অধিকার ও সত্যের পথে

শিক্ষার “বেসরকারিকরণ” এবং মেরুদন্ডের “প্রাইভেটাইজেশন”

 ড. গোলাম রব্বানীঃ

মেডিকেল সাইন্সে Backbone এর তত্ব এবং তাত্বিক ব্যাপক বিশ্লেষণ রয়েছে যেহেতু প্রতিটি প্রাণীরই শারীরিক অস্তিত্বের মূলে রয়েছে এই মেরুদন্ড। অধুনাযুগে উন্নত চিকিৎসা বিজ্ঞানের বদৌলতে মেরুদন্ডের স্থানান্তর বা শরীরে কৃত্রিম মেরুদন্ড স্থাপনের কৌশল চালু হয়েছে যা বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব সাফল্য। আবার মেরুদন্ডে রোগাক্রান্ত প্রাণীর পক্ষে পীঠ সোজা করে দাঁড়ানোও কষ্টকর।

মানব শরীরের জন্য মেরুদন্ড যেমন একটি অপরিহার্য অঙ্গ অনুরূপভাবে শিক্ষাকে ‘জাতির মেরুদন্ড’ হিসেবে চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে সন্দেহাতীতভাবে শিক্ষার অপরিহার্যতা একটি জাতির অস্তিত্বের সাথে সম্পর্ক যুক্ত। শিক্ষার্থীদের মেধাশক্তির সঠিক মান এবং তাদেরকে যোগ্য সম্পন্ন মানব সম্পদের পরিণত করার স্বার্থে শিক্ষা বিনিয়োগে ব্যাপক অনুদানের প্রশ্নটিও অনস্বীকার্য। কেননা মেধা বুদ্ধি বৃদ্ধির “কার্যকরি তরীকা” অর্থাৎ ভাল পড়ালেখার মাধ্যমে আগামী প্রজন্মের জন্য শিক্ষা নামক মেরুদন্ডকে যোগ্যতম পর্যায়ে উপস্থাপন করতে না পারলে পৃথিবীর উন্নত রাষ্ট্রসমূহের সঙ্গে পাল্লা দেবার প্রতিযোগিতায় আমরা টিকতে পারবো না তা বলাই বাহুল্য।

“একজনের অজ্ঞতা আর একজনের ব্যবসা” ইংরেজিতে যাকে বলা যায় One’s ignorance is others’ business  সত্যটি আমাদের বেলায় প্রযোজ্য হোক তা আমাদের প্রত্যাশিত নয়।

তাই উপযুক্ত এবং কার্যকরী শিক্ষার মাধ্যমে ‘মেধা’ নামক জাতির শ্রেষ্ঠ এবং আসল সম্পদের সঠিক এবং সুদক্ষ ব্যবহার ঘটাতে পারলে একদিকে আমরা যেমন নানান কিচিমের রাষ্ট্রদ্রোহী কাজে লিপ্ত Evil genius অর্থাৎ তথাকথিত “হ্যাকারদের” হাত থেকে আমাদের কষ্টার্জিত অর্থসম্পদ চুরি থেকে যেমনিভাবে বাংলাদেশকে বাচাঁতে পারবো তেমনিভাবে প্রযুক্তি শিক্ষা, বিজ্ঞান এবং মেধা উন্নয়ন ও তার সর্বোত্তম ব্যবহারের মাধ্যমে দেশের প্রাকৃতিক, খনিজ সম্পদ উত্তোলনে এবং ব্যবহারে আমাদের প্রজন্ম হবে জাতির Think tank তাদের উদ্ভাবিত যন্ত্রপাতি এবং প্রযুক্তি নির্ভর মেধাই হবে সর্বোত্তম বিনিয়োগ প্রকল্প। যে সমস্ত রাষ্ট্র আমাদের উপর অহেতুক প্রাধান্য বিস্তার করতে চায় তাদের অনাবশ্যক প্রাধান্য বিস্তারের অপচেষ্টা রুখতে আমাদের উৎকৃষ্ট জবাব দেবার প্রধান অস্ত্রই হবে একমাত্র শিক্ষা।

