website page counter মাদ্রাসার অধ্যক্ষ-উপাধ্যক্ষ নিয়োগ নিয়ে চলছে নাটকীয়তা - শিক্ষাবার্তা ডট কম

শনিবার, ৪ঠা এপ্রিল, ২০২০ ইং, ২১শে চৈত্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | বসন্তকাল | ⏰ রাত ৯:৫৪

মাদ্রাসার অধ্যক্ষ-উপাধ্যক্ষ নিয়োগ নিয়ে চলছে নাটকীয়তা

কারিগরি ও মাদ্রাসা বিভাগ (টিএমইডি) এবং মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদফতরের (ডিএমই) মধ্যে চলছে ‘ঠাণ্ডা লড়াই’। দেশের সাড়ে ৭ সহস্রাধিক মাদ্রাসায় অধ্যক্ষ-উপাধ্যক্ষ নিয়োগ কমিটিতে প্রতিনিধি মনোনয়নকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হয়েছে এ পরিস্থিতি। বিভাগের নির্দেশে অধিদফতরের মহাপরিচালকের প্রতিনিধি হিসেবে জেলা প্রশাসক (ডিসি) বা তার মনোনীত ব্যক্তিকে মনোনয়ন দিয়ে সার্কুলার জারি করা হয়। কিন্তু রহস্যজনক কারণে দুই সপ্তাহ না যেতেই সেই সার্কুলার সংশোধনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে এ ব্যাপারে অধিদফতর থেকে বিভাগে ফাইল পাঠানো হয়েছে। এ নিয়ে বিভাগ ও অধিদফতরে নানা কানাঘুষা চলছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ডিএমই মহাপরিচালক সফিউদ্দিন আহমদ বৃহস্পতিবার বলেন, ডিসিদের নিয়োগ বোর্ডে সদস্য করা সম্পর্কিত বিষয়ে একটি ফাইল মন্ত্রণালয়ে গেছে। তাতে কী আছে এখনই বলা যাবে না। তবে কিছু একটা পরিবর্তন হতে পারে। তবে এ সম্পর্কে বিস্তারিত মন্তব্য করতে চাননি টিএমইডি সচিব মুনশী শাহাবুদ্দীন আহমেদ। বুধবার তিনি বলেন, ডিসি সম্মেলনের সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নির্দেশনার আলোকে ডিএমই মহাপরিচালকের প্রতিনিধি সম্পর্কে নতুন নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। এছাড়া আর কোনো কথা বলতে তিনি রাজি হননি।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সারা দেশের ৭ হাজার ৬২২টি মাদ্রাসার অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ এবং সুপার ও সহকারী সুপারের প্রায় ১৫ হাজার পদে নিয়োগে মহাপরিচালকের প্রতিনিধি হিসেবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অধিদফতরের কর্মকর্তারা যোগ দিচ্ছিলেন। এই সুযোগ নিয়ে অধিদফতরের কয়েকজন কর্মকর্তা মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে যোগ্য প্রার্থীদের বাদ দিয়ে অপেক্ষাকৃত অযোগ্যদের নিয়োগের সুপারিশ করতেন। এ নিয়ে একাধিক যোগ্য প্রার্থী টিএমইডিতে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। শুধু তাই নয়, অধিদফতরের খোদ মহাপরিচালকও তার দফতরের একজন পরিচালকের বিরুদ্ধে দুটি ঘটনা উল্লেখ করে নিয়োগ কেলেঙ্কারিতে জড়ানোর ব্যাপারে সচিবের কাছে চিঠি দেন। এছাড়া এ ব্যাপারে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগেরও নির্দেশনা আছে।

