ঢাকা, ২২ জানুয়ারী, ২০১৭, ৯ মাঘ, ১৪২৩

ইমেইলঃ [email protected]

লিপু হত্যার তিন মাসেও অগ্রগতি নেই তদন্তের বিচার দাবিতে বিক্ষোভ ,সমাবেশ মামলার জটে দুই হাজার শিক্ষার্থীর শিক্ষা কার্যক্রম ব্যহত ঝালকাঠিতে ২৫ নম্বর দিতে অর্ধলক্ষাধিক টাকা আদায়ের অভিযোগ

শিশুদের স্কুল ঘিরে জঙ্গি তৎ​পরতা

নিজস্ব প্রতিবেদক | জানুয়ারি ৮, ২০১৭ - ১১:০৩ পূর্বাহ্ণ


আহমেদ জায়িফ ।।কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ জঙ্গির যাতায়াতকে কেন্দ্র করে রাজধানীর উত্তরার ধর্মভিত্তিক ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান লাইফ স্কুল নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। শিশুদের এই স্কুলের সাবেক দুজন শিক্ষক ফয়সাল হক ও মাঈনুল ইসলামকে পুলিশ খুঁজছে। মাঈনুল ওরফে মূসা এখন নব্য জেএমবির হাল ধরেছেন বলে মনে করছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা।
এ ছাড়া পুলিশের অভিযানে নিহত নব্য জেএমবির দুজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা মেজর (অব.) জাহিদুল ইসলাম ও তানভীর কাদেরীরও এই স্কুলে যাতায়াত ছিল। তাঁদের বাসাও ছিল ওই স্কুলের কাছাকাছি।
প্রথম আলোর অনুসন্ধানে জানা গেছে, গুরুত্বপূর্ণ এই চার জঙ্গিনেতা গত বছরের ফেব্রুয়ারি-মার্চে সপরিবারে উত্তরা এলাকা ছাড়েন। আর একই সময়ে বাড়ি ছেড়ে নিখোঁজ হয়েছিলেন নিবরাস, তাওসিফ, শেহজাদ রউফসহ গুলশানের হলি আর্টিজান ও কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় হামলায় জড়িত সাত জঙ্গি।
পরবর্তী সময়ে মামলার তদন্তকারী সংস্থা পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের কর্মকর্তারা বলেছেন, এসব জঙ্গি তখন জঙ্গি আস্তানায় গিয়ে উঠেছিলেন। তাঁদের গাইবান্ধার চরে প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন অবসরপ্রাপ্ত মেজর জাহিদ। আর তানভীর কাদেরী গুলশানে হামলায় জড়িত জঙ্গিদের থাকার জন্য ঢাকায় বাসার ব্যবস্থা করেছিলেন।
গত ২৪ ডিসেম্বর রাজধানীর আশকোনায় জঙ্গি আস্তানায় অভিযানের পর আলোচনায় আসেন মাঈনুল ইসলাম। তাঁর সাংগঠনিক ছদ্মনাম মূসা। ওই আস্তানা থেকে মূসার স্ত্রী ও জাহিদের স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে আত্মসমর্পণ করলেও আরেক নারী বোমা ফাটিয়ে আত্মঘাতী হন।

কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের কর্মকর্তারা বলছেন, টেলিফোনে মূসার নির্দেশেই ওই নারী আত্মঘাতী হন। বাকি দুই নারীকেও মূসা একই নির্দেশ দিয়েছিলেন। এ ঘটনার পর মূসার মা অভিযোগ করেন, তাঁর ছেলেকে বিপথে নিয়েছেন লাইফ স্কুলের আরেক শিক্ষক ফয়সাল।

প্রথম আলোর অনুসন্ধানে জানা যায়, উত্তরার ১৩ নম্বর সেক্টরের ১৫ নম্বর সড়কে ভাড়াবাড়িতে লাইফ স্কুলটি চালু হয় ২০১৩ সালের জুলাইয়ে। এর উদ্যোক্তা আটজন। তাঁদের মধ্যে চারজন হলেন একটি বেসরকারি মুঠোফোন কোম্পানির মধ্যম সারির সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তা। অন্যদের মধ্যে একজন বুয়েটের সহকারী অধ্যাপক, একজন কানাডা থেকে এমবিএ পাস করা এবং দুজন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর পাস করা। লাইফ স্কুলের প্রধান উপদেষ্টা করা হয় ঢাকার নাজিরাবাজার মাদ্রাসার অধ্যক্ষকে। স্কুলটির এখন শিক্ষার্থীসংখ্যা ১১০। অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষসহ মোট শিক্ষক ২৩ জন। এ বছর অষ্টম শ্রেণি চালু করা হয়েছে। কেমব্রিজ ও ইসলামিক পাঠ্যক্রম সংমিশ্রণে স্কুলে পাঠদান করা হয়।

