অধিকার ও সত্যের পথে

পাঠ্যপুস্তক দিবসের প্রাসঙ্গিকতা এবং বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার গতিপ্রকৃতি

 বদরুল আলম সোহেলঃ
বিগত বছরগুলোর ন্যায় এবারও সারা দেশজুড়ে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে  ব্যাপক উৎসাহ ও উদ্দীপনা নিয়ে গত ১ জানুয়ারি সারম্ভরে পালিত হলো পাঠ্যপুস্তক দিবস’২০১৮। বছরজুড়ে পালিত নানা দিবসের ভীরেও অধুনা পাঠ্যপুস্তক দিবসটির গুরুত্ব ও আবেদন সঙ্গত কারণেই আমাদের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের নিকট সবচে আকর্ষণীয় এবং তাৎপর্যময় হয়ে ওঠেছে। 
বছরের প্রথম দিনেই নতুন বই  হাতে পেয়ে  শিক্ষার্থীদের চোখে-মুখে আনন্দের ঝিলিক দেখা দেয়। কোন মূল্য দিয়েও যে আনন্দ কেনা যায় না তা তারা সম্পূর্ণ বিনামুল্যে পেয়ে যায় সরকারের এমন  মহৎ উদ্যোগের ফলে। নববর্ষে এরচেয়ে শ্রেষ্ঠ ও মধুর উপহার তাদের জন্য আর কিবা হতে পারে। পৃথিবীর অন্য কোন দেশে এমনভাবে উৎসব করে শিক্ষার্থীদের হাতে শিক্ষাবর্ষ শুরুর দিনেই বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক তুলে দেয়ার খবর আমার জানা নেই।
শিক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এবং আর্থসামাজিক ও অন্যান্য প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়ে সকল শিক্ষার্থীর  মাঝে শিক্ষা সমভাবে ছড়িয়ে দেয়ার মহৎ এ কর্মযজ্ঞটি বিশ্ব দরবারে জাতি হিসেবে আমাদের পরিচিতিকে আলোকিত করবে নিঃসন্দেহে।
দেশের আপামর জনসাধারণের শিক্ষা ব্যয় কমানোর পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের শিক্ষা বছরকে পরিপূর্ণরূপে সদ্ব্যবহার করার অবারিত সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে এ অনন্য দিবসটি। মনে পড়ে, ছাত্রজীবনে আমাদের পড়াশুনা শুরু হতো বাবার কষ্টার্জিত অর্থে কেনা বই দিয়ে। তখনকার সময় প্রায় প্রতিটি পরিবারের সন্তান সংখ্যা বর্তমান পরিবারগুলোর চেয়ে কয়েকগুণ বেশী ছিল। আমাদের পিতামাতাদের তাই বছরের শুরুতেই সন্তানদের বই কেনার টাকা যুগানোর দুশ্চিন্তা  করতে হতো। তাই তাঁরা সময়মত সন্তানদের হাতে  বই তুলে দিতে পারতেন না অনেকসময়।
তখন বই প্রাপ্তির একমাত্র স্থান লাইব্রেরিতেও প্রায়সময় পর্যাপ্ত বইয়ের সংকট এবং বই নিয়ে ব্যবসায়ীদের নানা কারসাজি দেখা দিত। ফলে শিক্ষার্থীরা নিশ্চিন্ত মনে তাদের শিক্ষাবর্ষ শুরু করতে পারতো না। এমন অবস্থার মধ্যেও যখন নতুন পাঠ্যবই হাতে পেতাম আমাদের তখন আনন্দের সীমা থাকতো না। নতুন বইয়ের ঝকঝকে মলাট, কাগজের ঘ্রাণ, পাঠ্য বইয়ের মুদ্রিত অক্ষর, লেখা, গল্পকবিতা, ছবি আর চিত্র দেখতে দেখতে কীভাবে যে সময় চলে যেত তা বুঝতেই পারতাম না। তবে বর্তমান সময়ে শিক্ষার্থীরা এমন উচ্ছ্বাস ও আনন্দ আরও স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রকাশ করার সুযোগ পাচ্ছে।