সেখানে নিয়োগ কমিটি প্রসঙ্গে ডিসি সম্মেলনের সুপারিশের কথা উল্লেখ আছে। এমন নানান অভিযোগ ও সুপারিশ আমলে নিয়ে টিএমইডি মহাপরিচালকের প্রতিনিধি সম্পর্কে অধিদফতরকে নির্দেশনা দেয়। এরপর ১৮ ফেব্রুয়ারি মহাপরিচালকের স্বাক্ষরে তার (মহাপরিচালক) প্রতিনিধি হিসেবে ডিসিকে মনোনয়ন দেয়ার ব্যাপারে সার্কুলার জারি করা হয়। এছাড়া ডিসির অনুপস্থিতিতে তিনি প্রতিনিধি মনোনয়ন দেবেন বলে ওই নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়। সূত্র জানায়, ওই নির্দেশনা জারির পর সারা দেশের মাদ্রাসা শিক্ষকরা খুশি হন। বিশেষ করে প্রতিনিধির জন্য সারা দেশ থেকে ঢাকায় যাতায়াতের ঝক্কি হ্রাস এবং অধিদফতরের কতিপয় কর্মকর্তার দুর্নীতি, হয়রানি ও দুর্ব্যবহার থেকে মুক্তির পথ তৈরি হওয়ায় শিক্ষকদের খুশির মাত্রা একটু বেশিই ছিল।

কিন্তু এতে অসন্তুষ্ট হন অধিদফতরের দুর্নীতিবাজরা। তারা আগের মতোই ডিএমই কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে প্রতিনিধি রাখার জন্য মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ে তদবির করেন। এরপর উচ্চপর্যায় থেকে ওই সার্কুলারের ব্যাপারে বিভাগে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়। পাশাপাশি এ ব্যাপারে নতুন নির্দেশনা দেয়া হয়। সেই নির্দেশনার আলোকে আরেকটি চিঠির খসড়া অনুমোদনের প্রক্রিয়া চলছে বলে জানা গেছে। সূত্র আরও জানায়, ১৮ ফেব্রুয়ারির চিঠির পরিবর্তে নতুন যে চিঠি বা সার্কুলারের প্রস্তাব করেছে ডিএমই, সেটি জারি হলে অধিদফতরের দুর্নীতিবাজদের বাণিজ্য ফের রমরমা হয়ে উঠতে পারে। পাশাপাশি প্রশ্ন উঠেছে, কোন স্বার্থে এবং কেন অধ্যক্ষ-উপাধ্যক্ষ নিয়োগের কমিটিতে মহাপরিচালকের প্রতিনিধি নির্বাচনের ব্যাপারে ফের সংশোধনের উদ্যোগ নেয়া হল।

এ নিয়ে শিক্ষক নেতারাও উষ্মা প্রকাশ করেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অধিদফতরের পরিবর্তে ডিসিদের কাছে প্রতিনিধি মনোনয়নের ক্ষমতা চলে যাওয়া সংক্রান্ত সার্কুলারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখেন ‘শ’ আদ্যাক্ষরের এক উপপরিচালক। বকেয়া এমপিও সংক্রান্ত কাজে তার কাছে যাওয়া চাঁদপুরের কচুয়ার একটি মাদ্রাসার হারুন অর রশিদ নামে এক শিক্ষকের সঙ্গে চরম দুর্ব্যবহারের অভিযোগ আছে ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। ১ মার্চ তিনি অভিযোগটি করেন টিএমইডিতে। ১৫ জানুয়ারি মজিবুর রহমান নামে একজন অভিযোগ করেন উল্লিখিত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। অভিযোগে বলা হয়, বরগুনা জেলার আমতলী উপজেলার মহিষকাটা নেছারিয়া দাখিল মাদ্রাসার সুপার নিয়োগে প্রথম স্থান অধিকার করলে নিয়োগ বোর্ড তাকে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করে।

কিন্তু উল্লিখিত ‘শ’ আদ্যাক্ষরের উপপরিচালক তিন লাখ টাকা ঘুষের বিনিময়ে তার নিয়োগ বাধাগ্রস্ত করতে তাকে মামলায় জড়িয়ে দেন। দুর্নীতিবাজ এই উপপরিচালকের কারণে সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। উল্লিখিত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ১৪ জানুয়ারি মাগুরা জেলার শ্রীপুর উপজেলার বাগাট দাখিল মাদ্রাসার সহসুপার পদে নিয়োগপ্রার্থী মোহাম্মদ ফয়জুল ইসলাম নামে আরেকজন অভিযোগ করেন টিএমইডি ও ডিএমইতে।

