অধিকার ও সত্যের পথে

ম্যানেজিং কমিটির ময়নাতদন্ত : শেষ পর্ব  

 হাসান হামিদ:

আজকের লেখার শুরুতেই একটি ছোট ঘটনার কথা বলবো। ঘটনাটির স্থান শ্রীমঙ্গল। সঙ্গত কারণে স্কুলের নাম, ঘটনাকারীর নাম, কাল, সময় উল্লেখ করা যুক্তিযুক্ত হবে না বিধায় এগুলো রাখা হলো পর্দার অন্তরালে। ২০১৩ সালে হবিগঞ্জের একটি স্কুল থেকে ৫ম শ্রেণি পড়–য়া একটি শিশুকে তার পিতা-মাতা মাতার পৈত্রিক নিবাস শ্রীমঙ্গলের একটি প্রত্যন্ত গ্রামে নিয়ে আসেন। যথাযথভাবে সাবেক স্কুল থেকে ট্রান্সফার সার্টিফিকেটও আনা হয়। কিন্তু শিশুটির নানাবাড়ির পাশে যে স্কুলে শিশুটিকে ভর্তি করার কথা, সেই স্কুলে শিশুটিকে নিয়ে যাবার পর সেই সময়ের প্রধান শিক্ষক বেকেঁ বসেন। শিশুটির মাকে সাফ জানিয়ে দেন, স্কুল ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির অনুমোদন ছাড়া স্কুলে ভর্তি করা যাবে না।

ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি আবার এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তি। তার সামনে দাড়িয়ে কথা বলার সাহস এলাকার কারো নেই। প্রধান শিক্ষক কর্তৃক শিশুটিকে স্কুলে ভর্তি করতে অনিহা প্রকাশ করার পরপরই ঘটনাটি এলাকায় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। এলাকায় দৌড়-ঝাপ শুরু হয় উপজেলা প্রশাসন, শিক্ষা অফিসের কর্মকর্তা ও গণমাধ্যম কর্মীদের। গণমাধ্যম কর্মীরা খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন প্রভাবশালী সভাপতির বাড়ি ও ওই শিশুটির নানাবাড়ি পাশাপাশি। ওই দুই বাড়ির মধ্যে পানির ড্রেন নিয়ে বিরোধ দীর্ঘদিনের। ম্যানেজিং কমিটির প্রভাবশালী সভাপতির কাছে যেন অসহায় স্কুলের প্রধান শিক্ষকও। ‘টু’ শব্দটি করার যেন ‘জো’ নেই তাঁর। পরে এলাকার শিক্ষক নেতা, জনপ্রতিনিধি, গণমাধ্যম কর্মীদের হস্তক্ষেপে অনেক জল ঘোলা করে শিশুটি শেষ পর্যন্ত ভর্তি হতে পেরেছিল ওই স্কুলে।

শিশুটি সেই যাত্রায় রক্ষা পেলেও এই ঘটনা আমাদের সবাইকে একটি বার্তা দিয়ে গেছে।  আর সেই বার্তা খুব সুখের নয়। অথচ সরকারের নীতিমালা অনুযায়ী কোন শিশুই বিদ্যালয়ের বাইরে থাকবে না। আর এটি শিক্ষক-অভিভাবকদের সাথে সমন্বয় করে নিশ্চিত করবে ম্যানেজিং কমিটি। অথচ সভাপতির পরিবারের সাথে পারিবারিক বিরোধের কারণে একটি শিশুর শিক্ষা জীবনই থেকে যেতে বসেছিল।

আমরা যদি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার দিকে তাকাই তবে গ্রামাঞ্চলের অধিকাংশ স্কুলেই স্বল্প শিক্ষিত বা অশিক্ষিত ব্যক্তিদের নিয়ে ম্যানেজিং কমিটি গঠনের অসংখ্য প্রমাণ আমরা পাই। ম্যানেজিং কমিটি সঠিক ও দিকনির্দেশনা মূলক পরামর্শ দিয়ে শিক্ষার মান উর্ধমুখির চেষ্টা করবেন এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে অংশ নেবে এটিই হওয়া বাঞ্চনীয়। কিন্তু সরকারের ম্যানেজিং কমিটি গঠনের নীতিমালায় কমিটির সদস্য হতে কতটুকু শিক্ষিত হতে হবে তা উল্লেখ নেই। এ সুযোগে গ্রামের প্রভাবশালী বা রাজনৈতিক দলের নেতারাই (যখন যে সরকার ক্ষমতায় থাকেন সেই সরকার দলের নেতারা) সম্মানের জন্য বাগিয়ে বসেন ম্যানেজিং কমিটির পদ-পদবী।

