অধিকার ও সত্যের পথে

কে বেশি জনপ্রিয়  হিমু নাকি হুমায়ূন আহমেদ ?

লেখক হিসেবে জনপ্রিয়তায় পয়লা নম্বরে, সুনীল-সমরেশ-শীর্ষেন্দু বলয় থেকে পাঠকদের বাংলাদেশি লেখক, বিশেষ করে নিজেরদিকে টেনে আনতে সক্ষম হয়েছিলেন যিনি, তিনি কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ। ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম উপন্যাস নন্দিত নরকে প্রকাশ হওয়ার পর পাঠক মহলে যেভাবে নন্দিতহয়েছেন, মৃত্যুর পাঁচ বছর পরও তাঁর বই পাঠক চাহিদায় শীর্ষে এখনো।নন্দিত নরক থেকে দেয়াল পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি সাহিত্যকর্মের এই বিপুল পাঠকপ্রিয়তার নেপথ্যে কী কারণ থাকতে পারে? লেখক হিসেবে হুমায়ূন আহমেদের জনপ্রিয়তায় তুঙ্গস্পর্শের পেছনে লুকিয়ে আছে হিমু, শুভ্র, মিসির আলী ও রূপা নামেরজনপ্রিয় কিছু চরিত্র। এর মধ্যে ‘হিমু’র জনপ্রিয়তাই সবচেয়ে বেশি। হুমায়ূন আহমেদেরনাম উচ্চারণ করার সঙ্গে সঙ্গে অবধারিতভাবে মনে পড়ে যায় ‘হিমুকে’ এবং আমাদের মনের আয়নায় ভেসে ওঠে হলুদ পাঞ্জাবি, খালি পায়ে হেঁটে চলা ভবঘুরে একযুবকের ছবি।হিমু চরিত্রের আসল নাম হিমালয়। এ নামটি রেখেছিল তার বাবা। হুমায়ূন আহমেদ হিমুর বাবাকে বর্ণনা করেছেন একজন বিকারগ্রস্ত মানুষ হিসেবে, যার বিশ্বাস ছিল ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার যদি প্রশিক্ষণ দিয়ে তৈরি করা যায়, তবে একইভাবে মহাপুরুষ তৈরি করাও সম্ভব। মহাপুরুষ তৈরির জন্য একটি বিদ্যালয় করেছিলেন তিনি, যার একমাত্র ছাত্র ছিল সন্তান হিমু। হিমুর পোশাক ছিল পকেটবিহীন হলুদ পাঞ্জাবি। হলুদ বৈরাগের রং বলেই পোশাকের রং হলুদ নির্বাচিত করা হয়েছিল। ঢাকা শহরের পথে পথে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়ানো তার অন্যতম কাজ। প্রায়ই তার মধ্যে আধ্যাত্মিক ক্ষমতার প্রকাশ দেখা যায়। যদিও হিমু নিজেতার আধ্যাত্মিক ক্ষমতার কথা স্বীকার করে না। তার আচার-আচরণ বিভ্রান্তিকর। বিভিন্নপরিস্থিতিতে তার প্রতিক্রিয়াও অন্যদের বিভ্রান্ত করে এবং এ রকম করা তার অত্যন্তপ্রিয় একটি কাজ। প্রেম-ভালোবাসা উপেক্ষা করা হিমুর ধর্মের মধ্যে আছে। কখনোই কোনো মায়া তাকে কাবু করতে পারেনি। মায়াজালে আটকাতে গেলেই সে উধাও হয়ে যায়। তাকে সামাজিক অনুশাসনের মধ্যে বেঁধে রাখা যায় না, আবার অস্বীকার করা যায় না তার প্রবল মানবিকতাকেও। সে একই সঙ্গে আনন্দাচ্ছন্ন,আবার বিষাদজড়িত। চাকরির সুযোগ থাকলেও সে কখনো তা করে না।নব্বইয়ের দশকের গোড়াতে ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের মাধ্যমে হিমুর আবির্ভাব ঘটে। সেখানে প্রবল দুর্দশা ও অসচ্ছলতার ভেতর থেকে এক টুকরো সুখ খুঁজে নিতে হিমুকে কল্পনার ময়ূরাক্ষীর তীরে চলে যেতে দেখা যায়। ইচ্ছে হলেই যেকোনো সময়ে সে নদীতীরে ভ্রমণ করতে পারে, চাইলে যে কাউকে সঙ্গেও নিয়ে যেতে পারে। মাঝে মাঝে সেখানে তার মাকেও দেখতে পায় হিমু। এ উপন্যাসটিতে দেখা যায়, হিমুর বিকারগ্রস্ত বাবা ছেলেকে‘মহাপুরুষ’ বানানোর জন্য উঠেপড়ে লাগে। এ কাজে বিঘ্ন ঘটতে পারে আশঙ্কায় হিমুর মাকে হত্যাও হয়তো সে-ই করে। ঘটনাক্রমে জীবনের একটা সময় এমনও এসেছিল, যখন হিমুকেতার পিশাচসম মামাদের সঙ্গে বসবাস করতে হতো। সেখানে সে জীবনের এক নতুন অধ্যায়ের সঙ্গে পরিচিত হয়। এভাবেই ‘হিমু’ সিরিজের সূচনা হয়েছিল।পিতামহ হিমুর নাম রেখেছিলেন চৌধুরী ইমতিয়াজ টুটুল। তবে এটি বদলে জীবনের অন্যসবকিছুর মতোই হিমু গ্রহণ করে তার বাবার দেওয়া নাম হিমালয়। তিনি ধারণা করেছিলেন, হিমালয় নামটি পর্বতের মতোই মহত্ত্ব প্রকাশ করে। হিমালয় থেকে সংক্ষেপে তার নাম হয়ে যায় হিমু। বাবার আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করে হিমু। এ যেন অদ্ভুত এক বাধ্যতা! বাবার দেওয়া নির্দেশ অনুযায়ী সবসময় খালি পায়ে হেঁটে বেড়ায় এবং পকেটবিহীনহলুদ পাঞ্জাবি তার নিয়মিত পোশাক হয়ে যায়।মহাপুরুষ বানানোর প্রয়াস হিমুকে কতটুকু মহাপুরুষ করতে পেরেছিল, জানা যায়নি। তবে ২৫-৩০ বছর বয়সী অনাড়ম্বর যুবক হিমুর মধ্যে বেশ কিছু উদ্ভট আচরণ ছিল, যা সাধারণ থেকে তাকে করেছে আলাদা। কারও কাছেতা বিরক্তিকর হলেও অনেকের কাছে সেটাই মহাপুরুষত্ব!

