অধিকার ও সত্যের পথে

আমার সন্তান যেন বিপথে না যায়!

সব মা-বাবারই একান্তে লালিত স্বপ্ন হলো সন্তান সুশিক্ষায় শিক্ষিত হবে, মানুষের মত মানুষ হবে। এই ভাবনাটি আরও প্রকট হয়ে উঠছে যখন ছেলেমেয়েরা ক্রমশ অধিক হারে মাদকাসক্তিতে জড়িয়ে পড়ছে, অবৈধ যৌনাচারে লিপ্ত হচ্ছে। সাম্প্রতিককালে তরুণ-তরুণীদের জঙ্গিবাদী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়া মা-বাবাদের জন্য আরও একটি বাড়তি আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক মা-বাবাই হন্যে হয়ে উপায় খুঁজছেন কিভাবে সন্তানদেরকে বিপথে যাওয়া থেকে ফেরাবেন, কিভাবে তাদেরকে সত্যিকার অর্থে মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবেন। সন্তান একবার বিপথে চলে গেলে তাকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনা বেশ কঠিন; অনেক ক্ষেত্রেই তা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। তাই প্রয়োজন শুরু থেকেই সন্তানকে এমনভাবে গড়ে তোলা যাতে সে নিষিদ্ধ পথে পা না বাড়ায়; একজন আদর্শ মানুষ হিসেবে বিকশিত হয়।

শুরতেই বলে নেয়া ভাল যে, শিশুকে সঠিক পথে গড়ে তোলায় বা তার বিকাশে সহায়তার একক কোন পন্থা নেই। কেননা, প্রতিটি শিশুই স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। তাদের স্বভাব-চরিত্র এবং শেখার ধরনে রয়েছে পার্থক্য। কোন শিশু অন্তর্মুখী (ইন্ট্রোভার্ট) আবার কোন শিশু বহির্মুখী (এক্সট্রোভার্ট), কেউ দ্রুত শেখে (ফাস্ট লার্নার), আবার কেউ বা শেখার ক্ষেত্রে ধীরগতিসম্পন্ন (স্লো লার্নার), কেউ শুনে শুনে শেখে ভাল, আবার কেউ বা কাজটি নিজের হাতে না করা পর্যন্ত তার শেখা পূর্ণতা পায় না। তাই, শিশুর বিকাশে কিভাবে সহায়তা করবেন তা নির্ভর করে শিশুর চারিত্র্যিক বৈশিষ্ট্য ও তার শেখার ধরনের উপর। কাজেই, শিশুকে চিনতে এবং সে কিভাবে শিখতে স্বচ্ছন্দ বোধ করে তা বুঝতে ভুল হলে তার বিকাশে সহায়তা প্রদানেও ভুল হয়ে যেতে পারে। এমনকি ভুলভাবে সহায়তা দেয়ার চেষ্টার ফলে শিশু নিরাসক্ত ও হতোদ্যম হয়ে যেতে পারে। ফলে, প্রত্যাশিত দিকে ও মাত্রায় শিশু বিকশিত নাও হতে পারে।

