অধিকার ও সত্যের পথে

গরিবের ঘোড়া রোগ আর কাকে বলে !

 হাসান হামিদঃ

শুরুতেই গল্প।

এক রোগী ডাক্তারের কাছে এলো। ডাক্তার জিজ্ঞেস করলেন, বলুন কি সমস্যা আপনার? রোগী বললো যে তার পা নীল হয়ে গেছে। ডাক্তার শুনে বললেন, সমস্যা তো সিরিয়াস! পায়ে বিষের সংক্রমণ হইছে, পা কেটে ফেলতে হবে। এরপর আসল পা কেটে প্লাস্টিকের পা লাগানোর পরও দেখা গেল,  সেটাও নীল হয়ে গেছে। রোগী ডাক্তারের কাছে গেলে ডাক্তার বললেন, এখন আপনার রোগ বুঝতে পারলাম।

আপনার জিন্সের প্যান্টের রঙ ওঠেআমাদের আসলে এমন কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে। শিক্ষা উন্নয়ন দেখাতে গিয়ে আমারা আসল বিষয় বাদ দিয়ে যা করতে যাচ্ছি তা অনেকটা পা কেটে ফেলে দেওয়ার মতো ভুল চিকিৎসা। আমি অবাক হয়ে কয়েক দিন ধরে ভাবছিলাম, যে দেশে ক্লাসরুমের অভাবে শত শত শিক্ষার্থীরা মাঠে ঘাঠে পড়ে; ভালো শিক্ষা উপকরণ নেই, পর্যাপ্ত কিছুই নেই, সেই দেশের শিক্ষাকর্তারা কেনো এমন ভাবলেন? আমরা এসবের কিছুই বুঝি না? পকেট ভারী করতে করতে, বঞ্চিত করে করে কর্তারা হয়তো জানেন না, কী এক অনিশ্চয়তার মাঝে ফেলে দিচ্ছেন দেশের শিক্ষার্থীদের বিরাট একটা অংশকে।

নাকি তাদের মাথা খারাপ হয়ে গেছে? তারা বুঝি তাদের কিছু হারিয়ে অমন বেদিশা হয়ে গেছেন? তার হারিয়েছেন সম্ভবত তাদের বিবেক আর প্রজ্ঞা। তবে হারালে কিন্তু অনেকেরই মাথা ঠিক থাকে না। গোপাল ভাঁড়ের একবার একটি গরু হারিয়ে গিয়েছিল। চৈত্রের কাঠ ফাটা রোদ্দুরে বনবাদাড়ে খুঁজে খুঁজে সে বিকেলে নিজের বাড়ির দাওয়ায় ধপাস করে বসে ছেলেকে ডেকে বললে, ও ভাই, জলাদি এক ঘটি জল আনো, তেষ্টায় ছাতি ফেটে যাচ্ছে। গোপাল হা-হুতাশ করে বলতে থাকে, ভাইরে! আর বুঝি বাঁচি না। ঘরে গোপালের কোন ভাই থাকত না।

একমাত্র ছেলে, বৌনিয়ে গোপালের সংসার। গোপালের স্ত্রী রান্নাঘরে ছিল, সে গোপালের কথা শুনে বললে, মিনসের এতটা বয়েস হলো তবু যদি একটু কান্ডজ্ঞান থাকত! নিজের ছেলেকে ভাই বলে ডাকছে গা! ঘরে ছেলে ছাড়া কি আর কটা ভাই আছে গো তোমার! স্ত্রীর কথা শুনে গোপাল বললে, সাধের গুরু হারালে এমনই হয় মা! স্ত্রী মা ডাক শুনে একহাত জিভ বের করে সেখান থেকে পালিয়ে যেন বাঁচে। এ আবার কি কথা? সরকারি মাধ্যমিক স্কুলে এসকেলেটর (চলন্ত সিঁড়ি) স্থাপনের উদ্যোগ আমার কাছে মাথা খারাপ গোপালের বক্তব্যের মতো ঠেকেছে!