কেবল শিক্ষার মাধ্যমে আমাদের প্রজন্মকে শিক্ষামূখী করা মাধ্যমে তাদের মেরুদন্ড সোজা করার জ্ঞান,বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, শিক্ষা এবং দীক্ষা দান করা রাষ্ট্রের জন্য জরুরী। যাতে করে তাদেরকে শিক্ষামূখী করার মাধ্যমে আগামী দিনের চাহিদায় তাদেরকে সুষ্ঠ মানব সম্পদের পরিণত করা যায় অর্থাৎ উন্নয়নের নিয়ামক হিসেবে আমাদের প্রজন্মের পর প্রজন্মকে আগামী দিনে দেশে বিদেশে যোগ্য এবং গ্রহনীয় প্রমান করা ।

তাই দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাপনা, যেকোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উপযুক্ত এবং মেধাবী শিক্ষক নিয়োগ দান যেমন জরুরি সেই সাথে প্রতি দিনই যেভাবে শিক্ষার্থী সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে তার চাহিদা মাফিক পর্যাপ্ত শিক্ষক বাছাই এবং নিয়োগ পিএসসির মাধ্যমে চুড়ান্ত নিয়োগ দানের বিষটিকেও কোনক্রমেই সরকারের দৃষ্টির আড়াল করার সুযোগ নেই তা শিক্ষার নামে বা শিক্ষাদানের নামে যেকোন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক নিয়োগদানে ক্ষেত্রে হোক না কেন। পৃথিবীতে অনেক রাষ্ট্র ও জাতি আছে যেখানে না আছে তাদের অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, না আছে ব্যাপক প্রশিক্ষিত পুলিশ বা সামরিক বাহিনী কিন্তু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিহীন, শিক্ষক বিহীন বা শিক্ষার্থী বিহীন কোন জাতি বা রাষ্ট্রের অস্তিত্ব নেই।

তেমনি শিক্ষাকে অবহেলা করা মানে জাতির মেধার কার্যকারীতার অভাবকেই বিস্তৃত করা। কোন কোন প্রাইভেট বা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়,কলেজ,স্কুল ইতোমধ্যে তাদের নিষ্ঠার মাধ্যমে সাফল্যের দ্বারে পৌঁছেছে যেমন ঢাকা শহরের তেজগাঁ এলাকায় নিজস্ব ক্যাম্পাসে স্বনাম খ্যাত ‘আহছান উল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়’, ‘ইষ্ট ওয়েষ্ট ইউনিভার্সিটি’ বা ‘ব্রাক বিশ্ববিদ্যালয়’ এর নাম উল্লেখ করা যায়।

কিন্তু এধরণের ব্যতিক্রমিদের এখানে আলোচনার উদ্দেশ্য নয়। পেশা হিসেবে ব্যবসা বাণিজ্যের উদ্দেশ্য মূল চালিকা শক্তি মূলধন বিনিয়োগের মাধ্যমে আর্থিক লাভ অর্জন করা। কিন্তু শিক্ষার পেশা বা শিক্ষকতা পেশার মূল চালিকাশক্তি হিসেবে পরিচিত শিক্ষকদের মেধাশক্তি। তাই শিক্ষাকে বা শিক্ষকতা পেশাকে ব্যবসায়িক লাভালাভের উপকরণ করা যায় না।

যেহেতু ব্যবসা বাণিজ্যে আর্থিক লাভালাভের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু শিক্ষকতায় তা গ্রহনযোগ্য নয় কেননা এটি একটি Profit oriented শিক্ষাকে যেভাবেই সঙ্গায়িত করি না কেন তার উদ্দেশ্য হচ্ছে জাতির মেধা উন্নয়ন এবং জাতির মানব সম্পদ ধারী প্রতিটি নাগরিককে যোগ্য করে গড়ে তোলা। একটি জাতির মেধা শক্তি সে জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ মানব সম্পদ এ বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই । অন্য কথায় একজন মানুষের মেধাই তার উপর সৃষ্টিকর্তার সর্বশ্রেষ্ঠ দান।

একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য শিক্ষা নামক জাতির মেরুদন্ডের প্রাইভেটাইজেশন’ বা বেসরকারিকরন যখন বলগাহীন ভাবে চলে তখন জাতির জন্য ‘মেরুদন্ডহীন বা পরনির্ভরশীল প্রজন্মের’ সৃষ্টি হবে এটাই স্বাভাবিক। শিক্ষার বেসরকারিকরন স্বদেশী ইতিহাস, ঐতিহ্য, ভাষা, সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের অপূর্ণাঙ্গ শিক্ষার বিস্তার ঘটাতে সহায়তা করে এবং এক্ষেত্রে ধর্মান্ধ বা ধর্মীয় সংকীর্ণতার সীমায় আমাদের প্রজন্ম জড়িত হওয়ায় অবকাশ থাকে তা উড়িয়ে দেয়া যায় না এবং শিক্ষা নামক জাতির মেরুদন্ডের এখন এটাই সবচেয়ে বড় ‘ব্যামো’। যেমনিভাবে দেশের প্রতিরক্ষা বা সামরিক বাহিনীকে তথাকথিত প্রাইভেট কোম্পানীর হাতে ছেড়ে দেওয়া যায় না বা ‘বেসরকারিকরন’ করা যায় না তেমনিভাবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তথা শিক্ষাকে অথবা ‘শিক্ষার নীতিমালা’ শিক্ষা নামক ‘মেরুদন্ডের বেসরকারিকরন’ বান্ধব করা যুক্তিসঙ্গত নয় কেননা অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা শিক্ষার মৌলিক উদ্দেশ্যের ভিতকে দুর্বল করে ।

শিক্ষা সেবার নামে যত্রতত্র অপূর্ণাঙ্গ এবং অপরিকল্পিত নানা পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চালু করার সংস্কৃতি শিক্ষার সুফল ভোগের অন্তরায়।যত্রতত্র ইচ্ছে মাফিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শুরু করা প্রকারন্তরে মেধা সম্পদের অপব্যবহারকে উৎসাহিত করে এজন্যই বর্তমান এবং অনাগত প্রজন্মের জন্য শিক্ষাকে দুর্বল মেরুদন্ড প্রবণ ‘প্রাইভেটাইজেশন’ বা বেসরকারিকরনের কবল থেকে দূরে রাখার কোন বিকল্প নেই ।

জাতির শিক্ষা সংস্কৃতির বিষয়টি কোন আর্থিক লাভালাভ বা ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান নয় বা শিক্ষা কোন ব্যবসায়িক  Money Monger  প্রকল্পের ব্যবস্থাপনা নয় নয় বা কোন ‘বাণিজ্যিক পণ্য’ নয় বলেই এ জাতীয় ‘প্রাইভেটাইজেশন’ একটি আত্মনির্ভরশীল জাতির মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয় বিশেষ করে শিক্ষার ক্ষেত্রে । জাতির মৌলিক বিষয় যখন তথাকথিত ‘প্রাইভেট কোম্পানী’ ‘প্রতিষ্ঠান’-এর বা শ্রেফ ব্যক্তিনির্ভর বা সরকারের সরাসরি নিয়ন্ত্রণহীন কর্তৃপক্ষের অধীনে চলে তবে সেখানে তাদের ব্যক্তিগত ইচ্ছা অনিচ্ছার দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হওয়ার সুযোগ থাকে যা সেই ব্যবস্থায় শিক্ষার সার্বজনিন ক্ষতি ডেকে আনতে পারে ।

‘শিক্ষার প্রাইভেটাইজেশনে’র নেতিবাচক ফলশ্রƒতি ইতোমধ্যে তথাকথিত ডে-কেয়ার সেন্টার, প্লে-নার্সারী,স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে লক্ষ্য করা গেছে যা হতাশা জনক। দেশের গুটিকয়েক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম আন্তর্জাতিকভাবে মূল্যায়িত হয়েছে তা ব্যতিক্রমই বলা যাবে।

