অধিকার ও সত্যের পথে

দেখতে চাই না শিক্ষকের লাশ, চাই প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাস

 মো. আলী এরশাদ হোসেন আজাদঃ

দেশে মানুষগড়ার কারিগরদের নিয়ে কারো যেন টেনশন নেই! এক সময় ছিল ভূমিদাস! এখন বেসরকারি শিক্ষকগণ যেন শিক্ষাদাস! তাদের পেট ও পকেট ফাঁকা। তাদের মুখের হাসি যেন ক্রীতদাসের হাসি! আড়ালে মুছে চোখের জল বেসরকারি শিক্ষকগণ হাসতে পারে অবিরল। গড়তে মানুষ সদা তারা থাকে অবিচল তাদের শোভা নানান বঞ্চনার শিকল।

যখন এ লেখাটি লেখছি তখন ঢাকা ও আশেপাশের এলাকায় তাপমাত্রা সতেরো ডিগ্রির নিচে, সকালে হয়তো অন্ধকার কাটলেও কূয়াশা থাকবে। অথচ বেসরকারি শিক্ষকদের জীবনে অন্ধকার ও কূয়াশা একারার। বিরূপতার এমন শীত-কূয়াশায় বিমান-ফেরি চলাচল ব্যহত হচ্ছে। বিতরণ হচ্ছে রাস্তায় রাস্তায় কম্বল। অথচ এ সময় অনাহারি-অসুস্থ একদল মানুষ গড়ার কারিগর তিলোত্তমা ঢাকার রাজপথে আকাশে নিচে আহাজারি করছেন।

দেশ এখন ঝউএ (টেকসই উন্নয়ণ লক্ষমাত্রা) অর্জনের পথে এবং মধ্যম আয়ের দেশের তালিকায় নাম লেখাতে যাচ্ছে। কিন্তু বেসরকারি শিক্ষকবৃন্দের যাপিতজীবনের পরতে পরতে না পাবার না হবার জ্বালাময় হাহাকার আকাশের অসীম শূন্যতায় হারায়। নন-এমপিও শিক্ষকগণ বাঁচার জন্য মরতে বসেছেন। কেননা, পরিবার পরিজন নিয়ে বাঁচার নূনঃতম উপায় না থাকলে তো মরাই ভাল। শিক্ষকদের এমপিওভুক্তি যেন নিষিদ্ধ দাবী! নন-এমপিওদের জীবন যেন হাত-পা বেঁধে সাঁতরানোর জন্য ছেড়ে দেবার অপপ্রয়াস!

দেশে যখন কোনো রাজনৈতিক ও পেশাগত আন্দোলন নেই। তখন শুধু বিভিন্ন স্তরের শিক্ষকরা তাদের বাঁচার দাবীতে সোচ্চার হচ্ছেন। এই দেখাগেল, প্রাইমারির শিক্ষক, তো পরক্ষণেই বেসরকারি শিক্ষক। কখনো শিক্ষা জাতীয়করণের দাবী। কখনো জাতীয়করণ আত্মীকরণ দ্ব›দ্ব, ক্যাডার ও নন-ক্যাডার প্রসঙ্গ। কখনো অনার্স-মাস্টার্সের শিক্ষকের এমপিওভুক্তি। কখনো নন-এমপিও প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তি।

আবার এমপিওভুক্তদেরও আছে বঞ্চনা দীর্ঘ আখ্যান। এ সব বিবেচনায় তাদের অবস্থান ভিন্ন ভিন্ন। অথচ তাদের চাওয়া অভিন্ন। তাদের চাওয়া হলো: অন্যান্য পেশাজীবীর মতোই তাদের শ্রমের মূল্য ও জীবনধারনের নূনঃতম অধিকারের স্বীকৃতি।

এতে দিনে দিনে শিক্ষকদের মধ্যে ক্ষোভ-হতাশা দেখা দিচ্ছে। ইতোঃমধ্যেই সারাদেশে মানববন্ধন, হরতাল, সড়ক অবরোধের কর্মসূচিতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সবাই সোচ্চার-সরব হয়েছে। অধিকারের দাবীতে শিক্ষকের মৃত্যু হলো। আদালতে রিটই হলো। নানান বিবেচনায় উচ্চ আদালত দিচ্ছে স্থগিতাদেশ, কারণ দর্শাও নোটিশ, দিচ্ছে সিদ্ধান্ত। তবুও বাড়ছে সমস্যা এবং জটিলতর হচ্ছে সহজ সমাধানের সব প্রয়াস।

আমরা জানি, ১৯৬৬ প্যারিস সন্মেলনে ১৩ টি অধ্যায় ও ১৪৬ টি ধারা-উপধারায় শিক্ষকের মর্যাদা ও অধিকারের সুপারিশ প্রণীত হয়েছে। শিক্ষকদের জন্য প্রণীত সনদে শিক্ষকের চিকিৎসা- স্বাস্থ্যসেবা, ছুটি, বেতন-ভাতা ও মর্যাদার ক্ষেত্রে বলা আছে (ক) সম্মানজনক পারিতোষিক নিশ্চিতকরণ (খ) যুক্তি সংগত জীবনমান বিধানকল্পে সুবিধাদি নিশ্চিতকরণ (গ) স্কেল অনুযায়ী নিয়মিত বেতন-ভাতাদি প্রাপ্তির নিশ্চয়তা (ঘ) জীবনধারণের ব্যয়বৃদ্ধির সঙ্গে বেতন কাঠামো পূণঃবিন্যাস ও বর্ধিতবেতন প্রাপ্তির নিশ্চয়তা ইত্যাদি। তবু চির বঞ্চনাই যেন ‘বেসরকারি শিক্ষক’দের ভাগ্যলিপি
“…..আমি যেন সেই ভাগ্যাহত বাতিওয়ালা,
পথে পথে আলো দিয়ে বেড়াই,
কিন্তু নিজের জীবনেই অন্ধকার মালা”।
(আশরাফ সিদ্দিকী)
‘শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড’। মানব সম্পদ উন্নয়নে শিক্ষার উন্নয়নের বিকল্প নেই। জাতিকে খাড়া, সোঝা ও মজবুত রাখার দায়িত্ব পালন করেন এবং শক্তি যোগায় যারা তারাই ‘মানুষ গড়ার কারিগর’ অর্থাৎ ‘শিক্ষক’। অথচ অভিন্ন সিলেবাসে পাঠদানকারী প্রায় শতভাগ বেসরকারি শিক্ষক নানান বঞ্চনা শিকার।

কারিগরকে অভূক্ত, অবহেলিত রাখলে জাতি হয়ে ওঠবে দূর্বল, অবনমিত ও নিম্নগামী। শিক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকার এবং সবার সমান সুযোগ নিশ্চিতকরণ আমাদের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার বিষয় হিসেবে স্বীকৃত। এ জন্যই একটি মাত্র সর্বসন্মত জাতীয় গণদাবি ‘নন-এমপিওদের নিঃশর্ত ও যথাশীঘ্র এমপিওভুক্তি এবং এক ঘোষণায় সমগ্র শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ’। পরিশেষে উচ্চারণ:
চাই না দেখতে শিক্ষকের লাশ
চাই রাখতে শেখ হাসিনার প্রতি বিশ্বাস।
চাই শিক্ষকের শান্তির নিঃশ্বাস
চাই সমতার সুন্দর বাংলাদেশ।।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজ।

একই ধরনের আরও সংবাদ