অধিকার ও সত্যের পথে

বই উৎসব এবং শিক্ষক আন্দোলন

 অলোক আচার্য্যঃ

বছরের শুরুতেই নতুন বই পৌছে গেছে দেশের প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সব ছাত্রছাত্রীর হাতে। একদিকে ছাত্রছাত্রীরা নতুন বই নিয়ে বাড়ি ফিরছে অন্যদিকে শিক্ষকরা মশার কামড় খেয়ে, পৌষের তীব্র শীতে দাবী আদায়ে আন্দোলন করলো। কয়েকদিন আগেই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা আন্দোলন করে গেছে। এখন নন এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির দাবিতে আন্দোলন হলো। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের দাবীতে শিক্ষকদের আন্দোলন হওয়ার কথা শুনেছি। বই উৎসবের দিনে এইসব শিক্ষকরা মানসিক প্রশান্তি নিয়ে তাদের ছাত্রছাত্রীর পাশে থাকলে বিষয়টি আরও সুন্দর হতো। কারণ এইসব ননএমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোন কোন শিক্ষক পনেরো বছর বা তার বেশি সময় ধরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রদত্ত বেতনে চাকরি করছেন। পরিবার পরিজন নিয়ে তারা একরকম দুঃসময় পার করছেন। তাদের এই আন্দোলন তাই অস্তিত্তের প্রশ্ন। কোটি কোটি ছাত্রছাত্রী একদিনে হাসিমুখ নিয়ে বাড়ি ফিরেছে। এর থেকে ভাল শুরু একটি দেশে আর কি হতে পারে। চমৎকার একটি উৎসবের মধ্যে দিয়ে গত কয়েক বছর ধরে আমাদের দেশে নতুন বছর শুরু হয়। এই আনন্দের কোন তুলনা করা যায় না। সন্তান যখন নতুন বই নিয়ে খুশি মনে বাড়ি ফেরে তখন সেই খুশি স্পর্শ করে তার অভিভাবককে। হাসি ফোটে তার মুখেও। বার্ষিক পরীক্ষার পর থেকেই দেশের কোটি কোটি কচি মুখ অপেক্ষা করে থাকে নতুন বইয়ের জন্য। কোন হতদরিদ্র পরিবারের শিশুর মুখে এই চিন্তা থাকে না যে বছরের শুরুতেই তাকে বই কিনতে হবে। অথবা তার অভিভাবকের মুখেও চিন্তার কোন ভাঁজ থাকে না যে সন্তানের নতুন বইয়ের যোগান সে কিভাবে দেবে। বিনামূল্যে বই প্রদানের এই সময়ের আগেও ছাত্রছাত্রীরা বছরের প্রথমে বই পেয়েছে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা নতুন নয় পুরাতন। গত বছরের উপরের ক্লাসের ব্যবহার করা কোন ছাত্রছাত্রীর বই। আমাদের সময়ের কথাই যদি বলি। এখনকার মতই বার্ষিক পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হতো। আর আমরা দুশ্চিন্তায় কাটাতাম যে নতুন বই পড়তে পারবো তো। কারণ ফল প্রকাশের পরপরই আশেপাশের বইয়ের দোকানগুলোতে বই কিনতে রীতিমত হুড়োহুড়ি পরে যেত। এখনকার ছাত্রছাত্রীদের কাছে বিষয়টা রীতিমত অবাক করার। একসময় এই ঘটনা কেবল গল্পের মত মনে হবে। যারা তুলনামূলকভাবে পয়সাওয়ালা তাদের সন্তানদের তেমন কোন সমস্যা হতো না। কিন্তু যাদের নতুন বই কেনার সামর্থ্য থাকতো না তারা পুরাতন বই দিয়েই বছর শুরু করতো। এমন হতো যে দুই তিনটি নতুন বই বহু কষ্টে কিনে দিতে পারলেও অধিকাংশ ছাত্রছাত্রীর প্রথম দুই তিন মাস সেই দুই তিনটি নতুন বই দিয়েই কেটে যেত। সবগুলো নতুন বই পেতে অনেকেই বছরের অর্ধেক সময় অপেক্ষা করেছে। আর কেবল বই কিনলেই চলতো না। বইয়ের থেকেও গাইড নোট কেনার দরকার বেশি ছিল! কারণ তখন তো এমন সৃজনশীল প্রশ্ন ছিল না। ছিল মুখস্থ ভিত্তিক প্রশ্ন পদ্ধতি। নোট থেকে গোটা কতক প্রশ্ন মুখস্থ করে নিলেই কাজ শেষ। তাই গাইড নোট কেনার দরকারও ছিল। একে নতুন বই তারপর আবার নোটবই কেনার প্রয়োজন। অভিভাবককে রীতিমত হিমশিম খেতে হতো। আমার মতো যাদের নতুন বই কেনার সামর্থ্য ছিল না তারা আশেপাশের উপর ক্লাসের বই মাস দুয়েক আগেই বলে কয়ে রাখতাম। এই পুরাতন বইও আবার নতুন বইয়ের এক তৃতীয়াংশ দাম দিয়ে কিনতে হতো। তবে পুরাতন হলেও আমাদের কাছে তা ছিল নতুন। আর সেই বইয়ের আকর্ষণ আজকের নতুন বইয়ের থেকে কম ছিল না। আজকের এই সময়ের সাথে সেসময়ের কত পার্থক্য। এদিক থেকে আজকে একটি শিশু আমদের থেকে অনেক সৌভাগ্যবান। প্রতি বছর অন্তত সে নতুন বই হাতে নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারে। তাকে সেই বই কেনার জন্য মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হয় না।
