অধিকার ও সত্যের পথে

সন্তানের প্রথম শিক্ষক মা-বাবা আর বাড়ী হলো প্রথম স্কুল

 শেখ হাসনাত জামান শুভ্রঃ

কাদা মাটি আপনি যেভাবে চাইবেন সেইভাবেই আকার দিতে পারবেন। সেটা আপনার উপর নির্ভর করছে আপনি সেই মাটির কাদাটাকে কেমন আকার দেবেন। সুন্দর কোনো কিছু বানালে সেইটা দেখতে ভালো লাগবে, ভয়ংকর নোংরা কিছু বানালে পরিণামে দেখতে বাজে লাগবে।

আর যদি কিছুই না বানিয়ে ফেলে রাখেন তবে ওই দলা গোটা হয়েই পড়ে শক্ত হয়ে যাবে কোনো আকার ছাড়া। মাঝে মাঝে সেই মাটি শুকিয়ে গেলে গুড়ো গুড়ো দানাও হয়ে যেতে দেখা যায় যদিনা সেটা দিয়ে ভালো শক্তপোক্ত আকার দেয়া হয়। আর একবার ভালো শক্তপোক্ত কিছু না বানাতে পারলে সেই মাটি শক্ত হলে আর কিছুই বানানো সম্ভব নয়।

এখন আসি আসল কথায়।  কাদা মাটির কারুশিল্প শেখানোর কোনো ইচ্ছে আমার নেই, তবে এটার সাথে মিল রয়েছে একটা বিষয়ে আলোকপাত করি লক্ষ্যকরুন। আপনার বাচ্চা সেও কিন্তু কাদামাটির মতোই। বাচ্চা থাকা কালেই তাকে গড়ে তুলুন সুন্দর করে, সঠিক শিক্ষা দিয়ে এবং নির্দিষ্ট লক্ষ্যে নিয়োজিত করে। তাকে গড়ে তুলুন শক্তপোক্ত শিক্ষার আলোকে যাতে সে কখোনোই গুড়িয়ে না যায়। কারন কাদামাটি যখন শক্ত হয় তখন তা নিয়ে যেমন কিছুই বানানো যায় না, ঠিক তেমনি আপনার বাচ্চাকে সঠিভাবে গড়ে তোলা না হলে সে বড় হলে তার ভেতরে নতুন করে পরিবর্তন আনাটা খুবই কষ্টদায়ক হবে।

পরিবেশের কারনে তার অভ্যাস হয়তো পরিবর্তন হবে কিন্তু যেই শিক্ষা পেয়ে সে বাচ্চা থেকে বড় হয়েছে, তার জেনেটিক স্ট্রাকচারে যে কোডিং হয়েছে অবচেতন মনে তা কখোনোই বদলানো সম্ভব নয়। বলা হয়ে থাকে শিশু অবস্থায় শেখানো প্রতিটা বিষয় আমরণ বদ্ধমূল হয়ে থাকে ব্যাক্তির জীবনে। যতোই নতুন ধ্যান ধারনায় অভস্ত হোক না কেনো ব্যাক্তি তার গোড়া কখোনোই ভুলে যায় না।  লন্ডনের ইন্সটিটিউট অব এডুকেশনের ডিপার্টমেন্ট অব চাইল্ড ডেভলপমেন্ট কতৃক করা একটা গবেষনায় বাচ্চার পারিবারিক এবং প্রাথমিক স্কুল শিক্ষার ব্যাপারে এমন অনেক কথা বলা হয়েছে।

সাইকোলজিস্ট পিয়েগেট এর করা রিসার্চ অনুসারে বলা যায়, একটা বাচ্চার বুদ্ধির বিকাশ কয়েকটা স্টেপে হয়ে থাকে। বয়স ০ থেকে ২ থাকা কালে বাচ্চারা শুধু ঘটনা ঘটার প্রেক্ষিতে একশন নিয়ে থাকে এবং তখনও সেভাবে চিন্তা ভাবনা করার ক্ষমতা তাদের গড়ে ওঠে না। তাই এই সময়ে তার সাথে যা ঘটবে তাতে সে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া করবে। এসময় হওয়া কোনো নেতিবাচক ঘটনা তাদের মস্তিষ্কে তাৎক্ষনিক প্রতিক্রিয়া করবে এবং সেটা থেকে অনেক বড় ক্ষতিও হতে পারে।

তাই এই সময়টায় বাচ্চার সাথে তার বাবা মা দুজনের সবথেকে বেশি সময় এটাচমেন্টটা খুবই জরুরী। এ সময় বাবা মার অনুপস্থিতি তাকে অনেক জরুরী বিষয় থেকেই বঞ্চিত করবে যা তার বুদ্ধির বিকাশের পথে প্রথম বাধা হয়ে দাড়াবে। এবং পরবর্তী বয়সে এটার ছাপ থেকেই সে চিন্তা করা শুরু করবে, তার চিন্তা ধারা শুরু এই বয়সে না হলেও এবয়সের প্রভাব থাকবেই।