হিমু নিজেকে একজন অবিরাম হণ্টক হিসেবে দাবি করে এবং তার একমাত্র কাজ রাত-বিরাতেঘুরে বেড়ানো। প্রায়ই হিমু পার্কে ও রাস্তায় রাত কাটায়। এ কারণে তাকে কয়েকবারসন্দেহভাজন হিসেবে কারাবাসও করতে হয় আর এই সুযোগে বিভিন্ন থানার অফিসারদের সঙ্গেবেশ মজার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। আবার অন্যদিকেকিছু খুনি-সন্ত্রাসীর সঙ্গেও গড়ে ওঠে তারভালো সখ্য।হিমুর একটি বিশেষ গুণ হলো, যেকোনো পরিস্থিতিতেই সে স্বাভাবিক থাকতে পারে এবং খুব সহজেই মানুষকে বিভ্রান্ত করে ফেলে। সুন্দর করে হাস্যরসাত্মক ভঙ্গিমায় কথা বলাও তার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তবে এসব হাস্যরসের মাঝে শহুরে ভণ্ডামির নানা দিক ফুটে ওঠার পাশাপাশি মানবজীবনের অন্তর্লীনবিষাদগ্রস্ততার চিত্রও খুব সহজেই ধরা দেয়। এ কারণে অনেক সময় হিমুকে অকর্মা যুবকও মনে হতে পারে। কিন্তু সে কখনো অন্যের অনিষ্ট করে না এবং দিন শেষে প্রতিটি উপন্যাসেই হিমুকে নিঃস্বার্থ ও পরোপকারী হিসেবে দেখা যায়।হিমুর আত্মীয়স্বজনের মধ্যে কেউই তাকে খুবভালো চোখে দেখে না, তবে মাজেদা খালা ব্যতিক্রম। মাজেদা খালা ‘হিমু’ সিরিজের বেশ গুরুত্বপূর্ণ এক চরিত্র। এ ছাড়া হিমুর ফুপাতো ভাই বাদলকেও বিভিন্ন উপন্যাসে দেখতে পাওয়া যায়, যে কিনা হিমুরএকান্ত ভক্তদের মধ্যে অন্যতম।

