অধিকার ও সত্যের পথে

ভেঙে যাচ্ছে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা

তামান্না ইসলাম, ক্যালিফোর্নিয়া (যুক্তরাষ্ট্র) থেকে।।আজকাল দেশে গেলে একটা ব্যাপারে খুব বিরক্ত লাগে। সেটা হলো বাচ্চাদের লেখাপড়া। আমার ছোট দুই ভাইয়ের মধ্যে একজনের বাচ্চা পড়ে বাংলা মিডিয়ামে। আরেকজনের বাচ্চা ইংলিশ মিডিয়ামে। তাই সারা বছরই কারও না কারও পরীক্ষা লেগে আছে। আর বাচ্চার পরীক্ষা মানে শুধু বাচ্চার একার পরীক্ষা নয়। সেই সঙ্গে বাবা-মা, দাদা-দাদি, নানা-নানি সবার পরীক্ষা। শুধু আমার ভাইয়ের বাচ্চারাই নয়, বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন, পাড়া প্রতিবেশী সবাই বাচ্চাদের পড়ালেখা নিয়ে অস্বাভাবিক রকমের ব্যস্ত। নিচু ক্লাসের বাচ্চাও চৌদ্দ-পনেরোটা করে সাবজেক্ট পড়ছে। কৃষিবিদ্যা পড়ছে প্রতিটা বাচ্চা। বীজ বপন থেকে চারা গাছ, সার, মাছের চাষ সব। কিন্তু তারপরে কয়জন বড় হয়ে সেই জ্ঞানকে কাজে লাগিয়েছে, সেটা খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত একজন শাইখ সিরাজকেই পেয়েছে। শারীরিক শিক্ষার নামে এক গাদা থিওরি মুখস্থ করছে, আসল কোনো শরীরচর্চা হচ্ছে না। অনেক বাচ্চাই সারা দিন ফাস্ট ফুড খেয়ে, বিন্দুমাত্র খেলাধুলা বা শরীরচর্চার অভাবে প্রায় অবিস পর্যায়ের মোটা হয়ে গেছে। আসলে পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাটাই প্রচণ্ডভাবে মুখস্থকেন্দ্রিক। এ কেমন ধরনের শিক্ষা? এই শিক্ষার উদ্দেশ্যই বা কি?স্বাভাবিকভাবেই বেশির ভাগ মানুষের মাঝেই মুখস্থ সম্পর্কে এক ধরনের বিতৃষ্ণা ও ভীতি কাজ করে। শিশুরা কৌতূহলপ্রবণ। তাদের সেই কৌতূহল বিন্দুমাত্র না মিটিয়ে তাদের বিরক্তিকর মুখস্থ শিক্ষার বোঝা চাপিয়ে দিয়ে শিক্ষার প্রতি তাদের আগ্রহ অঙ্কুরেই বিনাশ করে দেওয়া হয়। ক্লাস সিক্সের একটা বাচ্চাকে পড়তে হচ্ছে ইকোনমিকসের মতো কঠিন সাবজেক্ট। ওই বয়সে যখন অঙ্কের ভিত তৈরি করবে, প্রশ্ন করবে কেন? এটা এভাবে করতে হয় কেন? সে সময় অঙ্ক ঠিকমতো বুঝে ওঠার আগেই পড়তে হচ্ছে ইকোনমিকস। পড়াশোনার নামে গাদা গাদা মুখস্থের প্রতি প্রবল বিতৃষ্ণা নিয়ে বেড়ে উঠছে একদল অসুখী রোবট প্রজাতির শিশু। তাদের ইচ্ছা আর আগ্রহের বিরুদ্ধে। শিশু–কিশোরদের স্বাভাবিক শৈশব, কৈশোর কেড়ে নিয়ে তাদের জোরপূর্বক এই রোবট জীবনে বাধ্য করার কারণে তাদের সঙ্গে যোজন যোজন মাইল দূরত্ব তৈরি হচ্ছে বাবা–মায়েদের। এদের বাবা–মায়েরাও ভীষণ অসুখী। তারাও বোঝেন এভাবে তাদের বাচ্চারা কিছু শিখতে পারছে না। কোনো বিষয়ের গভীরে যেতে পারছে না। জ্ঞান অর্জন, এমনকি একটা বা দুটো সাবজেক্টের প্রতি তাদের কোনো আগ্রহ বা ভালোবাসা তৈরি হচ্ছে না। আর এ কথা সবাই জানে যে, আগ্রহ ছাড়া শুধু সিস্টেমের চাপে, বাবা–মায়ের ভয়ে বা তাদের খুশি করার জন্য কোনো বাচ্চা কোনো বিষয় সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জন করতে পারবে না। বরং প্রবল অনাগ্রহ থেকে সেই বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করা তাদের জন্য অতিরিক্ত কঠিন হয়ে উঠবে।