তার অভিযোগ, ১১ জানুয়ারি নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। নিয়োগ বোর্ড অন্যায়ভাবে তাকে লিখিত পরীক্ষায় কম নম্বর দেয় এবং সার্টিফিকেটে প্রাপ্ত নির্ধারিত নম্বর কম দেয়। সঙ্গে সঙ্গে তিনি লিখিত আবেদন করলেও কোনো প্রতিকার পাননি। ডিজির প্রতিনিধি উল্লিখিত উপপরিচালক পুনর্মূল্যায়ন না করে উল্টো তাকে ভয়ভীতি দেখান। ৩ মার্চ টিএমইডিতে একই অভিযোগ করেন কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার ঝাপুয়া আশরাফিয়া ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসার সুপার পদে প্রথম হয়েও নিয়োগবঞ্চিত মো. ফজলুল হক। তাকে বঞ্চিত করার ক্ষেত্রেও উল্লিখিত উপপরিচালক দায়ী বলে জানান তিনি। এছাড়া ‘স’ আদ্যাক্ষরের আরেক উপপরিচালকের বিরুদ্ধেও অভিযোগ তার। জানা গেছে, নানা অভিযোগে টিএমইডির সুপারিশে ১৬ জানুয়ারি এই কর্মকর্তাকে বদলির আদেশ হয়েছে।

কিন্তু রহস্যজনক কারণে সেই আদেশ আজও বাস্তবায়ন হয়নি। এদিকে খোদ মহাপরিচালক ‘স’ আদ্যাক্ষরের এক পরিচালকের বিরুদ্ধেও নিয়োগ কেলেঙ্কারির অভিযোগ জানিয়েছেন টিএমইডি সচিবকে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে পাঠানো ওই অভিযোগে ভোলার এবং ঢাকার দুই মাদ্রাসায় নিয়োগ সংক্রান্ত কাজে জালিয়াতির অভিযোগ করা হয়। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মহাপরিচালক কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। অভিযোগ আছে, ডিএমই’র ‘ম’ আদ্যাক্ষরের আরেক সহকারী পরিচালকের বিরুদ্ধেও নানা অভিযোগ আছে। কিন্তু রহস্যজনক কারণে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না মন্ত্রণালয়।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাংলাদেশ জমিয়াতুল মোদার্রেসিনের মহাসচিব মাওলানা সাব্বির আহমেদ মোমতাজী যুগান্তরকে বলেন, যে স্বপ্ন ও আশা নিয়ে সরকার ডিএমই প্রতিষ্ঠা করেছে তা পূরণ হয়নি। অযোগ্য ও অসৎ কর্মকর্তা বসানো হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে অর্থ সংক্রান্ত নানান অভিযোগ আমরা পাচ্ছি। তিনি বলেন, সারা দেশের মাদ্রাসায় নিয়োগে মহাপরিচালকের প্রতিনিধি ঢাকা থেকে পাঠানো হচ্ছে। হাইস্কুল ও কলেজে স্থানীয় সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ বা শিক্ষকদের থেকে দেয়া হয়।

বারবার বলা সত্ত্বেও এটা ঠিক হচ্ছে না। এখন ডিসিদের এই ক্ষমতা দেয়া হলেও এতে পুরোপুরি খুশি নন শিক্ষকরা। আমরা চাই শিক্ষা বিভাগের কর্মকর্তা ও শিক্ষকদেরও প্রতিনিধি রাখা হোক। কেননা শিক্ষাটা তারা ভালো বোঝেন। প্রসঙ্গত, এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের এনটিআরসিএর মাধ্যমে নিয়োগ দেয়া হলেও প্রশাসনিক পদে প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। পাঁচ সদস্যের নিয়োগ বোর্ডে ডিজির একজন প্রতিনিধি থাকে। সৌজন্যে: যুগান্তর

এই বিভাগের আরও খবরঃ