অধিকার ও সত্যের পক্ষে

রুমানার পড়া-খেলা

 অনলাইন ডেস্ক

ব্যাটে-বলে দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দলের অধিনায়ক রুমানা আহমেদ। মাঠের এই অলরাউন্ডার মাঠের বাইরেও কম যান না। খেলা, নিয়মিত অনুশীলন, দেশের বাইরে টুর্নামেন্ট খেলতে যাওয়া…এত কিছুর মধ্যেও তিনি পড়ালেখা ছাড়েননি

‘আমি যখন ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দিই, তখন মোহামেডান ক্লাবের সঙ্গে আমার চুক্তি ছিল। প্রিমিয়ার লিগের খেলা আর ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা চলছিল একসঙ্গে। এমনও হয়েছে, আমি পরীক্ষার হল থেকে বের হয়ে বাসে উঠতাম ঢাকায় এসে খেলার জন্য। আবার খেলা শেষ করে বাসে উঠতাম খুলনা যাওয়ার জন্য। এই আসা-যাওয়ার মধ্যেই পড়তে হতো।’

রুমানা আহমেদের কথাগুলো সিনেমার গল্পের মতো শোনাল। ভারতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক মহেন্দ্র সিং ধোনির জীবনকাহিনি নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্র এম এস ধোনি: দ্য আনটোল্ড স্টোরি যাঁরা দেখেছেন, তাঁদের নিশ্চয়ই ছবির একটি অংশের কথা মনে পড়ে যাবে। তিন ঘণ্টার পরীক্ষা আড়াই ঘণ্টায় শেষ করে ধোনি ছুটতেন ট্রেন ধরার জন্য। আমাদের রুমানার গল্পও তো একই রকম। তাঁর সংগ্রামও কম নয়। যে সমাজে এখনো ‘মেয়েদের অত পড়ালেখার দরকার নাই’, কিংবা ‘মেয়েদের আবার খেলাধুলা কিসের?’-এমন ধারণা অনেকের, সেখানে রুমানারাই তো পথ দেখান। বাংলাদেশের নারী ক্রিকেট দলের অধিনায়ক তিনি। জাতীয় দলে খেলার পাশাপাশি পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছেন। এখন নর্দান ইউনিভার্সিটিতে দ্বিতীয় বর্ষে পড়ছেন, স্নাতক করছেন ইংরেজি সাহিত্যে।

পড়ালেখার পাশাপাশি খেলছেন নাকি খেলার পাশাপাশি পড়ালেখা করছেন? প্রশ্নের উত্তর রুমানার মুখ থেকেই শোনা যাক। ‘আমি খেলার পাশাপাশি পড়ছি না বা পড়ার পাশাপাশি খেলছি না। আমি আসলে দুটোই একসঙ্গে করছি।’ অনুপ্রেরণার জন্য তাঁকে খুব বেশি দূরে তাকাতে হয়নি। নিজেই বললেন, ‘আমাদের মুশফিক ভাইও (জাতীয় দলের ক্রিকেটার মুশফিকুর রহিম) তো এমন। তিনি খেলার বাইরে একমুহূর্ত সময় নষ্ট করেন না। আমি যত দূর জানি, তিনি খেলার সঙ্গে পড়ালেখাটাও ভালোমতোই করেছেন।’

১০ জানুয়ারি রুমানা অস্ট্রেলিয়ার উদ্দেশে রওনা হবেন বিগ ব্যাশ খেলার জন্য। সে দেশের এই জনপ্রিয় টি-টোয়েন্টি লিগে রুমানা ছাড়াও খেলবেন নারী ক্রিকেট দলের আরেক পরিচিত মুখ খাদিজাতুল কুবরা। এর আগে বাংলাদেশ থেকে বিগ ব্যাশে খেলার সুযোগ পেয়েছিলেন একজনই-সাকিব আল হাসান। বিগ ব্যাশ টুর্নামেন্ট শেষ করে রুমানা অস্ট্রেলিয়ায় থাকবেন আরও বেশ কিছুদিন। সেখানকার সিডনি ক্লাবের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন তিনি।

