অধিকার ও সত্যের পথে

এই শিক্ষামন্ত্রী লইয়া আমরা কী করিব?

 হাসান হামিদ:

প্রথমেই অভিনন্দন আজ যারা জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট ও প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় কৃতকার্য হয়েছে তাদের। যারা পাস করতে পারেনি, তাদেরও এতো কান্নাকাটির দরকার নেই; ভয়ের কিছু নেই। সামনে সারা জীবন পড়ে আছে, এই একটা পরীক্ষায় কারও জীবন নির্ধারিত হয়ে যায় না। সামনে নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে, দেশের জন্য কাজ করার সৎ মানসিকতা নিয়ে মাঠে নেমে দেখবে শেষ ছক্কাটা তারাই হাঁকিয়েছ, যারা সারা জীবন কাজ করে গেছো এই পৃথিবী, দেশ ও সমাজকে বদলাবে বলে।

এবার আসি আসল কথায়। আমাদের প্রিয় শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেছেন, ‘১৯৬১ সাল থেকে প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে। আগে বিজি প্রেস থেকে পরীক্ষার ২ মাস আগে প্রশ্ন ফাঁস হতো। এখন পরীক্ষার দিন সকালে ফাঁস হয়। কিছু কু-শিক্ষক প্রশ্ন ফাঁস করছেন। আমরা চেষ্টায় আছি এটাও পুরোপুরি বন্ধ করার।’ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে এক সংবাদ সম্মেলনে এমন সত্য কথা একমাত্র তিনিই বলতে পারেন! বিজি প্রেস থেকে ২ মাসে ফাঁস হওয়া ব্যাপারটিকে তিনি এক রাতের মধ্যে এনেছেন; এটাও কিন্তু এক প্রকারের সফলতা!

কিছুদিন আগে শিক্ষামন্ত্রী বলেছিলেন, ‘শিক্ষকদের স্থান সবার ওপরে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, কতিপয় শিক্ষক শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিচ্ছেন। এ থেকে তাঁদের বেরিয়ে আসতে হবে।’ এই বক্তব্য তিনি দিয়েছেন নিজেদের দোষ অন্যের ঘাড়ে দিতে। আর বোমা ফাটিয়েছেন ‘আপনাদের প্রতি আমার অনুরোধ, আপনারা ঘুষ খাবেন, তবে সহনশীল হইয়্যা খাবেন’- ঘুষ নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী এই মন্তব্য করে। তার এমন বক্তব্যকে দুর্নীতি রোধে সরকারের অসহায়ত্বের প্রকাশ পায়। শিক্ষা ভবনে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদফতরের (ডিআইএ) কর্মকর্তাদের ল্যাপটপ বিতরণ অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী দুর্নীতির প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে সহনীয় মাত্রায় ঘুষ নেয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কী ভয়াবহ ব্যাপার! মন্ত্রীর বক্তব্যে এটা পরিষ্কার তাকে এখন নিজেকে দুর্নীতি ও দুর্নীতিবাজদের হাতে জিম্মি ভাবতে হচ্ছে। তার যদি দুর্নীতির বিরুদ্ধে সৎসাহস ও দৃঢ়তা থাকত তাহলে এরূপ অসহায়ত্বের মাধ্যমে দুর্নীতির আরও বিস্তার ঘটানোর প্রেসক্রিপশন দেওয়ার প্রয়োজন ছিল না। সেক্ষেত্রে তিনি তার দাবি অনুযায়ী দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য-সহনশীলতার কার্যকর প্রয়োগ করতে পারতেন।

তারও আগে আমাদের শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, ‘প্রশ্ন ফাঁস যুগ যুগ ধরে হচ্ছে। আগে এত বেশি প্রচারণা হতো না, এখন গণমাধ্যম বেড়ে যাওয়ায় তা সর্বস্তরে প্রচার হয়ে যাচ্ছে।’ একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করে বলেছেন, প্রশ্ন ফাঁসের মূল হোতা আমাদের শিক্ষকরা! সরকারকে বিপদে ফেলতে পাবলিক পরীক্ষার দিন সকালে শিক্ষকরা প্রশ্ন পেয়েই ফেসবুকসহ বিভিন্ন মাধ্যমে তা ফাঁস করে দিচ্ছেন।’ আর গত ৩০ ডিসেম্বর ২০১৭ তারিখে শনিবার দুপুরে সচিবালয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে এক  সংবাদ সম্মেলনে নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের উদ্দেশ্যে আমাদের শিক্ষামন্ত্রী আরেকটি কথা বলেছেন। সেখানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, শীতের মধ্যে এত কষ্ট করে লাভ নেই। আন্দোলন বাদ দিয়ে শিক্ষকদের বাড়িতে গিয়ে খাওয়াদাওয়া করার কথা বলেন তিনি!