আমরা অনেকেই শিশুর ‘বৃদ্ধি’ এবং ‘বিকাশ’কে একই অর্থে নিয়ে থাকি। আমাদের অনেকেরই এমন ধারণা আছে যে, শিশুকে যথেষ্ট পরিমাণে পুষ্টিকর খাবার খাওয়ালেই সে সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হয়ে উঠবে এবং যথাযথভাবে বিকশিত হবে। বিষয়টি সে’রকম নয়। এমন অনেক নাদুস-নুদুস শিশুকেই দেখতে পাওয়া যায় যারা নিজেরা কিছু করতে পারে না, এমনকি মা’কেই খাইয়ে দিতে হয় যে বয়সে শিশু নিজের হাতেই খেতে পারার কথা। অন্যদিকে, বিশেষত গ্রামাঞ্চলের শিশুদের দিকে লক্ষ্য করলেই দেখা যায় অপেক্ষাকৃত অপুষ্ট শিশুরাও নিজেরাই অনেক কাজ করছে, যেমন নিজের হাতে খাবার খাওয়া, গৃহস্থালি কাজে মা-বাবাকে সাহায্য করা, পাতা কুড়ানো, গরু-ছাগল এবং হাঁস-মুরগীকে খাওয়ানো, ইত্যাদি। তবে এটি মনে রাখা একান্ত জরুরি যে, ‘বৃদ্ধি’ ‘বিকাশ’-এর পূর্বশর্ত এবং পরিপূরক; শিশুর যথাযথ বৃদ্ধি না হলে শিশুর বিকাশ ব্যাহত হতে পারে। অর্থাৎ, বয়সের ধাপে ধাপে ক্রমান্বয়ে শিশুর দেহ ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের প্রসারণ ও পরিপূর্ণতা অর্জনকেই শিশুর বৃদ্ধি বলা হয়। অর্থাৎ, বৃদ্ধির সম্পর্ক আকার, আকৃতি ও আয়তনের সঙ্গে। শিশুর বয়সের সঙ্গে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সঙ্গতিপূর্ণ ও দক্ষতাপূর্ণ ব্যবহার ও আচরণকেই বলা হয় শিশুর বিকাশ। অর্থাৎ, বিকাশের সম্পর্ক দক্ষতা ও আচরণের সঙ্গে। বৃদ্ধি ও বিকাশ পরস্পর সম্পর্কযুক্ত ও পরস্পর নির্ভরশীল। শিশুর বৃদ্ধি ও বিকাশে বড়দের সহযোগিতামূলক ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুকে অতিরিক্ত আগলে রাখা, কোন কিছু করতে না দেয়া, সবকিছু বলে দেয়া এবং করে দেয়ার মাধ্যমে শিশুর বৃদ্ধি ও বিকাশ দুটোই ব্যাহত হতে পারে।

অন্যভাবে বলা যায় স্থান, কাল, পাত্রভেদে, পরিবেশ-পরিস্থিতি বিবেচনায় শিশুর বয়সের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ও দক্ষতাসম্পন্ন আচরণই হলো শিশু বিকাশ। এটি এমন একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে শিশু ধীরে ধীরে চিন্তা, নড়াচড়া, কথা বলা, অনুভব করা ও অনুভূতি প্রকাশ করা ইত্যাদি দক্ষতা চর্চার ক্ষেত্রে ক্রমশ সহজ থেকে জটিলতর বা উন্নততর ধাপে উপনীত হয়। অর্থাৎ, ক্রমাগতভাবে শিশুর এসব দক্ষতা শেখা ও সেগুলোর বয়সোপযোগী প্রকাশকেই শিশু বিকাশ বলা হয়। বিকাশ শুধু শৈশবকালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি একটি জীবনব্যাপী প্রক্রিয়া যার ভিত্তি স্থাপিত হয় শিশুকালে। অর্থাৎ, একটি শিশু তার জীবন-পরিক্রমার বিভিন্ন ধাপে কতটা পারঙ্গমতা প্রকাশ করতে পারবে এবং পরিবারে ও সমাজে কতটা অবদান রাখতে পারবে তা অনেকখানি নির্ভর করে শিশুকালে স্থাপিত বিকাশের ভিত্তির উপর। শিশুর এই বিকাশে আপনি কিভাবে তাকে সহযোগিতা করতে পারেন তার কিছু ধারণা এখানে দেয়া হলো:

(১) শিশুকে পর্যাপ্ত পরিমানে বয়সোপযোগী খেলনা ও আঁকাআঁকি করার সামগ্রী দিন এবং ঘরে উন্মুক্ত জায়গা রাখুন যাতে শিশু ছুটোছুটি করতে পারে। শিশুর সঙ্গে খেলায় অংশগ্রহণ করুন এবং শিশু যখন একাকী খেলবে তখন সে কী করছে তা জানতে আগ্রহ প্রকাশ করুন এবং তার সফলতায় তাকে যৌক্তিকভাবে প্রশংসা জানান। এটা মনে রাখা জরুরি যে, শিশুর সঙ্গে কখনও ভান (মকারি) করা যাবে না। ওরা তা বুঝতে পারে। শিশুর উত্তরে কোন ভুল ধরবেন না, বরং তার কাজে তাকে উৎসাহ দিন। কেননা, খেলাই শিশুর কাছে একটি কাজ এবং যে কোন কাজকে শিশু খেলা হিসেবেই নিয়ে থাকে। তবে লক্ষ্য রাখতে হবে যাতে শিশু কোন দুর্ঘটনা না ঘটায়।

(২) ‘আমি তোমাকে ভালবাসি’ – শিশুর কাছে এ রকম বার্তা তেমন কোন অর্থ বহন করে না। শিশু আপনার ভালবাসার প্রকাশ দেখতে চায়। অর্থাৎ, তাকে আলিঙ্গন করে বা কোলে তুলে নিয়ে আপনার ভালবাসার প্রকাশ দেখান; মুখে বলাই যথেষ্ট নয়। বকাঝকা এবং শারীরিক শাস্তি শিশুর জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এতে শিশু হীনম্মণ্যতায় ভোগে এবং আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। উপরন্তু, সে অযৌক্তিক আচরণ করে এবং মারামারিতে লিপ্ত হয়। পরবর্তীকালে ধীরে ধীরে পরিবারের প্রতি আকর্ষণ হারাতে থাকে এবং কাঙ্খিত দায়িত্ব পালনে অনীহা প্রকাশ করে। আপনি কোন ভুল করলে তা শিশুর কাছে স্বীকার করুন। এটি শিশুকে সততা ও স্বচ্ছতা (ট্রান্সপারেন্সি) শিখতে ও চর্চা করতে অনুপ্রাণিত করবে। কেননা, শিশুরা বড়দের আচরণ অনুকরণ করেই আচরণ করা শেখে; ভাল-মন্দ দু’টোই।

(৩) কোথাও বেড়াতে গেলে শিশুকে সঙ্গে নিন বা সম্ভব হলে শিশুর আনন্দের জন্যই তাকে বেড়াতে নিয়ে যান এবং ফিরে এসে সে কি কি দেখেছে বা ঘটেছে তা বর্ণনা করতে উৎসাহ দিন। পারিবারিক কাজের পরিকল্পনায় শিশুকে জড়িত করুন। যেমন, ফুলদানিটা কোথায় রাখবো, কিংবা, ছবিটা কোথায় লাগালে ভাল হয়, ইত্যাদি। শিশুর আঁকা ছবি ঘরে টানানো শিশুর জন্য খুবই উৎসাহব্যঞ্জক; শিশুর পারঙ্গমতায় তাকে ভীষণ আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। শিশুর কাছ থেকে যা প্রত্যাশা করা হয় তা পরিস্কারভাবে শিশুকে বুঝিয়ে বলুন। শিশুকে ধীরে ধীরে তার বয়স উপযোগী কিছু কাজের দায়িত্ব দিন। তাকে সমবয়সীদের সঙ্গে খেলতে দিন। শিশুরা দ্বন্দ্বে ও সমস্যায় পড়লে প্রথমত তা তাদেরকেই সমাধান করতে দিন। সমস্যা সমাধানে শিশু ব্যর্থ হলে তাকে কিছু বিকল্প-সমাধান দিন যেন সে তার পছন্দনীয় সমাধানটি বেছে নিতে পারে। কিন্তু, কখনই প্রথম সুযোগে সরাসরি সমাধান করে দেয়া ঠিক হবে না। তা শিশুর চিন্তা করার ক্ষমতাকে সীমিত করে ফেলে।