আমাদের দেশে এই শিক্ষকরাই সবথেকে অবহেলার শিকার এবং এখন বৈষম্যের শিকার। এই শিক্ষকদের আজ তীব্র শীতে আন্দোলন করতে হয়। যাদের হাত ধরে এই অর্জন তাদের এত আন্দোলন করে যৌক্তিক দাবী আদায় করতে হবে কেন? বর্তমানে দেশে সবচেয়ে বড় উৎসব এই বছরের প্রথম দিনের বই উৎসব। এই উৎসব যারা পালন করেন তারা শিক্ষক এবং শিক্ষাথী
শিক্ষক, শিক্ষা ও শিক্ষার্থী শব্দগুলো পারস্পরিক নির্ভরশীল ও একে অপরের সাথে ঘনিষ্টভাবে সম্পর্কযুক্ত। শিক্ষক বিহীন শিক্ষা যেমন কল্পনা করা যায় না তেমনি শিক্ষার্থীবিহীন শিক্ষাও অর্থহীন। এত বিশাল সংখ্যাক শিক্ষক আন্দোলন করছেন তাদের বাদ দিয়ে শিক্ষার উন্নয়ন চিন্তাও করা যায় না। শিক্ষক তার কাছে আসা শিক্ষার্থীদের জীবনে বেঁচে থাকার, জীবন যুদ্ধে জয়ী হবার মন্ত্র শিখিয়ে দেন। তিনি শিক্ষার্থীদের মনের আবেগ নিয়ন্ত্রনের দীক্ষা দেন। তিনি চান যেন তার শিক্ষার্থী জীবনের সব প্রতিকূলতা পেরিয়ে বিজয়ী হোক। আবার একজন শিক্ষককে বলা হয় আজীবন ছাত্র। জ্ঞান অšে¦ষণনে তার তৃষ্ণা অপরিসীম। নিজে না শিখলে অন্যকে কি শেখাবেন। তাই তো তাকে পড়তে হয়, জানতে হয় এবং জানাতে হয়। এই জানানোর কাজটি হচ্ছে শিক্ষকতার জীবনের সবথেকে পরিশ্রমী এবং কঠিন কাজ। কারণ তার জানানোর কাজটি সফল হয়েছে কি না তা বুঝতে পারাও একটি বড় দক্ষতার ব্যাপার। একজন শিক্ষক হচ্ছেন সেই ব্যাক্তি যার মধ্যে পরামর্শক হওয়ার, শিক্ষা সহায়ক ব্যাক্তি, শিক্ষক নিজেই শিক্ষা সহায়ক সামগ্রীর উন্নয়ন সাধন করবেন, তার আচরণ হবে রোল মডেল, তিনি সমাজের দর্পণ, কারিকুলাম প্রস্তুতকারক ও মূল্যায়ণকারণ, শিক্ষা সংগঠক এবং নির্দেশক ইত্যাদি গুণাবলী স¤পূর্ণ মানুষ। সত্যি কথা বলতে একদিক থেকে শিক্ষক একজন সত্যিকারের অতিমানব যাদের থাকে সহজেই আকৃষ্ট করার ক্ষমতা। আবার একদিক থেকে শিক্ষকরা খুব সাধারণ একজন মানুষ যারা তৈরি করেন অসাধারণ সব মানুষ। শিক্ষা কোন পেশা নয় বরং একটি সেবা। সমাজে অনেক সেবামূলক কাজ রয়েছে। এর মধ্য শিক্ষা অন্যতম। শিক্ষা হচ্ছে একটি ব্রত। যে ব্রত দিয়ে তিনি তার ছাত্রছাত্রীর মধ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটান। শিক্ষকের এই কাজটির সফলতা ও ব্যার্থতার মধ্যে রয়েছে দেশ ও জাতির ভবিষ্যত। এই অতিমানব শিক্ষক এত কাজ করার পরেও তাকে কেন আন্দোলনে যেতে হবে? আর একটু ভাল জীবন যাপনের আশা তো তারা করতেই পারে। শিক্ষকদের জন্য আলাদা বেতন স্কেল প্রণয়নের কথা দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা করা হলেও তা আজও কার্যকর হয়নি। যদি শিক্ষকদের দায়িত্ব অন্য সবার থেকে আলাদা হয়, কঠিন হয় তাহলে তাদের বেতন স্কেলও সতন্ত্র হওয়া প্রয়োজন বৈকি। এতে কারও দ্বিমত থাকার অবকাশ নেই। যারা বাইরে থেকে সমালোচনা করেন যে বই পড়ানো কাজটা বেশ সহজ তাদের বলি অনুগ্রহ করে এই কাজটা আপনি কওে সেটা সহজ প্রমাণ করেন। বছরের পর বছর পাস করিয়ে রেজাল্ট ভাল করাতে পারলেই কিন্তু শিক্ষকের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। বরং দায়িত্ব তো প্রতিটি শিক্ষার্থীর মধ্যে লুকিয়ে থাকা সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটানো। একজন শিক্ষকই যা আবিষ্কার করতে পারেন এবং তা ব্যাবহারে পথ দেখাতে পারেন। বাবা মা যেমন সন্তানের বুকের ভেতর বেঁচে থাকে ঠিক তেমনি করেই শিক্ষক বেঁচে থাকেন তার শিক্ষার্থীর মধ্যে। আমার অনেক শিক্ষক যেমন আজও বেঁচে আছেন আমার মধ্যে। শিক্ষকদের কাজ সন্তানকে মানুষ করা। তবে সেই কাজটি করতে তাদের নিজের দিকে তাকানোর অধিকার রয়েছে। তাদের ন্যায্য প্রাপ্যতা দাবী করার অধিকার রয়েছে।

লেখক-সাংবাদিক ও কলাম লেখক

একই ধরনের আরও সংবাদ