তবে দু’একটি প্রাইভেট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এধরণের ব্যতিক্রম আনুপাতিক দৃষ্টিতে নগণ্য এবং এধরণের ‘দুর্লভ ব্যতিক্রমিতা’র দু’একটি দৃষ্টান্ত কোন সার্বজনিন গ্রহনযোগ্যতা পাবার অধিকার রাখে না।

দুঃখের সাথে লক্ষ্যনীয় যে অধিকাংশ প্রাইভেট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মূলতঃ ‘আর্থিক লাভ’ অর্জনে নিবেদিত এবং নিয়োজিত থাকায় তাদের তথাকথিত ‘শিক্ষা সেবা! বা বিদ্যোৎসাহী মনোবৃত্তি (!) প্রতিমূহুর্তে জাতির সামনে প্রশ্নবিদ্ধ থেকে যায় এবং তারা গড়হবু গড়হমবৎ নামক দৈত্য দ্বারা যে পরাভূত তা আর বাড়িয়ে বলার প্রয়োজন নেই ।

পৃথিবীর কোন উন্নত রাষ্ট্রই শিক্ষায় ‘প্রাইভেটাইজেশন’ বা ‘বেসরকারিকরন’কে উৎসাহিত করে না। যে কারনেই সেখানে তাদের শিক্ষার বিষয়টি তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মতো সরাসরি তাদের রাষ্ট্রের সরকার কর্তৃক প্রত্যক্ষ ব্যবস্থাপনায় নির্দিষ্ট বিভাগ/মন্ত্রণালয় দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়।

Public University যেমন Public interest কে প্রাধান্য দেয়া হয় অর্থাৎ সেখানে সার্বজনীনতা বা সার্বজনিন সুযোগের সমতা একটি মৌলিক নীতিমালা হিসেবে কাজ করে; অন্যদিকে প্রাইভেট ইউনিভারসিটি স্কুল বা মাদ্রাসা, কলেজে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানে Private interest বা Individual interest  কে প্রাধান্য দেয়া হয়।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইতোমধ্যে শিল্পপতি এবং ধনবান ব্যক্তিদের জাতির শিক্ষা উন্নয়নে অবদান রাখার আহবান জানিয়েছেন তা অবশ্যই আশাব্যঞ্জক। এক্ষেত্রে অবশ্যই প্রশাসনিক এবং একাডেমিক বিষয় সহ সার্বিক তত্তাবধানে সরকারের ‘শিক্ষা মন্ত্রণালয়’, ‘বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন’ সহ সংশ্লিষ্ট সরকারী বিভাগের প্রত্যক্ষ সংশ্লিষ্টতা অপরিহার্য।

জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে শিক্ষার্থীদের সংখ্যা দিনে দিনে বেড়েই চলেছে। কিন্তু শিক্ষার্থীদের ক্রমবর্ধমান সংখ্যা গাণিত্যিক হারে বৃদ্ধির অনুপাতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বৃদ্ধি করার লক্ষে ব্যাপকতর শিক্ষা বিনিয়োগ বৃদ্ধির আর কোনই বিকল্প নেই।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও প্রযুক্তি উপদেষ্টা সম্মানিত সজিব ওয়াজেদ জয় প্রতিটি জেলায় একটি করে সরকারী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়ে তরুণ শিক্ষার্থী প্রজন্মের মধ্যে ব্যাপক সম্ভাবনার আলো ছড়িয়ে দিয়েছেন যা বর্তমান এবং আগামী প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের দেশপ্রেমে উদ্ভুদ্ধ যোগ্য নাগরিক গড়ে তোলার ‘যোগ্য প্লাটফর্ম’ হিসেবে কাজ করবে এবং নিঃসন্দেহে এ ঘোষণা বাস্তবায়ন হলে আমাদের প্রজন্ম শিক্ষামূখী হবে ফলে তারা প্রতিনিয়ত তাদের মেধা নির্ভর যোগ্যতা বৃদ্ধিকল্পে এবং নিজেদেরকে যোগ্য করতে ব্যতিব্যস্ত থাকবে। ফলশ্রুতি স্বরুপ আমাদের শিক্ষামূখী প্রজন্ম তথাকথিত জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস, মাদকাশক্তি বা মূল্যবোধ অবক্ষয়ের পথে ধাবিত হওয়ার সুযোগ পাবেনা।

