অধিকার ও সত্যের পথে

সিঁড়ির ওপরে কয়েক ঘণ্টা

বাসার তাসাউফ

বর্ষা ঋতু চলছে। আকাশের বুকে সারাক্ষণই দেখা যাচ্ছে পেজাতুলোর মতো ভাসমান হালকা হালকা মেঘমালা। মন শুধু পালাই পালাই করছে মেঘলা এই দিনে।
বর্ষার শুরুতেই আমার ঘরের সামনের বারান্দায় টবে ফুলগুলো ফোটা শুরু করেছিল, দুয়ারের কাছে অনাঘ্রাত গোলাপ ফুলগুলো অদ্ভুত সুন্দর ঘ্রাণ উপহার দিয়ে যাচ্ছে, ঘরের ওপর দিয়ে শালিক পাখির ঝাঁক উড়ে যাওয়া বিকেলে পশ্চিম দিগন্তে অদ্ভুত এক ছবি ফুটে ওঠে, সূর্যটা সারাদিন আলো আর উত্তাপ ছড়িয়ে ডুবে যাবার আগে প্রকৃতির অপার বিস্ময় জাগে চারপাশে, বারান্দার ব্যালকনিতে বেতের চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আয়েশ করা বই পড়া যায়, আজো বসেছিলাম হাতে নিয়ে জীবনানন্দ দাশের কবিতাসমগ্র। ‘বনলতা সেন’ নামক কবিতাটির কয়েক লাইন পড়ার পর বনলতা সেনের চুলগুলো কেমন ছিল ভাবতে থাকি, ভাবতে ভাবতে মনে পড়ে যায় আপনার কথা, সেই সঙ্গে মনে পড়ে আপনাকে একটি চিঠি লেখার ছিল…!

 

 

