অধিকার ও সত্যের পথে

পোশাক নয়, আধুনিক হতে হয় মন ও মননে- মীম নোশিন নাওয়াল খান

আমার বাপির দাড়ি আছে। সে পাঁচবেলা জামাতে নামাজ পড়ে। তাই বাপির বয়সী জিন্স-টিশার্ট পরা আংকেলরা কেউ কেউ বলে, মডার্ণ হন! এত সেকেলে হলে হয়?

আমার মাম বোরকা পরে। সে আমাকে নিয়ে বিভিন্ন প্রোগ্রামে গিয়ে নামাজের সময় হলে নামাজের জায়গা খোঁজে। সে সাজগোজ করে না। কোনোদিন আমি তার ড্রেসিং টেবিলের উপর একটা লিপস্টিক বা কাজলও দেখিনি। তাই তাকে দেখে তার সমবয়সী মেকআপ করা, গাঢ় বেগুনি নেইলপলিশ লাগানো আর সারাক্ষণ আইফোনে ফেসবুক টিপাটিপি করা আন্টিরা বলে, ভাবী, একটু মডার্ণ হন! এত সেকেলে হলে হয়?
কেউ কেউ আবার এতই বেশি মডার্ণ যে, আমার বোরকা পরা সেকেলে মামের সঙ্গে কথা বলতেই তাদের রুচি হয় না!

এই কথা বলার কারণ পরে বলছি। এখন একটু গল্প করি।
সেদিন বাপি আর আমি কলেজ থেকে ফিরছি। আমাদের কলেজের সামনে একদল ভাইয়া র‍্যাগ-ডে-এর সাইন করা শার্ট পরে হৈ-হুল্লোড় করতে করতে যাচ্ছে।
বাপি জিজ্ঞেস করল, ওরা কারা?
আমি শার্টের লেখা দেখে বললাম, ওরা নটরডেমের ভাইয়া।
বাপিঃ ওরা এখানে কী করে?
আমিঃ র‍্যাগ ডে তো, গার্লফ্রেন্ডদের সাথে দেখা করতে এসেছে।
বাপিঃ এইভাবে দেখা করতে এসে কী লাভ? মেয়েগুলো তো ওদেরকে চিনতেই পারবে না। যেভাবে রং মেখে সং সেজে আছে!

আরেকটা গল্প করি। এটা আমার মামের গল্প।
আমার সহজে কাউকে পছন্দ হয় না। এক পরিচিত ভাইয়া তুরস্কে পড়াশোনা করে। একবার তার একটা গ্রুপ ছবিতে তার এক টার্কিশ ফ্রেন্ডকে দেখে খুব ভালো লেগে গেল। আমি সোজা ফোনটা মামের কাছে নিয়ে গিয়ে তার ছবি দেখিয়ে বললাম, মাম, ক্রাশ খেয়েছি!
মাম জিজ্ঞেস করল, নাম কী? কী করে?
আমিঃ জানি না।
মামঃ আগে তো জানো! না জেনেই ক্রাশ?

আমার সেই ভাইয়ার কাছে তার এই বিদেশি বন্ধু সম্পর্কে খোঁজ নিলাম। জানা গেল, সে ভীষণ ভালো এবং দয়ালু একজন মানুষ। নিজের খাবার জালালি কবুতরকে খাইয়ে দেয়। ভার্সিটিতে পড়ে।
মামকে সব বললাম। কথা শেষে বললাম, সব শুনে তো আমি সত্যি সত্যি ক্রাশ খেয়ে ফেলেছি মাম! খুঁজে বের করে কথা বলি?
মাম নির্দ্বিধায় বলল, আচ্ছা বলো!
আমি সত্যি সত্যি সেই ভাইয়ার সঙ্গে কথা বলেছিলাম। ক্রাশ খাওয়ার কথা বলিনি অবশ্য। সে নিয়মিত আমার ওই পরিচিত ভাইয়াটার কাছে আমার খোঁজ নিত। আমি আবার লাফাতে লাফাতে সেই গল্প মামকে বলতাম। মাম খুব আগ্রহ নিয়ে শুনত। শেষে এসে বলত, দেখব, কতদিন ক্রাশ থাকে তোমার!

একদিন জানা গেল, ভাইয়াটার নিজের একটা পছন্দের মানুষ আছে।
আমি বড়ই হতাশ হয়ে মামকে বললাম, মাম, এটা কী হল?
মাম হাসতে হাসতে বলল, তুমি আনক্রাশড হয়ে নিজে নিজে বিদায় করার আগেই তোমার ক্রাশ বিদায় হল। অবশ্য চাইলে তুমি এখনও ক্রাশ খেয়ে থাকতে পারো। ক্রাশ খেতে তো দোষ নেই, তাই না?