কোন কোন স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির দেখভালও দুরের কথা মাসিক সভায়ও সদস্যদের খুঁজে পাওয়া যায়। তবে কমিটির পদ-পদবী বাগিয়ে নিয়ে শিক্ষকদের উপর ছড়ি ঘুরাতে অনেকে সিদ্ধহস্ত। অনেক সময় নিজেদের পছন্দের মতামত শিক্ষকদের উপর জোড় করে চাপিয়ে দেন। এ অবস্থায় শিক্ষকরা ‘না পারি কইতে, না পারি সইতে’ অবস্থায় নিপতিত হন। ম্যানেজিং কমিটির বাহাদুরির! অসংখ্য অভিযোগের প্রেক্ষিতে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ এমপি মন্তব্য করেছিলেন, ‘মাতব্বরি করার জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কমিটি গঠন করা হয়নি’।

আমাদের সমাজের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটির সভাপতির পদ দখলের জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করে থাকেন। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় এমপি/মন্ত্রী মহোদয়কে ব্যবহার করা এখন স্বাভাবিক ও স্বতঃসিদ্ধ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও সভাপতি নির্বাচনের ক্ষমতা বিভিন্ন ক্যাটাগরি থেকে নির্বাচিত সদস্যের ওপর বর্তিত। তা সত্ত্বেও প্রায় সকল জনপ্রতিনিধিই এক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করে থাকেন। বিদ্যালয়ের সভাপতি নির্বাচনে স্থানীয় জনপ্রতিনিধির প্রভাব বা ডিও লেটার প্রদানের ঘটনা নতুন কিছু নয়। স্থানীয় জনপ্রতিনিধির আস্থাভাজন না হলে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সভাপতির পদ পাওয়া কঠিন ব্যাপার।

এক্ষেত্রে স্থানীয় এমপির মনোনীত ব্যক্তি – তিনি ব্যক্তিগত যোগ্যতায় যত নগণ্যই হোন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সভাপতির মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে তার নিয়োগ ঠেকানো কারও পক্ষেই সম্ভব হয়ে ওঠে না! বলা বাহুল্য, দেশের অধিকাংশ বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে একদল অশিক্ষিত কিংবা অর্ধ শিক্ষিত গোষ্ঠী দ্বারা যারা বর্তমান দাপুটে রাজনীতির বাহুবলে একেকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে রূপ দিয়ে যাচ্ছে! শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো যেন এখন আর শিক্ষা বিস্তারের বাতিঘর নয়, বরং কিছু নির্দিষ্ট মানুষের টাকা কামানোর আড়তদারি! দুঃখজনক হলেও সত্য, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমন হ-য-ব-র-ল অবস্থার পিছনে খোদ শিক্ষামন্ত্রণালয়ের নীতি নির্ধারকদের নীরব সমর্থন রয়েছে!

আর একটি কথা না বললেই নয়! কমিটির সব সদস্য যেমন তেমন, কিন্তু সভাপতির আসনটি যেন একটি লোভনীয় আসন। স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তি থেকে শুরু করে ওই আসনের সংসদ সদস্য পর্যন্ত এই পদের আশায় থাকেন। সংসদ সদস্য না হলেও তার দলের বা অনুসারীর কাউকে ওই পদে বসানো হয়। তবে এই ক্ষেত্রে স্থানীয় যেই নেতার পকেট ভরা টাকা থাকে তাকেই সাধারণত এই পদে বসানো হয়। তখন তার শিক্ষাগত যোগ্যতা কতটুকু তা ভেবেও দেখা হয় না। এ সভাপতিরা অনেক সময় তাদের পছন্দমতো বা কথামতো না চললে শিক্ষকদের অন্যায়ভাবে ছাঁটাই পর্যন্ত করে। বেসরকারি এসব স্কুলের সভাপতিদের স্বাক্ষর ছাড়া শিক্ষকদের বেতন হয় না। তাইতো সব শিক্ষকদের বাধ্য হয়েই তার কথামতো চলতে হয়।

মাদের সরকার দেশের শিক্ষার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে অনেক ভালো কথা বলছে। যুগোপযোগী শিক্ষানীতি চালু করেছে। আধুনিক ও প্রযুক্তি নির্ভর শিক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বড় বড় প্রকল্প হাতে নিচ্ছে। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষক-কর্মচারীদের আর্থিক সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি করেছে। এর সবই ইতিবাচক দিক। কিন্তু বর্তমানে প্রচলিত বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির একচ্ছত্র কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা বহাল রেখে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার উপযুক্ত পরিবেশ কখনোই নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। এজন্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কমিটির কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা কমানোর লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় আইনের সংস্কার ও সংশোধন আনতে হবে।