স্কুল কর্তৃপক্ষ জানায়, মালয়েশিয়ায় পড়াশোনা করা ফয়সাল হক লাইফ স্কুলে যোগ দেন ২০১৫ সালের শুরুর দিকে। আর ওই বছরের মাঝামাঝি সময়ে যোগ দেন মাঈনুল ইসলাম। ফয়সাল তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে আর মাঈনুল ইংরেজি পড়াতেন।

স্কুলটির তৎকালীন অধ্যক্ষ শরিফুল ইসলাম প্রথম আলোর কাছে দাবি করেন, তাঁরা মাঈনুলের ওপর অসন্তুষ্ট ছিলেন। প্রায়ই স্কুলে দেরিতে আসতেন। এ কারণে মৌখিকভাবে সতর্ক করেছিলেন। তিনি বলেন, মাঈনুল গত বছরের ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে স্কুল কর্তৃপক্ষকে জানান যে তিনি পরের মাস থেকে আর আসবেন না। মার্চের শেষ দিকে স্কুল ছেড়ে চলে যান।

স্কুলের ইংরেজি বিভাগের প্রধান আশরাফুল ওয়াকিল প্রথম আলোকে বলেন, স্কুল ছেড়ে দেওয়ার পর মাঈনুলের সঙ্গে তাঁর একদিন ওই এলাকায় রাস্তায় দেখা হয়। তখন মাঈনুল বলেছিলেন যে তিনি কোচিং সেন্টার দেবেন।

মাঈনুলের স্কুল ছাড়ার কিছুদিন পর ফয়সাল হকও স্কুল ছাড়েন। স্কুলের সাবেক অধ্যক্ষ শরিফুল ইসলাম বলেন, ফয়সাল জানিয়েছিলেন যে তাঁর বাবা-মা সৌদি আরবে থাকেন। গত বছরের শুরুর দিকে তিনি বলেছিলেন যে ভিসা পেলে খুব সংক্ষিপ্ত সময়ের নোটিশে বাবা-মায়ের কাছে চলে যাবেন। এরপর মার্চ মাসের শেষের দিকে বা এপ্রিলের শুরুতে তিনি চাকরি ছেড়ে চলে যান।

গত বছরের জুলাইয়ে শরিফুল ইসলামসহ চারজন শিক্ষক লাইফ স্কুল ছেড়ে চলে যান। তাঁরা উত্তরার ৯ নম্বর সেক্টরে নলেজ হোম নামে একই ধরনের নতুন স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন।

এরপর লাইফ স্কুলের অধ্যক্ষের দায়িত্ব পান মিজানুর রহমান। তিনি স্কুলের অন্যতম উদ্যোক্তা এবং শুরু থেকে এখানে শিক্ষকতা করছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, চাকরি ছাড়ার কিছুদিন পর স্কুলের কোনো কোনো শিক্ষকের সঙ্গে ফেসবুকে ফয়সালের যোগাযোগ হয়। তখন ফয়সাল জানিয়েছিলেন যে তিনি বাহরাইনে আছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন শিক্ষক বলেন, বিদেশে যাওয়ার পর ফয়সাল একবার দেশে এসেছিলেন। সম্ভবত সেই সময়ে তাঁর একটি সন্তানও হয়।

লাইফ স্কুলে মাঈনুল ও ফয়সাল কীভাবে বা কার মাধ্যমে শিক্ষকের চাকরি নেন, সে বিষয়ে জানতে চাইলে বর্তমান অধ্যক্ষ মিজানুর রহমান দাবি করেন, সাবেক অধ্যক্ষ শরিফুল ইসলাম বিষয়টি ভালো জানেন।

জানতে চাইলে শরিফুল ইসলাম বলেন, সাধারণত পত্রিকা ও চাকরির বিজ্ঞাপনদাতা ওয়েবসাইটে তাঁরা শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞাপন দেন। এ ছাড়া শিক্ষকেরাও পরিচিত ব্যক্তিদের নিয়ে আসেন। তবে এই দুজনের নিয়োগ কীভাবে হয়েছে, তা তিনি স্মরণ করতে পারছেন না।

এদিকে সেনাবাহিনী থেকে আগাম অবসরে গিয়ে মেজর জাহিদ লাইফ স্কুলের খুব কাছাকাছি ১৯ নম্বর সড়কের ১৯ নম্বর বাসায় ওঠেন। মেয়েকে ওই স্কুলের কেজি ওয়ানে ভর্তি করান। একই বাড়িতে জাহিদের পাশের ফ্ল্যাটে সপরিবার থাকতেন মাঈনুল ওরফে মূসা। আর তানভীর কাদেরী থাকতেন একই সেক্টরের ১৩ নম্বর সড়কের ৬২ নম্বর বাসায়। তানভীর কাদেরী কিশোর দুই ছেলেকে নিয়ে লাইফ স্কুলে নামাজ পড়তেন। যদিও তাঁর ছেলেরা ওই স্কুলে পড়তেন না। তারপরও তাঁরা কেন লাইফ স্কুলে আসতেন, এর জবাব শিক্ষকদের কাছ থেকে পাওয়া যায়নি।

