অধিকার ও সত্যের পক্ষে

জুলাইয়ে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ভর্তি : লাগামহীন টিউশন ফি আতঙ্কে অভিভাবক

আছাদুজ্জামান : চলতি বছরের জুলাই থেকে শুরু হচ্ছে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের নতুন শিক্ষাবর্ষ। সেই সঙ্গে বাড়ছে অভিভাবকদের দুশ্চিন্তা। এ দুশ্চিন্তার কারণ ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের লাগামহীন টিউশন ফি।

ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোর শিক্ষা কার্যক্রম যেন দেখার কেউ নেই। এসব স্কুল তদারকির জন্য সরকারের পক্ষ থেকে কোনো নীতিমালাও নেই। তাই নিজেদের খেয়াল-খুশিমতো চলছে এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। কোনো নিয়মনীতির বালাই না থাকায় ব্যাঙের ছাতার মতোই রাজধানীতে গজিয়ে উঠছে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল। অনেক স্কুলে শিক্ষকদের নামমাত্র বেতন দেয়া হচ্ছে। অথচ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায় করা হয় গলাকাটা ফি। এ ছাড়া মাঝেমধ্যেই বাড়ানো হচ্ছে ভর্তি ফি ও মাসিক বেতনসহ অদ্ভুত সব চার্জ। সব মিলে লাগামহীন ঘোড়ার মতোই দাপিয়ে চলছে এইসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ব্রিটিশ কিংবা এডেক্সেলের সিলেবাস অনুসরণ করে এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীরা পড়াশোনা করে ব্রিটিশ কাউন্সিলের মাধ্যমে পরীক্ষা দিলেও কতজন কী পরীক্ষা দিল, ভর্তি ও টিউশন ফি বাবদ কত টাকা আদায় করা হলো সেসব বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে কোনো তথ্যই নেই!

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর উত্তরায় আগা খান স্কুলে ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষে প্লে ও কেজি প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি ফি নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৪৮ হাজার ৬০৮ টাকা। শিক্ষার্থীদের কাছে প্রতি মাসের টিউশন ফি নেয়া হচ্ছে ১৩ হাজার ৫৪৫ টাকা। নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি হওয়ার সময় টিউশন ফি ও ভর্তি ফিসহ মোট ১ লাখ ৮৯ হাজার ৭২৯ টাকা পরিশোধ করতে হচ্ছে। তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হতে হলে একজন শিক্ষার্থীকে পরিশোধ করতে হয় ১ লাখ ৯০ হাজার ৩৭৪ টাকা। বারিধারার আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে কেজি ওয়ান শ্রেণিতে টিউশন ফি আদায় করা হচ্ছে ২৩ হাজার ৫৬০ ইউএস ডলার, যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় সাড়ে ১৮ লাখ টাকা। গ্রেড ১২ শ্রেণির টিউশন ফি নেয়া হয় ২৯ হাজার ৩৩০ ডলার। বাংলাদেশি টাকায় এ অঙ্ক ২৩ লাখ টাকার বেশি। ধানমন্ডিতে সানিডেল স্কুলে খোঁজ নিতে গেলে স্কুলের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক বলেন, এখানে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হতে পরিশোধ করতে হয় আড়াই লাখ টাকা। মাসিক টিউশন ফি দিতে হয় ১৩ হাজার টাকা। তবে এ ব্যাপারে কথা বলতে স্কুল কর্তৃপক্ষ সাংবাদিকদের প্রয়োজনীয় কোনো তথ্যই সরবরাহ করেনি। বরং নাম প্রকাশ না করে স্কুলের এক অধ্যাপক বলেন, সাংবাদিকদের কাছে ভর্তি ফি ও টিউশন ফির অঙ্কের পরিমাণ জানাতে আমরা বাধ্য নই। এ ছাড়া কর্তৃপক্ষেরও নিষেধ রয়েছে। দম্ভোক্তি দেখিয়ে এই শিক্ষক আরো বলেন, সরকারও ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে হাত দিতে চায় না। তাই কোনো নীতিমালার অধীনে নেয়নি। আমরা নিজেদের নীতিমালায় চলি। ঢাকার উত্তরায় অবস্থিত দিল্লি পাবলিক (ডিপিএস) স্কুলে গ্রেড ওয়ানে ভর্তি ফি নেয়া হয় আড়াই লাখ টাকা। আর প্রতি তিন মাসের বেতন নির্ধারিত রয়েছে ৩৫ হাজার ৪৭৫ টাকা। স্কুলটিতে গ্রেড ১২-তে প্রতি চার মাসের একাডেমিক ফি নেয়া হয় ৭৩ হাজার ৬০৩ টাকা।