একটি দেশের শিক্ষা যে, জাতীয় উন্নতি ও প্রগতির জন্য অপরিহার্য তা বর্তমান সরকার সবচে ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছে। বর্তমান জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে জ্ঞান-বিজ্ঞান, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তনের সাথে সাথে মানুষের চাহিদা ও দৃষ্টিভঙ্গীরও পরিবর্তন ঘটে চলেছে প্রতিনিয়ত। পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে শিক্ষার্থীদের শিখন-চাহিদাও দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। এ চাহিদানুযায়ী শিক্ষাকে যুগোপযোগী করার জন্য বর্তমান সরকার জাতীয় শিক্ষানীতি ও শিক্ষাক্রম প্রণয়ন থেকে শুরু করে শিক্ষায় আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত কলাকৌশল প্রবর্তন, প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও মূল্যায়ন পদ্ধতির আমুল পরিবর্তন, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার, শিক্ষক প্রশিক্ষণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা গ্রহণ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং সর্বোপরি শিক্ষার্থীদের হাতে বিনামূল্যে বছরের প্রথম দিন পাঠ্যবই তুলে দেয়ার মাধ্যমে শিক্ষাক্ষেত্রে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনে দিয়েছে। এ পরিবর্তন তখনই প্রত্যাশিত ও কাঙ্খিত ফল বয়ে আনবে যখন শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এই নব পরিবর্তনের সাথে মানানসই হয়ে তাল মেলাতে পারবে এবং যখন তাঁরা এ ব্যাপারে ঐকান্তিক চেষ্টা ও পরম আন্তরিকতার পরিচয় দেবে।
তবে দুঃখের বিষয় হলো, শিক্ষাক্ষেত্রে সরকারের এমন মহৎ পরিকল্পনা ও উদ্যোগের সফল প্রয়োগ  যেমন অনেকক্ষেত্রে অদৃশ্য থাকে তেমনি যথাযথ বাস্তবায়নের অপরিপক্বতা বা দুর্বলতার কারণে তা প্রত্যাশিত সাফল্যকেও অনেকাংশে অধরা রাখে। এদিকে দেশের শিক্ষা পরিকল্পনাবিদ ও নীতিনির্ধারকগন শিক্ষার জন্য নব প্রবর্তিত বিষয়াবলীর শতভাগ বাস্তবরূপ দেয়ার জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও অনুকূল পরিবেশ রচনার পূর্বেই এ বিশাল ও গুরুত্বপূর্ণ কর্মযজ্ঞ বাস্তবায়নে অতি কর্মতৎপর হয়ে ওঠেন। অন্যদিকে শিক্ষাক্ষেত্রে নব প্রবর্তনের সাথে অনেক শিক্ষক তাল মেলাতে গিয়ে খেই হারিয়ে ফেলেন।
অনেকের মাঝে আবার এ সম্পর্কে আগ্রহ ও আন্তরিকতারও অভাব পরিলক্ষিত হয়। শিক্ষক প্রশিক্ষণও যে শতভাগ মানসম্পন্ন তা বলা যায় না। ফলে কোটি কোটি টাকার বৈদেশিক ঋণে পরিচালিত এসব প্রশিক্ষণ শিক্ষকবৃন্দের পেশাগত দক্ষতা অর্জনে ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনে প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখতে পারছে না। তাই প্রশিক্ষণের গুনগত মান উন্নয়ন করে সরকারি ও বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত দেশের সকল শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজগুলোকে আধুনিক, যুগোপযোগী ও পরিপূর্ণ শিক্ষক তৈরির উপযুক্ত কারখানায় রূপান্তরিত করতে হবে।
সব উদ্যোগ সঠিকভাবে পরিচালনা করে শিক্ষার কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জন করতে হলে শিক্ষা সংশ্লিষ্ট সবকিছু যথাযথ ও কার্যকর মনিটরিং এর অাওতায় আনতে হবে। শিক্ষাক্ষেত্রে সকল দুর্নীতি ও অনিয়ম দূর করতে হবে শক্তহাতে। প্রশ্নপত্র ফাঁস সহ পরীক্ষা হলে শিক্ষার্থীদের একে অপরের উত্তরপত্র দেখাদেখি করে লেখা বা অসদুপায় অবলম্বনের চেষ্টা থেকে বিরত রাখতে যথাযথ ও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। শিক্ষকবৃন্দের নির্বিঘ্ন দায়িত্বপালনে সহায়তা