অধিকার ও সত্যের পথে

মুক্তিযোদ্ধার সন্তান উপাখ্যান

 মির্জা সাব্বির হোসাইন রিফাতঃ
মুক্তিযোদ্ধারা নির্দ্বিধায় জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। দেশ ও জাতির জন্য তাদের অবদান,ত্যাগ অনস্বীকার্য। কুর্নিশ জানাই জাতির সেসকল শ্রেষ্ঠ সন্তান দের।
যেহেতু তাদের অবদান দেশের জন্য অনেক অনেক বড় ভূমিকা রাখে সেক্ষেত্রে অবশ্যই তারা কিছু সুযোগ সুবিধা সম্মাননা হিসেবে পাওয়ার দাবিদার।এই ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করার মত বেঈমান আমি নই।তবে কিছু কথা না বলে থাকতে পারছি না।
বর্তমান সময়ের আলোচিত সমস্যা শিক্ষাক্ষেত্রে কোটা। এখন চাকুরী, বিসিএস,বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি এমনকি বিভিন্ন স্কুলে ভর্তির ক্ষেত্রেও কোঠা পদ্ধতি রয়েছে। এসব ক্ষেত্রগুলোত্র ১৫%-৩৫% পর্যন্ত এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারও বেশি সংখ্যক নিয়োগ পায় কোঠা থেকে। যার মধ্যে সর্বাধিক সংখ্যক রয়েছে মুক্তিযোদ্ধা কোঠা।
যার বলি হচ্ছে লাখ লাখ সাধারণ শিক্ষার্থী যাদের বাবার বা দাদার এরকম উপাধি নাই।
এখন কথা হচ্ছে, এর কি নিশ্চয়তা আছে যে মুক্তিযোদ্ধারা যেসকল সদগুণের অধিকারী ছিল তার ছেলেরাও সেরকম সদগুণের অধিকারী হবে এবং দেশের জন্য মুক্তিযোদ্ধাদের মতই অবদান রাখবে?এরকম অনেক মুক্তিযোদ্ধার সন্তানকেই আমি চিনি যারা এখনো মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানে না,যারা বাঙালি জাতির উৎপত্তির ইতিহাস জানে না এমনকি দেশ ও জাতির ব্যাপারেও অভাবনীয় উদাসীন।
তাহলে কেন সকল শিক্ষার্থী কে সমান চোখে দেখে সমান মানদন্ডে মূল্যায়ন করা হচ্ছে না??কেউ কেন নিজের যোগ্যতা বলে না হয়ে বাবা দাদার উপাধি পুঁজি করে সুবিধা ভোগ করবে?
সেদিনও এক ছোটভাই এর মুখে কিছু হতাশার বাণী শুনলাম। বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির জন্য দেশের খ্যাতনামা একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দিয়ে যে পরিমান নম্বর পেয়ে চান্স পায় নি,ঠিক তার চেয়ে কিছু কম পেয়েও কোটাধারী তথা মুক্তিযোদ্ধার ছেলে মেয়ে/নাতি পুতি চান্সড।। অবাক লাগে,কষ্ট লাগে।
বাবা দাদাদের কামাই করা কোনো উপাধি নেই বলে সে তার মেধার দাম পেল না। অথচ যদি এই কোটার সিটগুলো সবার জন্য উন্মুক্ত হতো তাহলে সবার যোগ্যতাবলে চান্স হতো। আক্ষেপ নিয়ে ফিরতে হতো না কাউকে।
এটা একটা উদাহরণ দিলাম। এরকম আরো লাখ লাখ আছে।  এতে করে কি যথাযথ মেধার অবমূল্যায়ন হচ্ছে না?? প্রশ্ন থাকলো সমাজের সচেতন স্তরের কাছে।
বেশি যোগ্যতা নিয়েও যেই ছেলেগুলো চান্স পায় না তাদের চেয়ে কম যোগ্যতা নিয়ে যেসকল কোটাধারীরা চান্স পায় তাদের কি অভিজ্ঞতা বা দক্ষতা বেশি??নিশ্চই এই কম নম্বরে চান্স পাওয়া শিক্ষার্থীদের তাদের কোটার জোড়ে রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্তরের কাজেও নিয়োজিত করা হবে অথবা হচ্ছে।
কিন্তু এরা কি সেসকল কোটাহীন অথচ বেশি যোগ্যতাসম্পন্ন  শিক্ষার্থী দের চেয়ে বেশি দক্ষভাবে তাদের কাজ সম্পাদন করবে? দুঃখিত,অন্তত আমি একমত নই।এরকম অদক্ষ লোকজন কোটার বলে বা ক্ষমতার বলে দিনদিন দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থান গুলো দখল করছে বলেই দুর্বল হচ্ছে প্রশাসনিক অবকাঠামো।
উল্লেখ্য বাংলাদেশের সংবিধানের ২৯ নং অনুচ্ছেদ মোতাবেক “প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদলাভের ক্ষেত্রে সকল নাগরিকের সুযোগের সমতা থাকবে”।  সেখানেও কিন্তু বলা নেই যে মুক্তিযোদ্ধার পরিবার এই নিয়মের বাইরে। যদি তাই হয় তাহলে সরকারের কাছে সংবিধানের সপ্তদশ সংশোধনী আশা করছি।
একদিকে দিনরাত খেঁটে পড়াশুনা করে ভাল নম্বর পেয়েও উপযুক্ত মূল্যায়ন পাচ্ছে না সাধারণ শিক্ষার্থীরা আর অন্যদিকে কেউ কেউ শুধু বাপ-দাদার উপাধি কে কাজে লাগিয়ে অধিষ্ঠিত হচ্ছে সমাজের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্তরে।
জাতির উন্নয়নের পথে এর কতটা সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব পরতে পারে তা চিন্তাশীল লোকমাত্রই বুঝবেন।
কষ্ট লাগে যখন দেখি যোগ্যতাসম্পন্ন অনেক ছাত্রছাত্রী মেধার দৌড়ে এগিয়ে থেকেও কোটাধারীদের কাছে অসহায় পরাজয় মেনে নিতে বাধ্য হয়।
সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের দরকার পরলে মাসে কোটি টাকা ভাতা দিন,গাড়ি,বাড়ি,ফ্ল্যাট যা ইচ্ছা দিন। বলতে আসবো না কিছু। কিন্তু কারো স্বার্থ ক্ষুণ্ণ করে অন্য কেউ সুবিধা ভোগ করবে সেটা যেন না হয়। মুক্তিযোদ্ধা দের যা ইচ্ছা দিন কিন্তু তা যেন অন্যের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ করে না হয়। দয়া করে এবার অন্তত শিক্ষাক্ষেত্রে এই কোটা পদ্ধতি অপসারণ করে সুষ্ঠু মেধাবিকাশ ও মেধাযাচাই এর সুযোগ তৈরি করে দিন।
এই কোটা পদ্ধতির জন্য যে মেধার অবমূল্যায়নই শুধু হচ্ছে তাই নয়। এর ফলে তৈরি হচ্ছে একপ্রকার সরাসরি বৈষম্যের।এমনকি অনেকের মনে তৈরী হচ্ছে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের পরিবারের প্রতি ক্ষোভ।
অনুরোধ রইলো রাষ্ট্রের কাছে,সরকারের কাছে,রাষ্ট্রের উচ্চপদস্থ প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের মুখপাত্রদের কাছে,যোগ্যতা দিয়ে সবার বিচার করুন,কোটা দিয়ে নয়।
লেখক-১২ তম ব্যাচ,জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়,ঢাকা।
একই ধরনের আরও সংবাদ