অধিকার ও সত্যের পথে

জাতীয়করন আন্দোলনের ভীড়ে বঞ্চিত শিক্ষক সমাজ

সারোয়ার মিরন

শিক্ষক কিংবা শিক্ষা ব্যবস্থার জাতীয়করন আন্দোলনেরর ভীড়ে উপেক্ষিতই থেকে যাচ্ছে শিক্ষকদের বেশ কয়েকটি ন্যায্য দাবি। দাবি গুলোর মধ্যে রয়েছে বার্ষিক ৫শতাংশ ইনক্রিমেন্ট, নন এমপিও শিক্ষককদের এমপিও প্রদান, অনার্স মাস্টার্স শিক্ষকদের জনবল কাঠামো এবং এমিপওভুক্তি, বেসরকারী শিক্ষকদের বদলী সুবিধা, পদোন্নতিতে অনুপাত প্রথার বিলুপ্তি, নতুন শাখা-বিষয় ও প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তিকরনসহ বেশ কয়েকটি ন্যায্য পাওনা। এছাড়াও আছে পুর্নাঙ্গ উৎসব বোনাস, বৈশাখী ও বিজয় দিবস ভাতা, জাতীয় দিবস গুলোর বিকল্প ছুটিও।

সকল স্তরের শিক্ষা ব্যবস্থা জাতীয়করনে সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়তো থাকতে পারে। এ নিয়ে বিভিন্ন মহলে কথাবার্তাও চলছে। দেশের বিভিন্ন উপজেলায় সরকারী মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং মহাবিদ্যালয় বিহীন উপজেলা গুলোতে একটি করে সরকারী স্কুল কলেজ সরকারীকরনে সরকারের শিক্ষা ব্যবস্থা জাতীয়করনে প্রাথমিক স্টেপ বলাও চলে। সাধুবাদ জানাই সরকারের এ স্বদিচ্ছাকে। এ পদক্ষেপের ফলে তিন শতাধিক স্কুল এবং ২৮৬টি কলেজ জাতীয়করনের আওতায় চলে আসলো। মোট মিলিয়ে জাতীয়করনের আওতায় আসলো মাধ্যমিক, কলেজ এবং মাদ্রাসা শিক্ষার কতো শতাংশ? বর্তমান সরকারের গত সেশনে প্রায় ২৬ হাজার রেজিস্টার্ড প্রাইমারি স্কুল জাতীয়করনের ফলে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা ইতিমধ্যেই প্রায় শতভাগ জাতীয়করনের আওতায় চলে এসেছে।

জাতীয়করন চায় প্রায় প্রতিটি শিক্ষকই। সবাই চায় খুব দ্রæত শিক্ষা ব্যবস্থা জাতীয়করন করা হোক। কিন্তু আমি বা আমরা চাইলেই কি এ বিশাল কর্মযজ্ঞ সহসায় সম্পাদন করা সম্ভব হবে!!! বাস্তবতাটা ঠিক কি বলে!! বহুমুখী বঞ্চনায় দীর্ঘদিবস ধরে বঞ্চিত শিক্ষকদের যাবতীয় দুর্ভোগের একমাত্র সমাধান জাতীয়করন। সরকার আজ নয়তো কাল তা করতে হবে। করতে বাধ্য হবে হয়তো। তবে সেটা কতোটা সময় লাগবে এখানেই কথা থেকে যায়।

ধরি আাগামী কয়েক বছর ধরে শিক্ষা ব্যবস্থা জাতীয়করন প্রক্রিয়া চলতে থাকলো। সেটা হতে পারে আগামী সরকারের পুরোটা সময়ও। কিন্তু ততদিন নন-এমপিও শিক্ষক-প্রতিষ্ঠান, তৃতীয় শিক্ষক, অনার্স-মাস্টার্স শিক্ষকদের কি অবস্থা দাঁড়াবে? এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের অন্যান্য সুযোগ সুবিধার কথা বাদই রাখলাম। তাহলে কি ধরে নিলাম জাতীয়করন হওয়া পর্যন্ত সরকার শিক্ষকদের সব দিক থেকেই বঞ্চিত করে রাখবে!!! সবাই কি তব বঞ্চিতই হতে থাকবো। পুর্নাঙ্গ বোনাস, বিভিন্ন ভাতা, ০৫% ইনক্রিমেন্ট, বদলী সুবিধা, পদোন্নতি ইত্যকার সব ন্যায্য পাওনার কি হবে!!!