হিমু হিসেবে গড়ে তোলার পেছনে বাবার পর সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছে বান্ধবী রুপা। হিমুকে পছন্দ করে রুপা, হয়তোবা ভালোও বাসে। হিমুও যে অপছন্দ করে, তা নয়। মাঝে মাঝে রুপাকে কোনো এক দোকান থেকে ফোন করে নীল শাড়ি পরে তাদের বারান্দায় দাঁড়াতে বলে হিমু। রুপা তাই অপেক্ষায় থাকে, কিন্তু হিমু আসে না। রুপা তারপরও অবাক হয়না। বরং সে হিমুকে তার মেসে চিঠি পাঠায়, চিঠিতে একটুখানি অনুযোগ থাকে শুধু, আর কিছু না। হিমুর এমন উদ্ভটতায় রাগ করে না রুপা। এ জন্য হিমুর মাঝে মাঝে ইচ্ছা করে এই মহাপুুরুষগিরি ছেড়েছুড়ে স্বাভাবিক জীবন শুরু করতে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর সেটা করা হয়ে ওঠে না। কারণ হিমুদের আবেগ গায়ে মাখতে নেই, ভালোবাসতে নেই। হিমুরা কাউকে ভালোবাসে না।হিমুরা কাউকে ভালো না বাসলেও অজস্র পাঠক তাকে ভালোবাসে। তাই তো অনেকেই এখনো হিমু হওয়ার চেষ্টা করছে। হিমু শুধু বইয়ের পাতাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, মিশে গেছে সাধারণ মানুষের সঙ্গে। কিন্তু হিমুস্রষ্টা আমাদের থেকে বিদায় নেওয়ায় হিমুর জীবনযাপনও যেন স্থির হয়ে আছে। তাই হিমুর খালি পায়ে হয়নি পরা জুতো। হলুদ পাঞ্জাবিতে যুক্ত হয়নি পকেট।

হিমুস্রষ্টার প্রস্থান হয়েছে, কিন্তু হিমুর বিনাশ ঘটেনি, থেমে আছে নগ্ন পায়ে চলাচল। তবে একজন হিমুর স্থিরতায় অজস্র হিমু আজ শহরের অলিতে-গলিতে দেখা যায়, শুধু শহর নয়, সুদূর গ্রামেও অনেক হিমুকে দেখা যায় পকেটবিহীন হলুদ পাঞ্জাবি পরে খালি পায়ে হেঁটে বেড়াতে। এখনো বাড়ির ছাদেবিষণ্ন বদনে, উদাসী নয়নে অপেক্ষার আনন্দ উপভোগ করে নীল শাড়ি পরা রুপা।এখানেই প্রশ্ন, কে বেশি প্রিয়-হিমু নাকি হুমায়ূন আহমেদ? এর উত্তর হতে পারে, হুমায়ূন আহমেদের জনপ্রিয়তার নেপথ্যে হিমুচরিত্রের বড় ভূমিকা আছে। কিন্তু হিমুকে নিয়ে পাঠকের যে কৌতূহল, এখনো হিমুকে অনুসরণ করে, হিমুর মতো হতে চায়, কিন্তু কেউ হুমায়ূন আহমেদ হতে চায় না। এখানেই স্রষ্টা পরাজিত, তার সৃষ্টির কাছে। আজ হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে নেই, কিন্তু তার সৃষ্ট চরিত্ররা বেঁচে আছে। কী আশ্চর্য় মেধা নিয়ে তিনি জন্মেছিলেন! কী আশ্চর্য সম্মোহনী শক্তি ছিল তার লেখায়, তার সৃষ্টকাল্পনিক সব চরিত্রের!হুমায়ূন আহমেদ আর হিমু পাঠকের কাছে এক অপার ভালোবাসার নাম। দুজনেই পাঠকের মনের কোণে বহুদিন বেঁচে থাকবে, এ কথা বলে দেওয়া যায়।

একই ধরনের আরও সংবাদ