পরের গল্প।
আমি মোটেই সুন্দরী বা গুণী নই। কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে আরো ছোটবেলা থেকেই ধুপধাপ করে কিছু মানুষ আমার উপর ক্রাশ খেয়ে ফেলে। এই ক্রাশ খাওয়ার গল্প আবার আমি গলা চড়িয়ে মাম-বাপিকে বলি। বাপি জানে। মাম জানে। আমি ফেসবুকে ওইসব মানুষের টাইমলাইন মাম-বাপিকে বের করে দেখাই। তাদের মেসেজ পড়ে শোনাই। মাম-বাপি দেখে, শোনে।
তারপর কোনো একদিন কোনো এক অনুষ্ঠানে মামের সঙ্গে তাদের দেখা হয়ে যায়। তারা মাথা নিচু করে হাত তুলে খুব ভদ্র হয়ে লম্বা করে সালাম দেয়, স্লামালিকুম আন্টি। ভালো আছেন?
মাম সুন্দর করে সালামের উত্তর দেয়। গল্প করে। বাসায় আসার দাওয়াত দেয়।
মানুষগুলো আমার কাছে বড় বেশি কিছু বলার সাহস পায় না। আমাকে তারা যথেষ্ট ভয় পায়। কিন্তু মামের আদর পেয়ে বাঁদর হয়ে এক পর্যায়ে মামকেই বলে বসে, আন্টি, ওকে আমি অনেক ভালোবাসি! কিন্তু ও আমাকে পাত্তাই দেয় না!
মাম বলে, ও তো আমাকেই পাত্তা দেয় না! তোমাদেরকে আর কী পাত্তা দেবে? আমার মেয়েকে বুঝবে, বোঝাবে এমন কেউ নেই। যদি কখনো সে নিজে কাউকে পায়, আমিও দেখি কেউ তাকে বুঝতে পারছে, সেদিন ভাবব।

মাম কাউকে বকে না। কখনো-সখনো আমাকেও বকে। কিন্তু এদেরকে বকে না। তাই মাথায় উঠে গিয়ে একদিন কেউ বাসায়ই চলে আসে। দেখা হয়ে যায় বাপির সঙ্গে। বাপিকে সবাই ভয় পায়। মাথা নিচু করে লম্বা করে সালাম দেয়।
তাদেরকে অবাক করে দিয়ে বাপি হাসিমুখে সালামের উত্তর দিয়ে জিজ্ঞেস করে, কেমন আছো?
মামকে ডাক দিয়ে বাপি বলে, কালকে বাকরখানি আনলাম না? বের করে দাও ওকে।
আমাকে ডাক দিয়ে বলে, কক্সবাজার থেকে আচার এনেছিলে না অনেকগুলো? ভাইয়াকে দিয়েছ?

মানুষগুলো জানতেও পারে না, বাপি সব জানে। বাপি জানে তাদের ক্রাশ খাওয়ার কথা। কিন্তু সে কিছুই বলে না। একটুও রাগে না। তাদের অগোচরে মাথা নেড়ে শুধু বলে, ছেলেগুলি পাগল! গাছপাগল!

কিন্তু আমার বাপির সমবয়সী ওই টিশার্ট-জিন্স পরা আংকেলদের মেয়েরা কোনোদিন বাবার কাছে বলতে পারেনি, বাবা, ওই ভাইয়াগুলি তাদের গার্লফ্রেন্ডের সাথে দেখা করতে এসেছে!

আমার মামের সমবয়সী স্মার্ট আন্টিদের কাছে তাদের মেয়েরা বলার সাহস পায় না, মা, আমি অমুকের উপর ক্রাশ খেয়েছি।

পোশাক-পরিচ্ছদে তারা স্মার্ট, তারা মডার্ণ। কিন্তু পোশাকই কি সব? আমি তো মনে করি, আমার মাম-বাপির মতো মডার্ণ বাবা-মা আজও আমার পরিচিতদের মধ্যে কেউ হয়ে উঠতে পারেনি। যেই পরিবারে নিজের কথাগুলো স্বাধীনভাবে বাবা-মায়ের কাছে বলা যায় না, বারান্দায় গিয়ে বান্ধবীকে ফোন করে ফিসফিস করে মনের কথা বলতে হয়- সেই পরিবারকে আমি আধুনিক বলি না। যেখানে কৈশোর নামক ভয়ংকর দুঃসহ সময়টা পাড়ি দেয়ার দুঃস্বপ্নের মতো মুহূর্তগুলো আর দুর্বিষহ কষ্টগুলো বাবা-মায়ের সঙ্গে শেয়ার করে তাদের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে কাঁদা যায় না, সেই পরিবারকে আমি আধুনিক তো ছাড়, পরিবার বলতেই নারাজ।

আমি বড় ভাগ্যবতী। আমি কৈশোরের চাপা কষ্টগুলোকে মাম-বাপির কাছে বলে, তাদের কোলে মুখ লুকিয়ে কেঁদে হালকা হয়ে যাই। আমি কারোর উপর ক্রাশ খেয়ে মাম-বাপিকে গলা চড়িয়ে বলে দিই। আমার জীবনে লুকানোর কিছু নেই। আমার জীবনে কোনো রহস্য নেই, গোপনীয়তা নেই। তাই এই জীবনে ভুল করার সম্ভাবনাও নেই। আমি নিরাপদ। আমি নিরাপদ, কারণ আমার বাবা-মা সবচেয়ে স্মার্ট, সবচেয়ে আধুনিক।

এই সমাজের কাছে আমার বাবা-মা সেকেলে। হয়তো আমার বাপি ফেসবুক ব্যবহার করে না, টিশার্ট-আর জিন্স পরে না। হয়তো আমার মাম লিপস্টিক লাগায় না, ভ্রু প্লাক করতে পার্লারে যায় না, কিন্তু আমি আমার এ মাম বাপিকে নিয়ে গর্বিত। কেননা আমিই জানি, সমাজের কাছে তথাকথিত আমার সেই মাম বাপিই সবচেয়ে আধুনিক। যখন সমাজ ২০১৭ বাস করে, তখন আমার মাম বাপি ২০৫০ মতোই আধুনিক। সবশেষে বলি, Attire does n’t define you, attitude does.

মীম নোশিন নাওয়াল খান

ভিকারুননিসা নূন কলেজ, একাদশ শ্রেণি, বিজ্ঞান (ইংলিশ ভার্সন)।

 

একই ধরনের আরও সংবাদ