মাননীয় মন্ত্রী, শিক্ষকরা এমনি এমনি আন্দোলন করেন না। চোখ বন্ধ করে বলুন তো কোন পেশার মানুষগুলো একটি দেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ? হেনরি এডামস-এর একটি কথা এক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক। তিনি বলেছেন, একজন শিক্ষক সামগ্রিকভাবে প্রভাব ফেলেন, কেউ বলতে পারে না তাঁর প্রভাব কোথায় গিয়ে শেষ হয়। বাট্রাণ্ড রাসেল আরো এক পা এগিয়ে এর ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছেন, মানুষের সুখী হওয়ার জন্যে সবচেয়ে বেশি দরকার বুদ্ধির এবং শিক্ষার মাধ্যমে এর বৃদ্ধি ঘটানো সম্ভব। আর সে কাজটি করেন একজন শিক্ষক। আমি বাজি ধরে বলতে পারি; একজন শিক্ষক যেভাবে শেখাবেন, যতটুকু স্বপ্ন রচনায় উৎসাহিত করতে পারবেন আমাদের প্রজন্মকে, ততোটা কেউ পারবেন না; আর সেকারণেই তারা মানুষ গড়ার কারিগর। আমাদের দেশ ডিজিটাল হয়। পাল্টে যায় অর্থনীতির সূচক। সেই সাথে দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে আমাদের চাওয়া-পাওয়া। শিক্ষার আলো সময়ের প্রয়োজনেই প্রতিটি মানুষের দ্বারে দ্বারে। শুধু পাল্টায় না শিক্ষকদের জীবনমান। তাহলে তারা আন্দোলন করবে না দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলেও?

গুরু দ্রোণের মতো রাষ্ট্রীয় অপক্ষমতার কাছে যুগে যুগে শিক্ষককে নীরবতা পালন করতে হয়েছে। কিন্তু শুধু আদর্শকে ধারণ করে জীবনের সব ভোগ-বিলাস থেকে মুখ ফিরিয়ে জ্ঞানের আলো বিতরণের কাল এখন আর নেই। শিক্ষকের সংসার-সন্তান আছে। গতিময় সমাজে সে স্বপ্ন দেখে উন্নত সম্মানিত এক জীবনের। সমাজের ধ্যান-ধারণায় পরিবর্তন এসেছে। আর্থিক মাপকাঠিতে মূল্যায়িত হয় মানুষ। সমাজের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে চলার মতো সংস্থান এবং উন্নয়ন মানসম্মত এক জীবনের স্বপ্নই পারে একজন মানুষকে শিক্ষকতা পেশায় আসার অনুপ্রেরণা দিতে।

আমাদের প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য, আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার ও জাতীয় শিক্ষানীতিতে থাকা সত্ত্বেও, পে-কমিশনের ‘স্বতন্ত্র বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করা যাবে না’ মর্মে সুপারিশ সকল স্তরের শিক্ষকদের হতাশ করেছে। বর্তমান সরকার প্রথম মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই শোনা যাচ্ছিল শিক্ষকদের জন্য আলাদা বেতন স্কেল হবে। কিন্তু আজো সে স্বপ্ন বাস্তবায়ন হয়নি। বরং আমরা দেখেছি, আন্দোলনরত শিক্ষকদের ভাগ্যে জুটেছে মরিচের গুঁড়া। তাহলেও তারা আন্দোলনে যাবে না?