বাংলাদেশে বসবাসকারী যেকোনো শিক্ষিত বাবা–মায়ের সঙ্গে কথা বললে দেখি তারা সবাই একই দুশ্চিন্তায় ভুগছেন। বাচ্চাদের কীভাবে ভালো স্কুলে ভর্তি করাবে, তারপরে ভালো কলেজে আর সবশেষে ভালো ইউনিভার্সিটিতে। ভর্তির পাঠ চুকলে কোচিংয়ে অন্তহীন দৌড়াদৌড়ি, জোর করে চাপ দিয়ে বাচ্চাদের দিয়ে মুখস্থ করানো আর এই করতে গিয়ে নিজেদের বা সন্তানের কারওরই আর জীবন বলে কিছু তাদের অবশিষ্ট থাকে না। এ এক প্রচণ্ড অসুস্থ পরিবেশ। একেকটা ছোট বাচ্চা নাকি ভোর সকালে বের হয়ে স্কুল করে কোচিং করে রাতে বাসায় ফেরে। এই শিশুটি কী নিয়ে বেড়ে উঠছে? না পাচ্ছে সুস্থ শিক্ষা, শারীরিক–মানসিক সুস্থতা, পারিবারিক–সামাজিক সুস্থ পরিবেশ। একজন শিশুকে সুস্থ পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হলে এই সবগুলোই কিন্তু অত্যন্ত জরুরি। সেই সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাদের মা–বাবার জীবনও। বাচ্চাদের কোচিংয়ের টাকা জোগাড় করার জন্য তাদের রাত দিন পরিশ্রম করতে হচ্ছে। আবার মুখস্থ পড়া চাপ দিয়ে গলাধঃকরণে তাদের সঙ্গে প্রচুর সময় খরচ করতে হচ্ছে। এ দুটো তো এক সঙ্গে সম্ভব নয়। উপরন্তু এই টেনশনে তাদের জীবন থেকে চলে যাচ্ছে সব সুখ শান্তি। পারিবারিক ও দাম্পত্য জীবন, এগুলোতেও ধস নামছে।
প্রশ্ন হলো এভাবে চৌদ্দ পনেরোটা বিষয় মুখস্থ করিয়ে আদৌ কি শিক্ষাগত মান বাড়ছে? বাড়া সম্ভব নয়। বিষয়ের গভীরে না গেলে, তার সম্পর্কে যথার্থ আগ্রহ তৈরি না হলে প্রকৃত শিক্ষাই অর্জন হয় না। সৃজনশীলতা পঙ্গু হয়ে যায় একেবারেই। আমাদের লক্ষ্য যদি হয় ইউনিভার্সিটি লেভেলে সীমিত আসনে অসংখ্য শিক্ষার্থীর ভিড়ে উপযুক্ত প্রার্থীদের সুযোগ করে দেওয়া, তাহলে আমাদের অন্য পথ নিতে হবে। আমরা এভাবে করে ভালো ছেলেমেয়েদের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করছি। তার চেয়েও বড় কথা গোটা জাতির শিক্ষা নামের মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছি।
বাংলাদেশের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পেরেছি যে, ক্লাসে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি আশঙ্কাজনক ভাবে কমে গেছে। একজন অভিভাবকের মতে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া পর্যন্ত মা–বাবারা সন্তানদের পড়ালেখার দেখা শোনা করেন। তারপরে ছেড়ে দেন আর সম্ভব হয় না বলে। আর তখনই নামে বিপর্যয়। খাঁচায় বন্দী পাখি খোলা আকাশ পেয়ে সবকিছু ভুলে যায়, নিজের দায়দায়িত্ব, ভবিষ্যৎ। সর্বোপরি এই সব ছেলেমেয়েরা মানসিকভাবে পঙ্গু, জীবনে নিজে চলার কোনো শিক্ষাও তো এরা আগে পেয়ে আসেনি।
সম্প্রতি আমি কিছু বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ইন্টারভিউ নিয়েছি চাকরির জন্য। নামকরা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাও বাইরের ছেলেমেয়েদের তুলনায় কিছুই জানে না। বিশেষ করে সৃজনশীল চিন্তা ভাবনাতে ভীষণ দুর্বল। শেখানো জিনিসের বাইরে একটা কিছু জিজ্ঞেস করলে চটপট ভাবতে পারে না। অথচ বাইরের কোম্পানিগুলোতে বিশেষ করে ইঞ্জিনিয়ারিং ফিল্ডে চাকরির প্রথম চাহিদাই হলো সৃজনশীল চিন্তা ও সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করা। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা নাই বললাম। কীভাবে তাদের সার্টিফিকেট দেওয়া হয় আমি জানি না। এর মানে এই না যে, কেউই কিছু জানে না। কিন্তু বেশির ভাগের অবস্থাই ভীষণ দুর্বল। দেশের মুখ উজ্জ্বল করার মতো কোনো প্রার্থী তো আজকাল আর পাই না। কোথায় যাচ্ছে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা?সুত্র প্রথম আলো

তুমি এটাও পছন্দ করতে পারো