স্কুল ম্যানেজিং কমিটি নিয়ে কিছু অভিমত উপস্থাপন করলাম, আমাদের শিক্ষামন্ত্রী মহোদয় সমীপে; তিনি বিবেচনা করে দেখতে পারেন। প্রথমত, ম্যানেজিং কমিটির সভাপতিকে অবশ্যই দুরদৃষ্টি সম্পন্ন, কমপক্ষে স্নাতক পাশ এবং সমাজ সচেতন হতে হবে। সবচেয়ে ভালো হয় এলাকার সম্মানিত অবসর প্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হলে। দ্বিতীয়ত, ম্যানেজিং কমিটিতে যারা অন্তর্ভূক্ত হবেন তাদের হতে হবে সৎ, নির্ভিক ও সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য।

তৃতীয়ত, ম্যানেজিং কমিটির সদস্য যারা হবেন তারা যে কোন রাজনৈতিক দলের আদর্শের অনুসারী হতে পারেন তবে জনপ্রতিনিধি (সংসদ সদস্য, সিটি কর্পোরেশনের মেয়র, কাউন্সিলর, উপজেলা চেয়ারম্যান, উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যানদ্বয়, পৌর মেয়র, কাউন্সিলর, ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান, মেম্বার ইত্যাদি) ছাড়া কোন রাজনৈতিক দলের পদবীধারী কেউ ম্যানেজিং কমিটির সদস্য হতে পারবেন না। চতুর্থত, কোন মামলায় সাজাপ্রাপ্ত, মামলার চার্জশীটভূক্ত, মামলার এজহারভূক্ত কেউ ম্যানেজিং কমিটির সদস্য হতে পারবেন না। কেউ যদি সদস্য হিসেবে ইতোপূর্বে অন্তর্ভূক্ত হবার পর কোন মামলায় সাজাপ্রাপ্ত, মামলার চার্জশীটভূক্ত, মামলার এজহারভূক্ত হন তবে তাৎক্ষনিত তার পদ শুন্য ঘোষণা করতে হবে।

বর্তমান সরকার শিক্ষার সরকার। দেশের গন্ডি পেরিয়ে ছড়িয়ে পেড়েছে আর্ন্তজাতিকআর্ন্তজাতিক মহলে এ সরকারের শিক্ষা কার্যক্রমের গৃহীত পদক্ষেপ। দেশের শতকরা ৯৮% শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই বেসরকারি, কিন্ত বড়ই পরিতাপের বিষয় যে, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দেখাশুনার জন্য যে ম্যানেজিং কমিটি বাবা গর্ভনিং বডির অনুমোদন দেওয়া হয় তা কতটুকু গ্রহণ যোগ্য এবং  উন্নয়নমূখী একরাবরও কি ভেবে দেখা হয়। একজন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধান সর্বোচ্চ শিক্ষিত হয়ে এবং শিক্ষা মূলোক বিভিন্ন প্রশিক্ষন নিয়ে যোগ্য হয়ে দায়িত্ব পালন করে থাকেন, অথচ তাকে পরিচালনার জন্য যিনি সভাপতি থাকেন তিনি কোনও রকম যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা ব্যতীতই কমিটিতে বা গর্ভনিংবডিতে সভাপতি হয়ে এসেই শুরু করে থাকেন অমানবিক নির্যাতন ও দূব্যবহার।

এভাবে সারাদেশে অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান সভাপতি কর্তৃক নির্যাতন, অপমান ও লাঞ্চিত হয়ে থাকেন। আবার, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একজন ব্যক্তি ২ বারের বেশি সভাপতি থাকতে পারে না মর্মে পরিপত্র আছে অথচ এ ধরনের কোন পরিপত্র বেসরকারি  প্রতিষ্ঠানে জারি না থাকায় সমস্যা প্রকট আকার ধারন করেছ। এ পরিস্থিতি থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মঙ্গল ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধানকে স্বাধীন ভাবে তার দায়িত্ব পালনের সহায়তা প্রদনে সংশ্লিষ্টদের বিশেষ ভূমিকা পালনের অনুরোধ করছি। কেননা বর্তমানে চালু কমিটির ‘দাপুটে ক্ষমতা’ দিয়ে জাতিকে মান সম্পন্ন শিক্ষা দেয়া প্রায় অসম্ভব, এই বাস্তবতা শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে মানতে হবে। না হলে, উত্তম শিক্ষানীতিও উত্তম শিক্ষা ব্যবস্থার  গ্যারান্টি দিতে পারবে না।

লেখক-গবেষক , কবি ও কলাম লেখক।

একই ধরনের আরও সংবাদ