শিক্ষানুরাগী শিল্পপতি বা সম্পদশালী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ক্রমবর্ধমান শিক্ষার্থীদের চাহিদা মেটাতে তাদের নিজস্ব এলাকায় স্থাবর সম্পত্তি, দাতাদের নামে ভবন নির্মাণ, শিক্ষার্থীদের জন্য হোস্টেল বা শিক্ষকদের আবাসন বা মেধাবী শিক্ষার্থীদের নিয়মিত আর্থিক অনুদানের মাধ্যমে জাতির মেধা সম্পদের সর্বাধিক সুফল ভোগের পথ করে দিতে পারেন যা তাদের জ্ঞানসেবা হিসাবে জাতি চিরদিন স্মরণে রাখবে।

‘শিক্ষার প্রাইভেটাইজেশন’ বা বেসরকারিকরন রোধে এবং শিক্ষা উন্নয়নে সরকার বাহাদুর নিম্নোক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেন।

(১) যে পদ্ধতি এবং নীতিমালায় সরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রাইমারী থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সকল হাই স্কুল, মাদ্রাসায় শিক্ষক নিয়োগ দান করা হয় ঠিক একই পদ্ধতিতে উম্মুক্ত বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে প্রতিযোগীতা মূলক পরীক্ষার মাধ্যমে ইতোমধ্যে অনুমোদিত সকল প্রাইভেট স্কুল,কলেজ,মাদ্রাসা,বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগ দান করা জরুরি এক্ষেত্রে পি.এস.সি. এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন সহ শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক নিযুক্ত নির্দিষ্ট কমিটি বা কমিশন কাজ করতে পারে। অধিকাংশ প্রাইভেট ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে নবম-দশম শ্রেণী/ও লেভেল অথবা এ লেভেলে শিক্ষা দানের মত প্রয়োজনীয় উপযুক্ত দক্ষ শিক্ষক নেই বল্লেই চলে যার কারণেই শিক্ষার্থীদের তাদের স্কুলের বাহিরে ‘নিয়মিত তথাকথিত কোচিং সেন্টারে’র উপর নির্ভর করতে হয়।

যার মূল কারণ হচ্ছে সিলেবাসের মান এবং ‘শিক্ষার্থীদের চাহিদা’ মোতাবেক উপযুক্ত দক্ষ শিক্ষক সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে অত্যন্ত নগন্য। অধিকাংশ প্রাইভেট কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে শিক্ষার্থীদের সংখ্যা অনুপাতে প্রয়োজনীয় স্থায়ী উপযুক্ত শিক্ষক নেই।

(২) প্রাইভেট স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় অথবা মাদ্রাসা, ইংলিশ মিডিয়াম অথবা ইংলিশ ভার্সন স্কুল সমূহে একধরণের ‘ঢাক ঢাক গুড় গুড়’ নীতি অথবা রুদ্ধদার পরিবেশ বিরাজ করে যেখানে সচেতন অভিভাবক মহলসহ সংবাদ বা গণমাধ্যমের প্রবেশাধিকার সীমায়িত। কিন্তু এ বিষয়টি যে শিক্ষার্থীদের তথা শিক্ষার উন্নয়নে একধরণের ‘গুমোর’ তা বিদ্যানুরাগী এবং সচেতন মহলের দৃষ্টি এড়িয়ে যাবার সুযোগ নেই।

