও নেই। এ সমস্যার সমাধান হবে। বড় বড় শহরে জন-স্ফীতি হ্রাস পেলে যানজট থাকবে না। শিক্ষাক্ষেত্রে গুণগত পরিবর্তন হবে। মান সম্মত শিক্ষা ও শিক্ষকের ঘাটতি দূর হবে। ভাল প্রতিষ্ঠান, খারাপ প্রতিষ্ঠানের প্রচলিত ধারণা থাকবে না। সবার জন্য শিক্ষা, নারী শিক্ষা, কর্মমুখী বা কারিগরি শিক্ষাসহ সব ক্ষেত্রে প্রভুত উন্নতি সাধিত হবে।
ক্রমশ একমুখী শিক্ষাব্যবস্থা চালু করা সহজ হবে।  মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন হবে সহজতর এবং দ্রুত।
পরিশেষে প্রত্যাশা ‘এক ঘোষণায় দেশের সমগ্র শিক্ষাব্যবস্থা’ অচিরেই জাতীয়করণের যুগান্তকারী পদক্ষেপগ্রহণ করবেন শিক্ষক দরদী প্রধানমন্ত্রী, জননেত্রী শেখ হাসিনা। তাঁর উদ্দেশ নিবেদন:
আড়ালে মুছে চোখের জল
বেসরকারি শিক্ষকগণ হাসতে পারে অবিরল।
মানুষ গড়তে, সদা তারা থাকে অবিচল
তাদের শোভা নানান বঞ্চনার শিকল।।
তবুও
চাই না শুনতে শিক্ষকের দীর্ঘশ্বাস
চাই রাখতে শেখ হাসিনার প্রতি বিশ্বাস।
চাই শিক্ষকের সস্তির নিঃশ্বাস
চাই সাম্যের সুন্দর বাংলাদেশ।।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ইসলামিক স্টাডিজ কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজ কাপাসিয়া।

একই ধরনের আরও সংবাদ