বয়স ২-৬, এই সময়টায় বাচ্চাদের ভাষার জ্ঞান যতেষ্ট উন্নত হয় এবং তারা পূর্ববর্তী ঘটনা থেকে ধারনা নিয়ে মনে রাখা এবং সেটা থেকে ভবিষ্যৎ চিন্তা ধারায় প্রতিফলন করা শিখতে থাকে। এই সময় তারা ভালো মন্দের বিচার করা শিখতে জানেনা, চিন্তা করার শুরুটা এই সময়ে হলেও চিন্তার দক্ষতা তখন শূন্যের পর্যায়েই থাকে। আর সেই কারনেই এই সময়টায় তারা বাবা মা এবং ঘরের লোকদের চিন্তা ধারা দ্বারা মোটিভেট হতে থাকে। তারা নিজের চিন্তা ভাবনা সাজানো শুরু করে তার আশেপাশ থেকে তথা বাবা মা থেকে। তাই বাবা মা যেভাবে তাদের জীবণধারায় অভ্যস্ত থাকবেন, তেমনভাবেই বাচ্চারা শিখতে থাকবে এবং চিন্তা করার ধরন তেমনই হতে থাকবে।

৬ বছর বা এর পর থেকে বাচ্চা গাণিতিক ধারনা পাওয়ার মাধ্যমে মস্তিষ্ককে ব্যবহার করার আরেক ধাপে উর্ত্তীর্ন হয়। তখন সে কিছুটা ভালো মন্দ বোঝা শুরু করে, কিন্তু সেই ভালো মন্দ বোঝার ধারাটা ঠিক ৬ বছরের আগের সিস্টেমে হতে থাকে। অর্থাৎ তখন যদি সে দেখে যে তার মা বাবা সারাক্ষন ঝগড়া তর্ক নিয়ে ব্যস্ত থাকে। বাবা দেরী করে বাসায় ফেরে, মা পরনিন্দা করে ইত্যাদি ইত্যাদি, তবে সে বুঝতে শিখবে যে এগুলোই ভালো কাজ। এবং ৬ বয়সের পরে এসে ওই ভালো (!) কাজ থেকেই সে অন্য ভালো কাজের গণনা করতে শিখবে। তার কাছে মন্দ কাজগুলোই ভালো কাজে পরিনত হতে থাকবে।

এভাবে ৯ বছর পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষার ভেতরে তার পদার্পন হবে এবং তার পরিমন্ডল আরো বিস্তৃত হবে। এই সময়গুলো বাচ্চার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ন। আপনার বাচ্চা কেমন হবে তা আপনার হাতেই রয়েছে। সুতরাং সেই ধারাতেই বাচ্চাকে লালন পালন করা উচিত যেভাবে আমরা তাদেরকে দেখতে চাই। কারন সময় গেলা যেমন সাধন হয় না, ঠিক তেমনি কাদা মাটি শক্ত দানায় পরিনত হলে তা দিয়ে নতুন কিছু তৈরী করা যায় না।

বর্তমান সময়ের বাচ্চাদের আগের তুলনায় অনেক বেশি আপডেট এবং বুদ্ধিমান ধরা হচ্ছে। কিছু সাথে এটাও মাথায় রাখতে হবে তারা নৈতিক দিক থেকে কী শিখছে। শহরের অনেক বাচ্চাই আছে যারা তার বাবা কে শুধু শুক্রবারে কিংবা বন্ধের দিন দেখতে পায়। হাতে ল্যাপটপ ট্যাব এবং মুখে ইংরেজী ভাষার ছড়া থাকলেও সে বড় হচ্ছে এমন একটা দুনিয়ায় যেখানে তার মা সারাদিন টিভি সিরিয়ালে ব্যস্ত এবং সেই টিভি সিরিয়ালগুলোতে প্রতিনিয়তই দেখানো হচ্ছে হিংসা পরনিন্দা ঝগড়া।

প্রফেসর ক্যাথি সিলভা (London WCTH 0AL,UK) এর ধারনা মতে বাচ্চাদের ভেতরে ইগো, সেলফিসিন্ড্রো বা আত্মকেন্দ্রীকতা নার্সিসিজম ইত্যাদি গড়ে উঠতে থাকে ৬ বছর বয়স থেকে। সুতরাং এই সময়টায় আপনার ব্যক্তিগত আচরন দৃষ্টিভঙ্গী আপনার বাচ্চাকে তো প্রভাবিত করবেই। প্রায়শই দেখা যায় ৯ বছরের বাচ্চারা তার স্কুলে গিয়ে বন্ধুদের সাথে নিজেদের বাবার গাড়ি দামী, বাড়ি বড়ো ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করে। এই ইগোসেন্ট্রিক ধারনাগুলো কিন্তু গৃহ থেকেই বাচ্চারা শেখে। হয়তো সে কখোনো তার বাবা মা কে আলোচনা করতে দেখেছে এই ব্যপারে! বাসায় আপনি কাজের লোকদের খারাপ আচরন করেন দেখে সে তার স্কুলে একটু নিম্নবৃত্ত ছাত্রদের হেয় চোখে দেখে, কারন সে গৃহ থেকে শিখেছে খই বিষয়টা। যারা গরীব তাদের হেয় চোখে দেখা এই ধারনা নিজের ঘর এবং বাবা মা থেকেই শেখে বাচ্চারা।

লেখক- শিক্ষার্থী ,শহীদ সোহ্‌রাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ বাংলাদেশের, ঢাকা ।

একই ধরনের আরও সংবাদ