(৩) ইতোমধ্যে ঢাকা শহর সহ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের বেশ কিছু বেসরকারি স্কুল, কলেজ , বিশ্ববিদ্যালয় তাদের সুনাম রক্ষা করে চলেছে এক্ষেত্রে তারা প্রশংসার দাবী রাখে। তবে দেশের ক্রমবর্ধমান শিক্ষার্থীদের চাহিদার তুলনায় তা কম হওয়ায় নতুন করে সরকারি, স্কুল, মাদ্রাসা, কলেজ, বা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন সরকারের ভাবমূর্তিকে আরো উজ্বল করবে।

থানা বা উপজেলা পর্যায় থেকে শুরু করে মফস্বল জেলা শহরে যেকোন ধরণের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করার পূর্বে উক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পূর্ব শর্ত হিসেবে অবশ্যই ‘অকাঠামোগত’ সুযোগ সুবিধার বিষয়টি সুনির্দিষ্টভাবে সরকারের নিয়ন্ত্রণে পর্যবেক্ষণ হওয়া উচিত। যেকোন ধরণের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তা মাদ্রাসাই হোক, স্কুল কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় হোক না কেন কেননা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যে কোন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নয় তা দেশের প্রতিটি নাগরিক, ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানসহ সরকারকে অনুধাবন করতে হবে।

মস্তিস্ক নষ্ট হলে মানব শরীরের অন্যান্য অঙ্গ প্রত্যঙ্গ যত সুন্দর বা শক্তিশালী হোক না কেন মানব জীবনে তার কোন গ্রহণযোগ্যতা নেই। অনুরূপভাবে জাতির ‘মস্তিস্ক’ হচ্ছে সে জাতির মেধা সম্পদ এবং এ বৃহত্তর প্রজন্মের মেধা সম্পদ এর সর্বত্তোম কার্যকরী ব্যবহারের বা ব্যবপস্থাপনার আর এক নাম শিক্ষা এবং সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তথা শিক্ষাদানে নিয়োজিত সকল শিক্ষক সম্প্রদায়,সকল শিক্ষার্থী এবং শিক্ষাব্যবস্থাপনায় জড়িত কর্মকর্তা কর্মচারীবৃন্দ শিক্ষার সেবক। কিন্তু শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড হলে সেই ‘শিক্ষার’ মেরুদন্ড হবে জাতির উক্ত ‘শিক্ষক’ সম্প্রদায় তাই প্রাথমিক শিক্ষা থেকে তা নার্সারি, প্লে-গ্রুপ, মক্তব, মাদ্রাসা থেকে শুরু করে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষাদানে জাতির মেধাবী শিক্ষকদের নিয়োগ দানের কোন বিকল্প নেই। মেধাবী উপযুক্ত শিক্ষক ছাড়া একটি জাতির মেধাবী প্রজন্ম গঠিত হওয়ার আশা কষ্ট কল্পনা ।

আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত, পাকিস্তানকে ছাড়িয়ে পৃথিবীর যেকোন উন্নত দেশের কাতারে দাঁড়াতে আমাদের আগামী প্রজন্মের জন্য সত্যিকার অর্থেই ব্যাপক শিক্ষা বিনিয়োগের কোন বিকল্প নেই এবং এর জন্য মেধাবী যোগ্য প্রজন্মকে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োগ দানে সরকারের বিন্দুমাত্র হেলা করার সুযোগও নেই। কেননা মেধাবী উপযুক্ত শিক্ষক সম্প্রদায়ই পারেন জাতির মেধা, বুদ্ধি, মনন, সৃজনশীলতা, মূল্যবোধ এবং সৃষ্টিশীল সম্ভাবনাময় মেধাবী প্রজন্মের মেধান্নয়নে যুক্ত থেকে জাতিকে বিশ্ব দরবারে পরিচিত করাতে।