ছবি: সংগৃহিত।

আচ্ছা,খানে আপনাকে ‘আপনি’ করে বলতে কেমন জানি বেখাপ্পা লাগছে, ‘তুমি’ করে বলা সমীচীন হবে না হয়তো তাই ‘আপনি’ ও ‘তুমি’র দোলাচলে দুলতে দুলতে তৃতীয় একটি শব্দ ব্যবহার করতে পারলে বোধ হয় ভালো হতো আর সেটি যে ‘তুই’ তা কিন্তু না। এ তিনটি শব্দ ছাড়া সম্বোধনের আর কোন যুৎসই শব্দ পেলাম না। যেখানে বাংলা গল্প-উপন্যাসে নায়ক- নায়িকার ‘আপনি’ থেকে ‘তুমি’তে আসতে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা খরচ হয়, সেখানে আমাদের কথা হয়েছে মাত্র কয়েক মিনিট, সিঁড়ির ওপরে দাঁড়িয়ে। ‘সিঁড়ির পাশে তিন মিনিট অথচ স্বপ্নে সারারাত…!’
সরাসরি আপনার নাম বলে সম্বোধন করা যেতে পারে, কিন্তু আপনার যে আপত্তি আছে, তা কয়েকবারই জানিয়ে দিযেছেন। বলেছিলেন, আমি যেন একটি নাম দিয়ে দিই। এতেই আমাকে আরো দ্বিধায় পড়তে হল, কী নাম দেব আপনাকে? ফুল কিংবা পাখির নাম, ঝর্ণা কিংবা নদীর নাম দিতে পারি। কিন্তু আমার কেন জানি মনে হচ্ছে, ওসব নামে আপনাকে মানাবে না। ধরুন, আপনার নাম দিলাম জুঁই অথবা মোহনা। জুঁই মানে তো একটি ফুল, মোহনা মানে চারদিকে জলের ফোয়ারা। জল তো আপনাকে মানাবে না, চোখের জল বা কেমন দুঃখি দুঃখি লাগে। জোছনা নামে ডাকা যায়, কিন্তু আলো ছড়ানো ভাব আছে। আমি কি চাই, আপনার আলোয় অন্য কেউ আলোকিত হোক! তাই ওসব নাম নেয়া সম্ভব হল না। আচ্ছা, আরেকটি বাঁকা পথ বেঁছে নিলে কেমন হয়? আপনার নামের প্রথম আর আমার নামের শেষ বর্ণটি নিয়ে একটি নাম সৃষ্টি করে নিলে? না, পরক্ষণেই মনে হলো, এতে তো আপনার মুখচ্ছবি মনে করিয়ে দেয় না, কী করি? যে আমি বন্ধুদের ‘তুমি’ তো দূরের কথা, ‘তুই’ ছাড়া ডাকতেই পারি না। তবে ব্যাকডেটেড হলেও আপনাকে ‘আপনি’ বলতে কিন্তু মজাই লাগছে। সুতরাং আপনাকে আমি ‘আপনি’ করেই সম্বোধন করছি…।
যাক, যে কথা বলছিলাম।
আপনি একটি চিঠি পেতে চেয়েছিলেন। দীর্ঘদিন আমিও একটা চিঠি লিখব ভেবেছি। তবে সেই চিঠি যে এমন চিঠি হবে এটা ভাবি নি। চিঠির ভাষা সাজিয়েছি একটু অন্যভাবে। আমি লেখক, সামান্য সাহিত্যের ছোঁয়া আর ভাষার কিছুটা কারুকাজে চিঠি লেখব সেটাই স্বাভাবিক। লিখতে গিয়ে অনেক বেগ পেতে হয়েছে। গল্প, কবিতা, উপন্যাসে অন্যের বিষয় লেখা যত সহজ নিজের জন্য লেখা ততটা নয়। যা লিখতে বা প্রকাশ করতে চাই তা প্রকাশ করতে না পাবার ব্যর্থতা নিয়েই লিখছি। অবশ্য ইন্টারনেট, ম্যাসেজের এ যুগে চিঠি লেখাটা কিছুটা হাস্যকরও বটে! এখন কে আর চিঠি লেখে! পরিচিত হাতের লেখার আবেদন, কাছের মানুষের হাতের লেখা স্পর্শের আনন্দ বোঝার ক্ষমতা যন্ত্রমানবদের হবে না। আমি যেন এ যুগের নই, তাই হয়তো এ চিঠি লিখছি। লিখতে লিখতে কী লিখছি তার মাথামুণ্ডু খুঁজে পাচ্ছি না, কীভাবে শুরু করব, বারবার ঘুরে ফিরে একটি কথাই মনে পড়ে যাচ্ছে, ‘সিঁড়ির ওপরে কয়েক মিনিট…..!’
আচ্ছা, আর ভূমিকা, উপ ভূমিকা, প্রতি ভূমিকা না করে সোজাসাপ্টা একটি কথা দিয়ে চিঠিটি লেখা শুরু করি, মানুষকে ভালো লাগার এক’শ একটা কারণ থাকতে পারে। আমি অনেক খুঁজে একটা কারণও পেলাম না, তবু আপনাকে কেন ভালো লাগে জানি না। আপনাকে ঠিকমতো কখনো দেখেছি কি দেখি নি, দু-একটা কথা বলেছি কি বলি নি, তবু আপনার কথা ভাবছি, অবিশ্বাস্য! বারবার আমার মনে পড়ছে, সিঁড়ির ওপরে কয়েক মিনিটের কথোপকথন, রক্তরাঙা ঠোঁটজোড়া, লাল রঙের ঠোঁটের সঙ্গে মিলিয়ে আপনার পরনে যদি তরমুজ রঙের শাড়ি থাকতো আর খোঁপায় থাকতো লাল রঙের মাধবী ফুল, কেমন লাগত আপনাকে তখন? মনে হত, জলন্ত অগ্নি। তখন কি আশপাশের সব কিছু পুড়ে যেত! সেটাই বোধ হয় ভালো ছিল, পুড়ে যেতাম আমিও, তবেই আর এভাবে রক্তাক্ত হতে হত না…!
সরি, চিঠিটা আর আজকে লেখা হল না। চিঠির বদলে আমার ব্যক্তিগত কথা বলেই পাতা ভরে উঠল। অর্ধ পৃষ্ঠা সাহিত্য পাতা। শব্দ আর বাড়ানো যাচ্ছে না বলে চিঠিটা শুরু করা গেল না। অন্য একটি সংখ্যায় না হয় লিখব চিঠি আপনাকে, তোমাকে, তোকে…!

 

বাসার তাসাউফ

কবি ও কথাসাহিত্যিক

জন্ম: ৪ ফেব্রুয়ারি

অনন্তপুর, কুমিল্লা । 

 

একই ধরনের আরও সংবাদ