স্কুল কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মেজর জাহিদের মেয়ে গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে স্কুলে আসা বন্ধ করে দেয়। আর মাঈনুল ও ফয়সাল চাকরি ছাড়েন মার্চে।

দুই পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মেজর জাহিদ ও তানভীর কাদেরী যথাক্রমে ফেব্রুয়ারি ও মার্চে বিদেশে যাবেন বলে স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে লাপাত্তা হয়ে যান।

লাইফ স্কুলের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত সেপ্টেম্বরে ঢাকার রূপনগরে পুলিশের অভিযানে মেজর জাহিদের মৃত্যুর পরদিনই তাঁর সম্পর্কে খোঁজ নিতে কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের একটি দল পুলিশ লাইফ স্কুলে আসে। এর ১০-১৫ দিনের মাথায় মাঈনুলের খোঁজ নিতে আসে। এ সময় তারা স্কুলে মাঈনুলের ছবিসহ জীবনবৃত্তান্ত, কম্পিউটার, হাজিরা খাতাসহ বিভিন্ন কাগজপত্র নিয়ে যায়। মাঈনুল যে বাসাটিতে ভাড়া থাকতেন, সেই বাসায়ও তারা খোঁজখবর করে।

লাইফ স্কুলের বর্তমান অধ্যক্ষ মিজানুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, মাঈনুল ও মেজর জাহিদকে তিনি মাঝেমধ্যে সকালবেলা একসঙ্গে হাঁটতে দেখেছেন। তাঁরা একসঙ্গে চার থেকে পাঁচজন থাকতেন। তবে সেই দলে তিনি তানভীরকে দেখেছেন কি না, মনে করতে পারছেন না। অন্যদের কেউ তাঁর পরিচিত নন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, লাইফ স্কুলে ধর্মীয় দিবসভিত্তিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো। স্কুলের শিক্ষার্থীদের অভিভাবক ছাড়াও আশপাশের এলাকার মানুষদের এতে আমন্ত্রণ জানানো হতো। বক্তা হিসেবে যাঁরা আসতেন, তাঁরা সালাফি মতাদর্শের (আহলে হাদিস) অনুসারী ছিলেন। স্কুলের শিক্ষকদের অনেকে এই সালাফি মতাদর্শের।

গত জুলাইয়ে স্কুলের ব্যবস্থাপনা পরিষদ বিভক্ত হয়ে যায়। এ বিষয়ে সাবেক অধ্যক্ষ শরিফুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, বর্তমান ব্যবস্থাপনা কমিটির সঙ্গে যাঁরা আছেন, তাঁদের সঙ্গে তাঁদের মতের মিল হচ্ছিল না। তাঁর অভিযোগ, লাইফ স্কুলের বর্তমান ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের ইমামদের মানে না। তারা আফগানিস্তানের ইমামদের অনুসরণ করার কথা বলে। তা ছাড়া সিরিয়ায় যে বাংলাদেশের তরুণেরা যাচ্ছেন, এ বিষয়গুলোও তাঁরা সমর্থন করেন। এসব কারণে মতবিরোধ দেখা দেওয়ায় আর থাকা সম্ভব হয়নি।

এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বর্তমান অধ্যক্ষ সিরাজুল ইসলাম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, শরিফুল ইসলাম স্কুলকে তাঁর পারিবারিক সম্পদ বানিয়ে ফেলেছিলেন। তাঁর স্ত্রী, ভাগনে, ভাগনের স্ত্রী—এঁদের নিয়েই স্কুলটি চালাতেন। স্কুলের আয় কী, বাচ্চাদেরই বা কী পড়ানো হবে—এসব বিষয়ে তিনি অন্য শিক্ষক বা উদ্যোক্তাদের সঙ্গে আলোচনা করতেন না। এমনকি আয়-ব্যয়ের হিসাবও ঠিকমতো রাখেননি।

সিরাজুল ইসলাম দাবি করেন, তাঁর (সাবেক অধ্যক্ষ) উদ্দেশ্যই ছিল তাঁর মতাদর্শ প্রচার করা। এ জন্য তিনি তাঁর মতাদর্শপন্থী বক্তাদের নিয়ে আসতেন স্কুলের অনুষ্ঠানে। এটা একটা স্কুল। এখানে এসব করলে স্কুল চলবে কীভাবে? তাঁরা যাওয়ার পর এসব বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

জানতে চাইলে কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের অতিরিক্ত উপকমিশনার আবদুল মান্নান প্রথম আলোকে বলেন, এটাকে স্কুল বলা যাবে না। এটা একটা মাদ্রাসা। ওইখানের যে পরিবেশ, যে কারিকুলাম, তা জঙ্গিবাদ বিস্তারের একটা উর্বর ক্ষেত্র। এই স্কুলসহ আরও কিছু প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে খোঁজখবর রাখা হচ্ছে। সুত্র প্রথম আলো

শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য দিন