কখনো কলম, কখনো ব্যাট-বল
খুলনার রোটারি হাইস্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং ইসলামিয়া কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছেন রুমানা আহমেদ। ছোটবেলায় খেলোয়াড় হওয়ার কথা নাকি তিনি কল্পনায়ও ভাবেননি। ক্রিকেটের প্রতি আগ্রহ ছিল। ভাইয়েরা টেপ টেনিস বল দিয়ে ক্রিকেট খেলতেন, তাঁদের সঙ্গে খেলতেন রুমানাও। মাধ্যমিকের পর মূলত ক্রিকেটের সঙ্গে তাঁর সখ্য হয়। স্থানীয় কোচ ইমতিয়াজ হোসেনের কাছে প্রশিক্ষণ নেওয়া শুরু করেন। একে একে জাতীয় লিগ, ক্লাব কাপের সিঁড়িগুলো পেরিয়ে জাতীয় দলে পা রাখেন তিনি।

কলেজের বন্ধুরা যখন উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে কোথায় পড়বে, কী করবে এসব নিয়ে ভাবছে, রুমানা তখন ক্রিকেট নিয়ে পুরোদমে ব্যস্ত। অনেকে পরামর্শ দিয়েছিল, ‘জাতীয় দলে খেলে আবার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াটা কঠিন হয়ে যাবে। তুমি বরং পাস কোর্সে ভর্তি হও।’ কিন্তু রুমানা রাজি হননি। বিশ্ববিদ্যালয়েই পড়ার ইচ্ছে ছিল তাঁর। এ সময় নর্দান ইউনিভার্সিটি থেকে তাঁকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়, পূর্ণ বৃত্তিসহ পড়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়। সুযোগটা হাতছাড়া করেননি তিনি।

জাতীয় দলের অলরাউন্ডার রুমানা। ব্যাটিং আর বোলিং-দুটোর অনুশীলনেই তাঁকে প্রচুর সময় দিতে হয়। তার ওপর অধিনায়কের দায়িত্ব তো আছেই। এত চাপের মধ্যেও ঠিক কোন তাড়নায় তিনি পড়াশোনাটা ধরে রেখেছেন? প্রশ্নের উত্তরে রুমানার উত্তর, ‘পড়ালেখা তো আমাকে করতেই হবে। কারণ ক্রিকেটই তো জীবনের শেষ নয়। আর কত বছর খেলতে পারব জানি না। এরপর তো আমাকে একটা কিছু করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, উচ্চশিক্ষাটা খুব জরুরি। কারণ এটা না হলে ঠিক নিজেকে মেলে ধরা যায় না। নিজেকে জানার জন্য, বোঝার জন্য এটা খুব দরকার। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের খেলোয়াড়দের দেখেও মনে হয়েছে, পড়ালেখা করা দরকার।’
নিয়মিত ক্লাস করার সুযোগ একেবারেই হয় না। বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু আর শিক্ষকেরা তাঁকে যতটা সম্ভব সাহায্য করেন। তবু রুমানার পড়ালেখায় মাঝে এক বছরের বিরতি পড়েছিল। বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দল যখন ওয়ানডে স্ট্যাটাস পেল, বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পেল, তখন আর ক্লাসে সময় দেওয়ার সুযোগ হচ্ছিল না। সকাল-বিকেল প্র্যাকটিসে থাকতে হতো। তারপর? ‘পড়ালেখা করতে পারছিলাম না বলে মন খারাপ হচ্ছিল। কিন্তু আমি হাল ছাড়িনি। একটা সুযোগ খুঁজছিলাম। আবার পড়ালেখা শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম।’ এমন সময় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। ব্যাটে বলে মিলে যাওয়ায় আবার পড়ালেখা শুরু করেন তিনি। ক্রিকেট কিটের সঙ্গে তাঁর কাঁধে আবারও জায়গা পায় বই-খাতার ব্যাগ। মাঠে রান তোলার জন্য কিংবা প্রতিপক্ষের উইকেট নেওয়ার জন্য যেভাবে পরিশ্রম করেন, পড়ালেখার জন্য তিনি একই রকম পরিশ্রম করতে চান। কারণ তিনি বিশ্বাস করেন, নিজেকে মেলে ধরতে হলে পড়াশোনা করাটা জরুরি।

একই ধরনের আরও সংবাদ