আমরা কাগজে পড়েছি যে, সরকারি মাধ্যমিক স্কুলে এসকেলেটর স্থাপনের উদ্যোগ নিতে  যাচ্ছে সরকার। এ প্রকল্পের আওতায় এক হাজার ১১৬ কোটি টাকার বিশাল ব্যয়ে  দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ১৬৩টি স্কুলে এই এসকেলেটর স্থাপন করার প্রস্তাব  দিয়েছে মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদফতর। প্রতি জোড়া এসকেলেটরের ব্যয় ধরা হয়েছে ৬ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। কী ভাবছেন? আরে এটা আর এমন কি টাকা? চার হাজার কোটি যে দেশে নস্যি। আচ্ছা, টাকাগুলো কার? আপনার আর আমার, আমাদের টাকা। আমরা তাই আমাদের সন্তানদের স্কুলে আপাতত প্রশিক্ষিত মেধাবী শিক্ষক চাই, প্রচুর নির্ভুল বই চাই, শিক্ষা উপকরণ চাই।

মজার ব্যাপার হলো, দেশের শিক্ষার মান, শিক্ষাদান পদ্ধতি ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সুযোগ-সুবিধার অপ্রতুলতা নিয়ে যখন বিতর্ক তুঙ্গে, তখন অবকাঠামো উন্নয়নের নামে এসকেলেটর নামক বিলাসী প্রকল্পের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে খোদ সরকারের পরিকল্পনা কমিশন। একই সাথে এ ধরনের অদ্ভুত প্রস্তাবকে বিশাল আকারের লুটপাটের পরিকল্পনা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন  বিশেষজ্ঞরা।

তাদের মতে, যেখানে দেশের বেশির ভাগ সরকারি, আধা সরকারি ও বেসরকারি স্কুলের অবকাঠামো খুবই দুর্বল, ভবন ও ক্লাস রুমের সঙ্কট, বৈদ্যুতিক পাখা ও বাতির সঙ্কট, টয়লেটগুলো ব্যবহার অনুপযোগী, লাইব্রেরি, ল্যাব ও কম্পিউটার কক্ষ নেই বললেই চলে; সেখানে এসকেলেটরের মতো ব্যয়বহুল যান্ত্রিক সিঁড়ি স্থাপন শুধু গরিবের ঘোড়া রোগই নয়, বিপজ্জনকও বটে।

তাছাড়া সরকারি স্কুল ভবনগুলো নির্মাণের ক্ষেত্রেও যথোপযুক্ত নিয়মনীতি ও উপকরণের ব্যবহারের বিষয়টিও যেখানে প্রশ্নবিদ্ধ, সেখানে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন এসকেলেটরের ভার  এসব ভবনের ছাদ ও মেঝে বহন করতে গিয়ে বিপর্যয়ের মুখে পতিত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের সহজ লভ্যতা ও নিয়মিত মেইনটেইন্যান্সের  প্রশিক্ষিত লোকবল নিয়েও যথেষ্ট কথা রয়েছে।

সর্বোপরি যাদের জন্য এ এসকেলেটর স্থাপনের প্রস্তাব এসেছে,  গ্রামগঞ্জের সেসব কোমলমতি শিশু এগুলো ব্যবহারে  সুফল ভোগ করবে নাকি বিশ্বের কয়েকটি উন্নত দেশের মতো স্কুল শিক্ষার্থীরা এ যন্ত্র ব্যবহার করতে গিয়ে পা আটকে অথবা হঠাৎ চলন্ত অবস্থায় বৈদ্যুতিক কারণে  বন্ধ হয়ে গেলে মর্মান্তিক মৃত্যুসহ আহতের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে; তা নিয়েও উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ রয়েছে। গ্রামের শিশুরা এসব চলন্ত সিঁড়ির সাথে পা মেলাতে না পেরে হুমড়ি খেয়ে পড়তে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাশের দেশসহ অধিকাংশ উন্নত দেশেই স্কুলপর্যায়ে এ ধরনের এসকেলেটরের ব্যবহার নেই। আর দেশের অধিকাংশ বিদ্যালয়ই দোতলার বেশি নয়। কাজেই দোতলায় ওঠানামার জন্য এসকেলেটরের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

আমাদের জানা দরকার, এসকেলেটর স্থাপনের পক্ষে অবস্থান নিয়ে সংশ্লিষ্ট অধিদফতরের যুক্তি কী দেখিয়েছে তারা? তাদের যুক্তি হলো, এর মাধ্যমে এক সাথে অনেক শিক্ষার্থী ওঠানামা করতে পারবে। বহুতল  ভবনে তাদের ওঠানামার পরিশ্রম কমে যাবে। অন্যদিকে পিইসি বলছে, এমনিতেই  স্কুলগুলোতে জায়গার স্বল্পতা রয়েছে, তার ওপর এসকেলেটর স্থাপনের জন্য অনেক জায়গা প্রয়োজন।