আমি স্বীকার করছি, বাংলাদেশ আমেরিকা বা সুইজারল্যান্ড নয়। উন্নত দেশের মতো বেতন দেয়া এ দেশে সম্ভব নয়। কিন্তু বাংলাদেশের পাশে আছে পশ্চিমবঙ্গ, কথায় কথায় যাদের উদাহরণ আমরা দেখাই। বাংলাদেশে একজন শিক্ষকের বেতন আর পশ্চিমবঙ্গের একজন শিক্ষকের বেতনের পার্থক্য আকাশ-পাতাল। আসলে ব্রিটিশরা এ দেশের শিক্ষকদের ললাটে অসম্মানজনক বেতনের যে অপমান লেপন করেছিল আজো তার অবসান হয়নি। সৈয়দ মুজতবা আলী রচিত পাদটীকা গল্পে পণ্ডিতমশাই তার ছাত্রদের যে গাণিতিক সমস্যার সমাধান করতে দিয়েছিলেন আজো সে ছাত্ররা তার সমাধান দিতে পারেনি। পণ্ডিতমশাইয়ের ছাত্ররা মন্ত্রী হন, অর্থমন্ত্রী হন, দেশের কর্ণধার হন কিন্তু পণ্ডিতমশাইয়ের গাণিতিক সমস্যার সমাধান করতে পারেন না। মনে রাখতে হবে, সমাজের সব পেশাই গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রয়োজনীয়। কিন্তু শিক্ষকতাকে সব পেশার সঙ্গে গুলিয়ে ফেললে হবে না। উন্নত দেশের শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে সেসব দেশের শিক্ষকের সামাজিক অবস্থান এবং অরাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকেও আমাদের অনুসরণ করতে হবে। শিক্ষাকে আধুনিক রূপ দেয়ার আগে শিক্ষককে আধুনিক এবং যুগোপযোগী করার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নিতে হবে। আর আমরা তো এটা সবাই জানি, শিক্ষার মানের ওপর শুধু একজন শিক্ষার্থীর নয়; একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে। দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের টিচার পেই অ্যারাউনড দ্য ওর্য়াল্ড প্রবন্ধে বলা হয়েছে : আমেরিকার শিক্ষা ব্যবস্থা আজকের শিক্ষার্থীকে আগামী দিনের অর্থনীতির জন্য প্রস্তুত করে। একজন মেধাবী ও দক্ষ শিক্ষকই শিক্ষার্থীদের প্রকৃত শিক্ষা প্রদান করতে পারে। আর মেধাবী শিক্ষার্থীরা তখনই শিক্ষকতায় আসবে, বিশেষ করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় আগ্রহী হবে; যখন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের উচ্চপর্যায়ের সম্মান ও সম্মানী প্রদান করা হবে। উন্নত রাষ্ট্রগুলো এ বিষয়টি বহু আগে উপলব্ধি করেছে বলেই তাদের শিক্ষাব্যবস্থা আমাদের থেকে বহু এগিয়ে রয়েছে।

মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী, আপনি এদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার দিকপাল। দয়া করে শিক্ষার্থীদের হাতে বই তুলে দেওয়ার আগে সেটিকে ত্রুটি মুক্ত করার কার্যকর ব্যবস্থা নিন, প্রশ্ন ফাঁসে যারা জড়িত এদের কড়া শাস্তি দিন, আর শিক্ষকদের আর্থিক দিক নিয়ে ভাবুন। শিক্ষকদের বাসায় ব্যাচ পড়ানো বন্ধের আগে আপনার সুবোধ কর্মকর্তাদের বদলি বাণিজ্য, লাখ লাখ টাকা খেয়ে নিয়োগ দেওয়া বন্ধের ব্যবস্থা নিন। এটা বলুন যে যারা ঘুষ খেয়ে ধরা পড়বে তাদের চাকরি চলে যাবে আর জেলের ভাত খেতে হবে। কয়েক জনকে চাকরিচ্যুত করে দেখুন; বাঙালি সোজা কথায় সহজ হবে না।

আর শিক্ষকরা পাঠদানে আরও বেশি করে মনোযোগী তখনই হবেন, যখন তাদের আর্থিক দুর্দশা থাকবে না। সহজ কথায় বলা যায়, শিক্ষাকে যুগোপযোগী এবং মানসম্মত করার জন্য, মানুষকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য, সর্বোপরি সত্য কথা বলার মানুষ সৃষ্টির জন্য শিক্ষার আগে শিক্ষকের কথা ভাবতে হবে। শিক্ষকতা পেশায় দেশের সবচেয়ে মেধাবী এবং মননশীলদের সম্পৃক্ত করার জন্য এই পেশার মর্যাদা এবং বেতন স্কেল আলাদা করতে হবে। আপনিই সেটা পারেন, মাননীয় মন্ত্রী।

লেখক- কবি ও গবেষক।

একই ধরনের আরও সংবাদ