অনেক শিক্ষক বলতে পারেন জাতীয়করন হলে সকল সমস্যার সমাধান তো হচ্ছে। সুতরাং জাতীয়করন আন্দোলনই এখন একমাত্র পথ। মানছি সে কথা। কিন্তু আমার ভয় সে জায়গায়-আন্দোলনের সফলতার দীর্ঘসূত্রিতা নিয়ে। আবার এটাও ভাবা উচিত যে, আমরা কি একটি কার্যকর আন্দোলন প্রক্রিয়া গড়ে তুলতে পারবো? কিংবা পেরেছি?? এক ডজনেরও বেশি শিক্ষক সংগঠন। এক দাবীতে এক পতাকা তলে আবদ্ধ কি হতে পেরেছি!! নানামুখী বিচ্ছিন্নতার এ সংগ্রামে লক্ষ্যটা কেবল দীর্ঘ পথ পাড়ি দেবে। অত:পর সফলতা আসবে। এটা যতটা আন্দোলনের কারনে তার চেয়েও বেশি সরকারি সিদ্ধান্তে। এখন ব্যাপার হলো সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে কতোটা ব্যাধ্য করতে পারি আমরা শিক্ষকরা। শিক্ষক এবং শিক্ষক সংগঠন গুলোর একাত্মহীন আলাদা-আলাদা কর্মসূচি কিংবা আন্দোলনের রুপরেখা আমাদের হতাশই করে। আজ এ সংগঠন এ ঘোষনা দেয় কাল আরেক সংগঠন অন্য এক ঘোষনা দেয়!!! বিচ্ছিন্ন এ কর্মসূচির সফলতা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। সকল সংগঠন গুলোকে এক কাতারে আসতে হবে। একই রুপরেখায় আন্দোলনে যেতে হবে। তাহলেই কেবল সম্ভব এক দাবী আদায়। অন্যথায় কেবলই দীর্ঘপথ যাত্রা।

জাতীয়করন দাবি আদায় পর্যন্ত সংগ্রাম চলবে। এতে সব শ্রেনির শিক্ষকদের অংশগ্রহনও থাকবে। জাতীয়করন আন্দোলনের এমপিওভুক্ত, নন-এমপিওভুক্ত বলে কোন বিষয় নেই। জাতীয়করন হলে সবারই হবে। তবে খানিকটা ভিন্নরুপও দেখি মাঝে মধ্যে। কিছু কিছু শিক্ষক এবং সংগঠন কেবলমাত্র এমপিওভুক্ত শিক্ষক এবং শিক্ষা ব্যবস্থার জাতীয়করন চায়। আর এখানেই আমাদের শংকা। শিক্ষক সবাই শিক্ষক। সবাই একই প্রক্রিয়ায় বিধি সম্মত ভাবে নিয়োগ প্রাপ্ত। জাতীয়করন হলে সবার হতে হবে। আলাদা দাবি তুলে ধরা পরিপূর্ন অনৈতিক। কেউ আবার মাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থার জাতীয়করন চায়। আবার কেউ কলেজ শিক্ষা ব্যবস্থার জাতীয়করন চায়। সবাই সবার সুবিধা মত রুপরেখা তৈরি করে।

অবস্থা এমন দাড়ালো যে, নন-এমপিও শিক্ষক-প্রতিষ্ঠান, অনার্স-মাস্টার্স, তৃতীয় শিক্ষকসহ নন-এমপিও শিক্ষকদের কথা কেউ বলতে চায় না। পুরোনো প্রবাদটির কথা মনে পড়ে গেল- ‘যারা খেয়েছে তারা আবার খাক, আর যাদের খাওয়া হয়নি তারা অভুক্তই থাক’। আমার মনে হয় নন-এমপিভুক্ত সকল শ্রেনির শিক্ষকদের আলাদা প্লার্টফর্ম খুজতে হবে। কেননা জাতীয়করন আন্দোলন সফলতায় অনেক সময় লেগে যেতে পারে ততদিন আপনাদের জীবন যাপন বৈচিত্র্যের অসম্ভব রকম হানি ঘটবে। বেঁচে থাকা কষ্টকরই হবে। বিনা পয়সায় আলো জ¦ালানোর সংগ্রামে কেবল নি:শেষই হবেন দিন দিন।

জাতীয়করন প্রক্রিয়াটি কি একত্রে হবে নাকি ধীরে ধীরে হবে তা ভাবারও সময় এসেছে। হার্ড লাইনে গেলে এখনই যেতে হবে। খন্ডিত কোন অংশ নয়, পুর্নাঙ্গ শিক্ষা ব্যবস্থার জাতীয়করন আন্দোলন করতে হবে। সফট্ লাইনে থেকে হালকা কর্মসূচি পালনে কোন ধরনের ফলাফল আশা করা যায় না। বর্তমান আন্দোলনে দৃশ্যপটে কেবলই সময় ক্ষেপন। প্রকারান্তে জাতীয়করন আন্দোলনের ভীড়ে অন্যান্য ন্যায্য দাবি গুলো হারিয়ে যাওয়া। কেবলই বঞ্চিত হওয়া।

লেখক-

সারোয়ার মিরন,প্রভাষক, ব্যবস্থাপনা বিভাগ

একই ধরনের আরও সংবাদ