অধিকার ও সত্যের পক্ষে

বই উৎসবের একাল সেকাল

 অলোক আচার্য্যঃ

বছরের শুরুতেই নতুন বই পৌছে গেছে দেশের প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সব ছাত্রছাত্রীর হাতে। এই কোটি কোটি ছাত্রছাত্রী একদিনে হাসিমুখ নিয়ে বাড়ি ফিরেছে। এর থেকে ভাল শুরু একটি দেশে আর কি হতে পারে।

চমৎকার একটি উৎসবের মধ্যে দিয়ে গত কয়েক বছর ধরে আমাদের দেশে নতুন বছর শুরু হয়। বলা যেতে পারে এর থেকে নির্মল হাসির উৎস আর দ্বিতীয়টি নেই। ছোট ছোট কোমলমতি ছাত্রছাত্রীর হাতে নতুন বই তুলে দেওয়ার আনন্দ অনুভব করতে পারেন শিক্ষকরা। যে বিপুল আগ্রহ নিয়ে ওরা নতুন বইয়ের জন্য অপেক্ষা করে তার তুলনা যেন আর কিছুতেই হয় না।

এই আনন্দের, উৎসাহের সত্যিই কোন তুলনা করা যায় না। সন্তান যখন নতুন বই নিয়ে খুশি মনে বাড়ি ফেরে তখন সেই খুশি স্পর্শ করে তার অভিভাবককে। হাসি ফোটে তার মুখেও। বার্ষিক পরীক্ষার পর থেকেই দেশের কোটি কোটি কচি মুখ অপেক্ষা করে থাকে নতুন বইয়ের জন্য। কোন হতদরিদ্র পরিবারের শিশুর মুখে এই চিন্তা থাকে না যে বছরের শুরুতেই তাকে বই কিনতে হবে। অথবা তার অভিভাবকের মুখেও চিন্তার কোন ভাঁজ থাকে না যে সন্তানের নতুন বইয়ের যোগান সে কিভাবে দেবে। বিনামূল্যে বই প্রদানের এই সময়ের আগেও ছাত্রছাত্রীরা বছরের প্রথমে বই পেয়েছে।

তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা নতুন নয় পুরাতন। গত বছরের উপরের ক্লাসের ব্যবহার করা কোন ছাত্রছাত্রীর বই। আমাদের সময়ের কথাই যদি বলি। এখনকার মতই বার্ষিক পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হতো। আর আমরা দুশ্চিন্তায় কাটাতাম যে নতুন বই পড়তে পারবো তো। কারণ ফল প্রকাশের পরপরই আশেপাশের বইয়ের দোকানগুলোতে বই কিনতে রীতিমত হুড়োহুড়ি পরে যেত। এখনকার ছাত্রছাত্রীদের কাছে বিষয়টা রীতিমত অবাক করার।

একসময় এই ঘটনা কেবল গল্পের মত মনে হবে। যারা তুলনামূলকভাবে পয়সাওয়ালা তাদের সন্তানদের তেমন কোন সমস্যা হতো না। কিন্তু যাদের নতুন বই কেনার সামর্থ্য থাকতো না তারা পুরাতন বই দিয়েই বছর শুরু করতো। এমন হতো যে দুই তিনটি নতুন বই বহু কষ্টে কিনে দিতে পারলেও অধিকাংশ ছাত্রছাত্রীর প্রথম দুই তিন মাস সেই দুই তিনটি নতুন বই দিয়েই কেটে যেত। সবগুলো নতুন বই পেতে অনেকেই বছরের অর্ধেক সময় অপেক্ষা করেছে।

আর কেবল বই কিনলেই চলতো না। বইয়ের থেকেও গাইড নোট কেনার দরকার বেশি ছিল! কারণ তখন তো এমন সৃজনশীল প্রশ্ন ছিল না। ছিল মুখস্থ ভিত্তিক প্রশ্ন পদ্ধতি। নোট থেকে গোটা কতক প্রশ্ন মুখস্থ করে নিলেই কাজ শেষ। তাই গাইড নোট কেনার দরকারও ছিল। একে নতুন বই তারপর আবার নোটবই কেনার প্রয়োজন। অভিভাবককে রীতিমত হিমশিম খেতে হতো। আমার মতো যাদের নতুন বই কেনার সামর্থ্য ছিল না তারা আশেপাশের উপর ক্লাসের বই মাস দুয়েক আগেই বলে কয়ে রাখতাম।

এই পুরাতন বইও আবার নতুন বইয়ের এক তৃতীয়াংশ দাম দিয়ে কিনতে হতো। তবে পুরাতন হলেও আমাদের কাছে তা ছিল নতুন। আর সেই বইয়ের আকর্ষণ আজকের নতুন বইয়ের থেকে কম ছিল না। আজকের এই সময়ের সাথে সেসময়ের কত পার্থক্য।

এদিক থেকে আজকে একটি শিশু আমদের থেকে অনেক সৌভাগ্যবান। প্রতি বছর অন্তত সে নতুন বই হাতে নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারে। তাকে সেই বই কেনার জন্য মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হয় না। সেকালেও বই উৎসব হতো। তবে একালের সাথে তার বিস্তর ব্যবধান।

লেখক-সাংবাদিক ও কলাম লেখক। 

একই ধরনের আরও সংবাদ