করতে তাঁদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তা দিতে হবে এবং তাঁদের ন্যায্য পাওনা ও অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। তাছাড়া শিক্ষা সংশ্লিষ্ট সকলকে নিজ উদ্যোগে তাঁদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য যেমন উদ্যোগী হতে হবে তেমনি শিক্ষাক্ষেত্রে নব নব আবিষ্কার ও গবেষণা সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারনা ও জ্ঞান রাখতে হবে।
দেশের সম্মানিত শিক্ষকবৃন্দকে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের শারীরিক, মানসিক, বৌদ্ধিক, নান্দনিক ও আত্মিক বিকাশের দিকে যত্নশীল হওয়ার পাশাপাশি আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানে ও তথ্য প্রযুক্তিতে নিজেদের দক্ষ করতে অবিরত চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে ।  সবার সম্মিলিত  চেষ্টা ও আন্তরিকতা থাকলে সরকারের মহৎ উদ্যোগগুলো যেমন সফল হবে তেমনি উন্নতি ও প্রগতির পথে আমাদের শিক্ষা বহুদূর এগিয়ে যাবে।
আমরা জানি যে, যুগোপযোগী, আধুনিক, সৃজনশীল এবং উন্নত মানসিকতা সম্পন্ন আদর্শবান ও আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী শিক্ষকগণই তাঁদের শিক্ষার্থীদের মাঝে বেঁচে থাকেন চিরকাল চির অনুসরণীয় হয়ে। আশা করি, শিক্ষাব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি হিসেবে দেশের সম্মানিত শিক্ষকবৃন্দ তাঁদের ওপর অর্পিত মহান দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে বদ্ধপরিকর হবেন। তবেই জাতি পাবে জ্ঞানী, সৃজনশীল, কর্মক্ষম, দক্ষ ও উদ্যমী প্রজন্ম যাঁরা নীতি ও আদর্শের পথে সদা বিচরণ করে একসময় বিশ্বমানের মানুষে পরিণত হবে। দেশের ভবিষ্যত কান্ডারী এসব সূর্য সন্তানের দিকে জাতি আজ সকল হতাশা থেকে মুক্তি পেতে এবং একটি সুখী ও সমৃদ্ধ দেশ দেখতে এক আকাশ আশা নিয়ে তাকিয়ে আছে। আমরা তাঁদের চলার পথের প্রতি পদক্ষেপে সফলতা ও কৃতিত্বের চিহ্ন দেখার প্রত্যাশা করি। অফুরন্ত শুভেচ্ছা ও নিরন্তর শুভকামনা জানাই তাঁদের।
লেখাটি পাঠ্যপুস্তক দিবসের গুরুত্ব ও তাৎপর্য নিয়ে শুরু করলেও আমাকে প্রাসঙ্গিকভাবেই এরসাথে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের অবতারণা করতে হয়েছে। তবে সকল আলোচনার যবনিকাপাত ঘটাবো বই প্রসঙ্গে আরও দুটো কথা দিয়ে। বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ  Neil Gaiman বলেছেন, “A book is a dream that you hold in your hand.” অর্থাৎ বই স্বপ্ন রূপেই তোমার হাতে ধরা দেয়। বই যেমন মানুষকে স্বপ্ন দেখাতে অনুপ্রাণিত করে তেমনি সে স্বপ্ন বাস্তবায়নের সঠিক দিকনির্দেশনাও দেয়। তাই বই হলো একই সাথে স্বপ্ন বুনন ও স্বপ্ন পূরণের এক অনন্য মাধ্যম। বইকে ভালোবেসে আমাদের কোমলমতি শিক্ষার্থীরা এর যত বেশী চর্চা করবে তারা তত বেশী নিজেদের জানার জগতটাকে আরও বিস্তৃত করতে পারবে। তাই শিক্ষাবিদ Jacqueline Kennedy Onassis যথার্থই বলেছেন, “There are many little ways to enlarge your child’s world. Love of books is the best of all.”
লেখকঃসহকারী শিক্ষক
গৌরীপুর আর.কে. সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়,
গৌরীপুর, ময়মনসিংহ। 
একই ধরনের আরও সংবাদ