এসকেলেটর স্থাপন করতে গেলে প্রতিটি ভবনের মাঝের ও নিচের ফ্লোর ভাঙতে হবে, যা অনেক ব্যয়সাপেক্ষ। এগুলো করতে গেলে একটি বড় সময়ের জন্য স্কুল বন্ধ দিতে হবে; যাতে শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার ক্ষতি হবে। তা ছাড়া স্কুল শুরু ও ছুটির সময় শত শত শিক্ষার্থী একসাথে ওঠানামা করতে গেলে তা সময়সাপেক্ষ হবে।

এবার কিছু আশেপাশের খবর বলি। দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ম্যানহাটন মাল্টিপ্লেক্স থিয়েটারে ২০০৫ সালের ১৩ জানুয়ারি মুভি দেখতে গিয়ে সিনেপ্লেক্সের এসকেলেটরে পা আটকে ব্রুকলিন স্কুলের ৩০ জন শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হয়। তাদের শরীরে কেটে যায় ও আঘাতপ্রাপ্ত হয়। অন্যদিকে পূর্ব চীনে নানজিংয়ে একটি জাদুঘর পরিদর্শন করতে গিয়ে প্রাথমিক স্কুলের ১৬ জন শিক্ষার্থী আহত হয়। গত ২০১৫ সালের ৯ নভেম্বর এ ঘটনাটি ঘটে চীনের জিয়ানংসু প্রদেশে হংকং ইয়াং স্কয়ারে। দ্য পিপলস ডেইলি অনলাইনে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়। ৪০ জন শিক্ষার্থী এসকেলেটরে ওঠে। সেখানে পাঁচজন শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হয়।

অযৌক্তিক এই প্রকল্পটি ২০২১ সালের জুনের মধ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে শর্তসাপেক্ষে একনেকের অনুমোদন পায়। শর্তগুলো হচ্ছে, মাল্টিস্টোরেড বিদ্যালয়গুলোর জন্য একটি আদর্শ নকশা প্রণয়ন, নকশায় আবশ্যিকভাবে টানা বারান্দা, খোলামেলা ক্লাস রুম, দরজা-জানালার ওপর লুপ গ্লাসের জানালার সংস্থান, ছাদের পানি যাতে সহজেই নেমে যেতে পারে সেজন্য ছাদ ঢালু করা, ছাত্রছাত্রীদের জন্য আলাদা কমন রুম ও পর্যাপ্ত পানিসহ আলাদা বাথ রুম, অ্যাসেম্বলি ও খেলার মাঠ, প্রতিটি ভবনের দু’পাশে দুটি বের হওয়ার রাস্তা, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা এবং লিফটের পরিবর্তে এসকেলেটরের ব্যবস্থা করা।

আমাদের বুঝতে বাকি নেই, অপ্রয়োজনীয় ও অযৌক্তিক এই প্রকল্প কেবলমাত্র লুটপাটের জন্যই হাতে নিতে যাচ্ছে সরকার। প্রকল্পে প্রতি জোড়া এসকেলেটরের ব্যয় ধরা হয়েছে ৬ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। অথচ বাজারে ২০-৪০ লাখ টাকায় অনেক উন্নত মানের প্রতি জোড়া এসকেলেটর পাওয়া যাচ্ছে। এসকেলেটর স্থাপনসহ যাবতীয় ব্যয় মিলে যদি প্রতি জোড়া এসকেলেটরের জন্য এক কোটি টাকা খরচও ধরা হয় তাতেও ৫ কোটি ৮৫ লাখ টাকা উদ্বৃত্ত থেকে যাচ্ছে। এসব টাকা লুটপাট করে ক্ষমতাসীনদের পকেট ভরার জন্যই যে এই প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে সেটা এখান থেকেই স্পষ্ট।

শেষ কথা হলো, এ ধরনের প্রকল্পের কোনো যৌক্তিকতা আমরা দেখছি না। যেখানে স্কুলগুলোতে এখনো অর্থসঙ্কট রয়েছে, সেখানে এসব এসকেলেটর সিঁড়ি বসানো অর্থহীন। আমাদের প্রয়োজন শিক্ষার মান উন্নয়নে অর্থ বরাদ্দ দেয়া। কিন্তু এ এসকেলেটর সিঁড়ি দিয়ে শিক্ষার মানে কী উন্নয়ন হবে?  এ ধরনের প্রকল্প প্রস্তাবনা হাস্যকর মনে হচ্ছে। এ প্রকল্প মানে অর্থের অপচয়। গরীবের ঘোড়া রোগ!

লেখক – তরুণ কলামিস্ট ও কবি। 

একই ধরনের আরও সংবাদ