ইন্টারন্যাশনাল স্কুল ঢাকার ওয়েবসাইট সূত্রে জানা গেছে, স্কুলটিতে কিন্ডার গার্টেন গ্রেড ওয়ান থেকে গ্রেড ১২ পর্যন্ত ভর্তি ফি আদায় করা হয় সাড়ে ৬ হাজার ইউএস ডলার, যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৫ লাখ ১০ হাজার টাকা। ছাত্র ভর্তির ক্ষেত্রে সিকিউরিটি ডিপোজিট হিসেবে জমা দিতে হবে ৫০০ ডলার, যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৪০ হাজার টাকা। এ ছাড়া গ্রেড ওয়ান শ্রেণিতে এক বছরের টিউশন ফি আদায় করা হয় ১৪ হাজার ২০০ ডলার, যা বাংলাদেশি টাকায় ১১ লাখ ১৩ হাজার টাকারও বেশি। গ্রেড ১২ শ্রেণির টিউশন ফি নেয়া হয় ২২ হাজার ৪০০ ডলার, যা বাংলাদেশি টাকায় সাড়ে ১৭ লাখ টাকার বেশি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বারিধারায় অবস্থিত অক্সফোর্ড ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি ফি নেয়া হচ্ছে ৭০ হাজার টাকা। এই স্কুলে বছরে ৪ সেমিস্টারের প্রতি সেমিস্টারে পরিশোধ করতে হয় ২৯ হাজার ২২২ টাকা। ম্যাপল লিফ স্কুলে প্লে শ্রেণিতে ভর্তিতে আদায় করা হয় ৫৫ হাজার ৮৭১ টাকা। ক্লাস ওয়ানে ভর্তি ফি নেয়া হয় ৬২ হাজার টাকা। মিরপুরে হিড ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে প্লে ও কেজি প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি ফি ১৭ হাজার টাকা। প্রতি বছর বার্ষিক চার্জ হিসেবে আদায় করা হয় আরো ১৩ হাজার টাকা।

এভাবেই লাগামহীনভাবে ভর্তি ফি ও মাসিক বেতন আদায় করছে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলো। অভিযোগ রয়েছে, উচ্চ হারে বেতন ফি নির্ধারণ করলেও অনেক প্রতিষ্ঠানেই সহশিক্ষা কার্যক্রমের কোনো বালাই নাই। শিশুদের খেলার মাঠ ও প্রয়োজনীয় উপকরণ নেই বেশির ভাগ স্কুলেই।

জানা গেছে, উল্লিখিত প্রতিষ্ঠান ছাড়াও রাজধানীর হার্ডকো ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, মাস্টার মাইন্ড, স্কলাসটিকা, ইন্টারন্যাশনাল টার্কিশ হোম স্কুল, আরব মিশন পাবলিক স্কুলসহ প্রায় এক হাজার ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানেও শিক্ষার্থী ভর্তিতে নেয়া হয় লাখ লাখ টাকা। ইংরেজি মাধ্যমধারী এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ব্রিটিশ কারিকুলাম কিংবা এডেক্সেল পড়ানোর কথা বলে একাধিক শাখা ক্যাম্পাস ব্যবহার এবং ভর্তি আর বেতনে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। অথচ শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর এ ব্যাপারে উদাসীন।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১২ সালে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের নেতৃত্বে কয়েকটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভাগুলোতে ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ, রাশেদা কে চৌধুরী, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানসহ অন্যরা অংশ নেন। তা ছাড়া বিভিন্ন ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের স্বত্বাধিকারীরাও সভায় উপস্থিত ছিলেন।