(৪) শিশুকে সঠিক তথ্য দিন। শিশু কোন প্রশ্ন করলে তা এড়িয়ে না গিয়ে তাকে বয়সোপযোগী উত্তর দিন। যেমন: একটি শিশু প্রশ্ন করতেই পারে, – মা আমি কেমন করে এলাম, কিংবা, উড়োজাহাজতো ডানা ঝাপটায় না, তাহলে কেমন করে ওড়ে? এসব ক্ষেত্রে শিশুকে ভুল-ভাল না বুঝিয়ে বা বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা না দিয়ে তাকে শিশুসুলভ উত্তর দিন। শিশু কি বলতে চায় তা গুরুত্ব দিয়ে শুনুন। শিশুরা কল্পনা থেকে কিছু বললে তাকে মিথ্যা নামে অভিহিত করা যাবে না।

(৫) শিশুর সামনে চিৎকার করে কথা বলা ঠিক নয়। তাহলে এটাকেই সে কথা বলার একটি নিয়ম বলে ধরে নিতে পারে। শিশুর সামনে মজার মজার কথা বলুন এবং প্রাসঙ্গিকতা বজায় রেখে অঙ্গভঙ্গি (বডি ল্যাঙ্গুয়েজ) করুন। প্রশ্নধর্মী কথা বলুন যাতে শিশু কথা বলতে উদ্যোগী হয় (কি হলো, কেন হলো, কোথায়, কিভাবে, ইত্যাদি)। শিশুর সঙ্গে অস্পষ্ট ইঙ্গিত বা জটিল ভাষা ব্যবহার না করে সহজ ভাষা ব্যবহার করুন এবং একসঙ্গে একাধিক নির্দেশনা দেবেন না। তাতে সে ভীত-বিহ্বল (পাজ্‌ল্‌ড) হয়ে যেতে পারে। শিশু আনন্দ নিয়ে কথা বললে তার সাথে একাত্ম হয়ে আনন্দ প্রকাশ করুন।

(৬) শিশুর সামনে সত্য কথা বলুন। শিশুর স্বচ্ছ-সরল স্বীকারোক্তিকে প্রশংসা করুন। দরিদ্র-অসহায় মানুষের প্রতি সম্মানজনক, সহানুভূতিশীল ও সহায়তামূলক আচরণ করুন। শিশুকে ন্যায়-অন্যায় , সত্য-মিথ্যা, ভাল-মন্দ সম্পর্কে ধারণা দিন। শিশুকে বড়দের আত্মজীবনী পড়ে শোনান। শিশুদেরকে ছবি দেখিয়ে নৈতিকতা উজ্জীবনমূলক গল্প বলুন। এক্ষেত্রে শিশুদের জন্যে উপযোগী করে লেখা বড় মানুষের জীবনীমূলক বই শিশুকে পড়তে দেয়া যেতে পারে। তাছাড়া, শিশুরা মুক্তিযুদ্ধের গল্প পড়তে ভীষণ পছন্দ করে।

সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো শিশুর যথাযথ বিকাশের স্বার্থে আপনাকে আমাকে সৎ থাকতে হবে, সদাচরণ করতে হবে এবং শিশুর জন্য একটি নির্ভয়-নিরাপদ পরিবেশের নিশ্চয়তা দিতে হবে। কেবলমাত্র আমাদের শোভন জীবন যাপনই শিশুকে একটি সুন্দর জীবন যাপনে উজ্জীবিত করতে পারে। কেননা, শিশুর সামনে আমরাই তাদের অনুকরণীয় আদর্শ (রোল মডেল)।

সরকার জাবেদ ইকবাল
ফ্রিল্যান্স কনসালটেন্ট
ইমেইল: sjiqbal.1957@gmail.com

একই ধরনের আরও সংবাদ