মেধায়, যোগ্যতায় এবং সৃজশীলতায় মাথা উঁচু করে চলার মূল্যেবোধ এবং কাঙ্খিত যোগ্যতায় চলার কৌশল শেখান এ শিক্ষক সমাজ যাদেরকে ‘জাতির মস্তিষ্ক’ বলা যায়। যেভাবে ভাল ফলাফলের অধিকারী সর্বোচ্চ মেধাবীরা রাষ্ট্রীয় অন্যান্য পেশা যেমন পররাষ্ট্র, প্রশাসন,কাষ্টম, পুলিশ বা সামরিক বাহিনীতে যোগদানে উৎসাহিত হয়ে থাকেন তারা যাতে একইভাবে একই উৎসাহ উদ্যমে ‘শিক্ষকতা’ পেশায় আকর্ষিত হন এজন্য প্রথমে প্রয়োজন এই পেশার শ্রীবৃদ্ধিতে আকর্ষণীয় বেতনাদি নির্ধারণসহ সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি করা।

প্রতিটি বিষয়ের ভাল শিক্ষক নির্বাচনে শ্রেনীকক্ষের ভাল ছাত্রদের মতামত নেয়ার ভিত্তিতে শ্রেষ্ঠ শিক্ষকদের সম্মাননা পুরষ্কারসহ আর্থিক অনুদান প্রদান ভাল শিক্ষকদের উৎসাহিত করার একটি বিশেষ উপায়। তেমনিভাবে সঠিক সময়ে শিক্ষকদের পদোন্নতির সমাধানের বিষয়টিও অতিব জরুরি তাই পদোন্নতি যোগ্য হলেও কৃত্রিম পদোন্নতি সংকটের অস্তিত্ব সরকারি কলেজ সহ যে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিরাজমান তা দ্রুত অবসান হওয়া জরুরি।

অহেতুক বিলম্বিত পদোন্নতি জটিলতা অনিবার্যভাবে শিক্ষক সম্প্রদায়ের মধ্যে হতাশার সৃষ্টি করে এবং প্রকারন্তরে তা শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং ক্ষতিগ্রস্থ হয় সম্ভাবনাময় শিক্ষার্থী প্রজন্ম।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধ শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন – “সাত কোটি বাঙ্গালীকে তোমরা দাবায়ে রাখতে পারবা না। বাঙ্গালী বীরের জাতি। পৃথিবীর কোন শক্তি আমাদের পদানত করতে পারবে না”।

তিনি যে আত্মনির্ভশীল জাতি গঠনের স্বপ্ন দেখেছিলেন তা অর্জন করতে এবং বাংলাদেশকে দ্রæত সময়ের মধ্যে বিশ্বের উন্নত দেশের কাতারে সামিল করতে শিক্ষার সার্বিক বিষয়ে শিক্ষা দরদী মন নিয়ে এগুতে পারলে যেকোন দেশের তুলনায় আমরা আমাদের মেধা সম্পদের সর্বোত্তম প্রয়োগ করতে সক্ষম হবো এবং সত্যিকার উন্নত দেশে পরিণত হতে পারবো। আমাদের বাংলাদেশের প্রতিটি প্রজন্ম হবে মেধা বিজ্ঞানী যারা জ্ঞান বিজ্ঞানের প্রতিটি ক্ষেত্রে দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন এবং আগামীতে উৎপাদন মূখী গবেষণায় মানব কল্যাণে দেশে এবং বিদেশে সকল প্রকার উন্নয়ন কর্মকান্ডে নিয়োজিত থাকবে।

জ্ঞান, বিজ্ঞান, প্রযুক্তির পরনির্ভরতা থেকে পুরো জাতিকে রক্ষা করবে আমাদের আগামী দিনের শিক্ষামূখী প্রজন্ম এবং মধ্যম আয়ের দেশ রুপান্তরিত করে তারাই একদিন বাংলাদেশকে বিশ্বদরবারে প্রথম কাতারে নিয়ে যাবে যেখানে আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশসহ পৃথিবীর উন্নয়নশীল রাষ্ট্র আমাদের অনুসরণ করবে।

লেখক-গবেষক এবং শিক্ষক।

একই ধরনের আরও সংবাদ