ওই সময়ে নীতিমালাটি পর্যালোচনা করে ইংরেজি মাধ্যম স্কুল নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি নতুন নীতিমালা করার উদ্যোগ নেয়া হলেও তা না করতে প্রতিষ্ঠান মালিকরা নানাভাবে চাপ প্রয়োগ করতে থাকেন। ফলে নতুন নীতিমালা তৈরির কাজ সেখানেই থেমে যায়। জানা গেছে, ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলের জন্য একটি পৃথক নীতিমালা প্রণয়নের জন্য ২০১২ সালে উচ্চ আদালত নির্দেশনা দিয়েছিল। ঢাকা শিক্ষা বোর্ড ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের জন্য খসড়া নীতিমালা প্রণয়ন করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমাও দিয়েছিল।

এক প্রশ্নের জবাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক ভোরের কাগজকে বলেন, ইংলিশ একটি বিশ্ব স্বীকৃত মাধ্যম। আন্তর্জাতিকভাবে কাজ করতে গেলে আমাদের ইংলিশ ভাষা জানতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে, আমাদের মাতৃভাষাকে ভুলে গিয়ে ইংলিশকে সর্বাগ্রে প্রাধান্য দিতে হবে। তিনি আরো বলেন, আমাদের একটি ক্যারিকুলামের মধ্যে পাঠদান থাকা উচিত।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ফায়েক উজ-জামান বলেন, আমি শুনেছি, ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলোতে যেভাবে পাঠদান করলে আমাদের দেশের প্রতি মমত্ববোধ সৃষ্টি হয় সেসব বিষয়ে খুব একটা নজর দেয়া হয় না। যেখানে নিজ ভাষার চর্চা হয় না সেখানে আমাদের ছেলেমেয়েরা দেশীয় সংস্কৃতি ও ভাষা শেখার কোনো সুযোগ নাই। তবে এর সমাধান হওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যলয়ের সাবেক উপাচার্য ড. সঞ্জয় অধিকারী বলেন, যার দেশে যে ভাষা তাকে সেই ভাষায়ই আগে পড়াশোনা করা উচিত। অতঃপর তাকে অন্যান্য ভাষা শেখা উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি। তবে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক প্রশাসন এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব বেগম রুহী রহমান বলেন, ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে একটি আইন ছিল। সেটি সংশোধনের কাজ চলছে। এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মন্ত্রণালয়ের একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বলেন, ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলোর নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে কয়েকবার সভা হয়েছিল। কিন্তু পরে কাজ আর এগোয়নি। এ ব্যাপারে যথেষ্ট গাফিলতি রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। তিনি আরো বলেন, নীতিমালার অধীনে না থাকায় এসব স্কুল লাগামহীনভাবে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছে। গলাকাটা ফি ও মাসিক বেতন আদায় করছে। এই স্কুলগুলো নিয়ন্ত্রণ করা এখন সময়ের দাবি।

এসব বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ ভোরের কাগজকে বলেন, প্রস্তাবিত শিক্ষা আইনের খসড়া ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছিল। শিক্ষা আইনের ব্যাপারে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, শিক্ষাবিদ ও অভিভাবকদের মতামত পাওয়া গেছে। শিক্ষা আইন পাস হলেই ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল নিয়ন্ত্রণের লক্ষে বিধিবিধান তৈরি করা হবে বলেও জানান তিনি। সুত্র ভোরের কাগজ

একই ধরনের আরও সংবাদ